দাম্পত্যে শীতলতা
ব্যসত্মতার নাগরিক ধারাপাতে প্রতিদিন যখন ৰুব্ধ হয়ে উঠে সুখ বিলাসী মন হয়তো তখনই দুটি মনের স্পর্শিত স্থানগুলোতে ব্যবধান রচিত হয়৷ ব্যর্থতার সেই পুল পেরিয়ে সুখের দাম্পত্যে হারিয়ে যাওয়া তখন হয়তো শুধু স্বপ্নই থেকে যায়৷ দাম্পত্যের সেই শীতলতা নিয়ে এবারের মূল ফিচারটি লিখেছেন
মোর্শেদ নাসের টিটু
নগরে যখন নাগরিক বৃষ্টি কান্নার স্মৃতি রেখে যায় তখন নাগরিক দাম্পত্য জীবনে নানা ঘটন-অঘটন দূরত্ব রচনা করে দুটি মনের গহীণ কোণে৷ একথা সত্যি চিরায়ত সুখ কিংবা প্রতিদিন সুখের সাগরে ভেসে যাওয়া কোনটাই এই বাসত্মবতার ইট পাথরে ব্যসত্ম হয়ে উঠা শহরে দাম্পত্য জীবনে নিশ্চিত ঘটনা নয়৷ কিন্তু তাই বলে নির্জীব বস্তুর মতো দুটি মনের পাশাপাশি থাকা, একে অন্যের ভালো লাগার ক্রমাগত দূরত্ব তৈরি হওয়া, যন্ত্র নির্ভর সংসার জীবনে প্রতিদিন যান্ত্রিক সংলাপে নিজেদের ব্যসত্ম করে তোলা- ইত্যাদি নানা উপসর্গ কিন্তু আমাদের প্রতিনিয়ত শীতল দাম্পত্য জীবনে শীতার্ত দুঃখে দংষিত করে৷ ঋতু পরিবর্তনের এই অশুভ সময়ে নানা অসুখ যেমন দানা বাঁধে শহরের গভীরে তেমনি আধুনিক সময়ের এই ব্যসত্ম ৰণে মনের কোণেও অশনি সংকেত উঁকি দেয় বারবার৷ একঘেঁয়েমি জীবন কিংবা একে অন্যের প্রতি ভালোবাসার পেলব টানের অভাব যদি কখনো দুজনকে দুরে সরিয়ে দেয় তবে তা আপনাকে ভাবিয়ে তুলতে পারে একথা যেমন সত্যি তেমনি শুধু ভাবনার জানালা খুলে ধরলেই নয় বরং সেই জানালার বাইরে যে সুনীল আকাশ তার কাছাকাছি পেঁৗছাতে পারলেই জীবনের এই শীতলতা থেকে মুক্তি মিলতে পারে৷ যেমনটি দেখা গেছে নীলা আর শামীমের জীবনে৷ সংসারের যান্ত্রিক ব্যসত্মতায় প্রতিদিনের ২৪ ঘণ্টা এতো দ্রম্নত ছুটে যে নীলাকে এখন আর রোদ-বৃষ্টির রোমান্টিকতা আগের মতো টানে না৷ সম্ভবত রোমান্টিক মনের সেই হারানো বিজ্ঞপ্তিই নীলার মনে শামীম সম্পর্কে নতুন করে সন্দেহের বীজ রোপন করে৷ পাশাপাশি থাকে কিছু অভিযোগ, কিছু সংশয়৷ অথচ এক সময় এই শামীমই হয়তো তাকে অফিস থেকে ফেরার সময় একগুচ্ছ গোলাপ দিয়ে অবাক করে দিত৷ কিংবা ঘর সাজানোর অযাচিত কোন উপহার এনে তাকে চমকে দিত অবারিতভাবে৷ অথচ সেই শামীমই আজ শীতল দাম্পত্য সম্পর্কের স্বীকার হয়ে সাধারণ দিবসে নয় বরং ভালোবাসার দিনটিতে কিংবা জন্মদিনের ৰণটিতে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে ভুলে যায়৷ অন্যদিকে জাহিদ ও অনন্যার জীবনের ঘটনাও কিন্তু ভিন্ন নয়৷ অনন্যা অস্থির স্বভাবেরও হলেও জাহিদ ধৈর্য্য আর সহিষ্ণুতার প্রতিমূর্তি৷ জাহিদের এই চুপচাপ থাকা বিয়ের পর দু বছর পর্যনত্ম অনন্যার ভালো লাগার অন্যতম উপাদান ছিল৷ অথচ আজ জাহিদের নির্লিপ্ততা অনন্যাকে ৰুব্ধ করে তুলে৷ তাই মাঝে মাঝে অনন্যা ভাবতে বসে বাকি জীবনটা এরকম মানুষের সঙ্গে কিভাবে কাটবে৷ অনন্যা কিংবা নীলার এই ভাবনার পথরেখা ভিন্ন প্রকৃতির হলেও সমস্যার শুরম্ন কিন্তু এক জায়গাতেই৷ সময়ের পরতে প্রত্যেকের যেমন জীবন বদলায় তেমনি বদলায় জীবনের নানা বর্হিঃপ্রকাশের ভঙ্গিমা৷ তাই আজকের শামীম কিংবা আজকের জাহিদ আসলে বদলে যায়নি৷ ব্যসত্মতার কষাঘাতে তাদের অনুভূতির দেয়ালগুলো হয়তো অন্য রং ধারণ করেছে৷ এটি কোন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়৷ এ ধরনের ঘটনার সময়ে সবারই উচিত সমস্যাটি সম্পর্কে আনত্মরিকভাবে সচেতন হবার চেষ্টা করা৷ কিংবা দাম্পত্য জীবনে স্বাভাবিক পরিণতি থেকে নিজেদের আলাদা করতে শামীম কিংবা নীলার উচিত নিজেদের মতো করে সময় বের করে নেয়া৷ এমনকি নিজেদের লাইফস্টাইল বা ফ্যাশন চেতনায় পরিবর্তন আসতে পারে৷ পরিবর্তন আসতে পারে আউট ওয়ার্ড এপিয়ারেন্সের৷ এমনকি ঘরের বাতাসে যদি দম বদ্ধ ভাব তৈরি হয় তবে বদলানো যেতে পারে ঘরের ফার্নিচারগুলো কিংবা ঘরের পর্দায় আসতে পারে নতুনত্বের ছোঁয়া৷ হঠাত্ করে হয়তো বেড রম্নমে দেয়ালে লাগতে পারে নতুন রঙ কিংবা একজন আরেকজনকে উপহার দিতে পারে প্রিয় কোন পোশাক, হাতঘড়ি, মানিব্যাগ বা পার্স৷ এ তো গেল বাহ্যিক পরিবর্তন এমনকি মানসিক পরিবর্তনও আসতে পারে পুরোপুরি৷ যেমন নিজের অভিযোগগুলো চেপে না রেখে আচার-আচরণে কিংবা মুখ ফুটে সঙ্গীকে জানিয়ে দেয়া যেতে পারে৷ দু’জনেরই উচিত দু’জনকে প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করা আর ইতিবাচক পরিবর্তনকে ধারণ করা এবং নেতিবাচক পরিবর্তন সম্পর্কে জানিয়ে দেয়া৷ এভাবেই অকারণেই সঙ্গীর কাছ থেকে দূরে থাকার জড়ো অবস্থার অবসান ঘটবে৷ প্রয়োজনে কোনো ভ্রমণ কিংবা শহরের ভেতরেই ছুটাছুটি নতুন করে উপলব্ধি দিতে পারে নিজেদের সম্পর্কে৷ একথা নিশ্চিত করে বলা যায় দাম্পত্য সম্পর্ক একটি নিবিঢ় মনোযোগের বিষয়৷ যাকে তুলনা করা যেতে পারে চারাগাছের সঙ্গে৷ এই চারাগাছটিকে নিয়মিত যত্ন নেয়া চাই, প্রয়োজনে পানি দেয়া চাই এবং সময় মতো রোদ ঝড়ের তীব্রতা থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা চাই৷ ভালোবাসা, যত্ন, কেয়ারিং আর শেয়ারিং-এর মিলিত চেষ্টায় শীতল দাম্পত্যে ঝড় উঠতে পারে স্বর্গসুখের৷ আর কে না চায় জীবনের প্রতিটি বিন্দু, স্বপ্নের প্রতিটি কোষ এবং প্রাপ্তির প্রতিটি সিন্ধু ভরে উঠুক প্রত্যাশার অবারিত জলে৷ এভাবেই হয়তো জীবনের গল্পগুলো পূর্ণ হয়ে উঠবে আমাদের সঞ্চারিত স্বপ্নে৷
No comments yet