বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার মুক্তিযুদ্ধ শুরম্ন ৷৷ নাজমুল হাসান ৷৷

52129_1

একাত্তরের ২৫শে মার্চের কালরাতে তদানীনত্মন পূর্ব পাকিসত্মানে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকবাহিনীর নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের পরবতর্ী সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে অভু্যদয় ঘটেছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের৷ ২৫শে মার্চ সকালেও প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পাকিসত্মানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং পাকিসত্মান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়৷ কিন্তু সময় ৰেপনকারী এই বৈঠক যথারীতি ব্যর্থ হয়৷ রাতের অন্ধকারে ইয়াহিয়া খান করাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগের আগে জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বিরম্নদ্ধে বিষোদগার করে বলেন, ‘মুজিব দেশের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার ওপর আঘাত হেনেছে৷ এ অপরাধের জন্য তাকে সাজা পেতেই হবে৷’

বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের সিদ্ধানত্ম কমপৰে দুইদিন আগেই চূড়ানত্ম করে রেখেছিল পাক সামরিক জানত্মা৷ ২৩শে মার্চ কুমিলস্না থেকে ঢাকা আসেন পাকিসত্মানী সেনা কর্মকর্তা জেড এ খান৷ পরবতর্ীকালে ব্রিগেডিয়ার হিসেবে অবসর গ্রহণকারী এই সেনা কর্মকর্তা ‘ওয়ে ইট ওয়াজ’ শীর্ষক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের কাহিনী৷ ২৩শে মার্চ সন্ধ্যায় কুমিলস্না থেকে ঢাকা পেঁৗছার পর পরই তাকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়৷ সেই সন্ধ্যায়ই তিনি আরো দুইজন সেনা কর্মকর্তাসহ বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি রেকি করে আসেন৷ পরদিন বেলা ১১টায় জেনারেল রাও ফরমান আলীর অফিসে তাকে রিপোর্ট করতে বলা হয়৷ জেনারেল রাও ফরমান আলী ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের আনুষ্ঠানিক আদেশ দিয়ে বলেন, একটি মাত্র বেসামরিক গাড়িতে একজন মাত্র অফিসার সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করতে হবে৷ জেড এ খান এভাবে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করতে অপারগতা প্রকাশ করেন৷ ঐ দিনই বিকালে জেনারেল মিটঠা খান ঢাকা এলে জেড এ খান তার সঙ্গে সাৰাত্‍ করে একটি মাত্র গাড়ি নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের সমস্যা সম্পর্কে অবহিত করেন৷ শেষ পর্যনত্ম জেনারেল আবদুল হামিদ খানের নির্দেশে তিন গাড়ি সৈন্যসহ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের পরিকল্পনা চূড়ানত্ম করা হয়৷ ২৫শে মার্চ রাত ১১টায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে তেজগাঁও এয়ার ফিল্ড থেকে ধানমন্ডির দিকে রওয়ানা দেয় সামরিক কনভয়৷ সামনের জিপে জেড এ খান গাড়ির হেড লাইট জ্বালিয়ে অগ্রসর হন৷ পেছনে হেড লাইট নেভানো তিনটি সামরিক ট্রাক৷ জীপের পেছনে কতগুলো গাড়ি আছে তা বুঝতে না দেয়ার জন্যই এই কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল৷ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে অগ্রসরমান কনভয়টি পথে ব্যারিকেডের সম্মুখীন হলে গুলিবর্ষণ করা হয়৷ অস্ত্র চালিয়ে ব্যারিকেড সরিয়ে পাকিসত্মানী সৈন্য দলটি বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির বাড়িতে পেঁৗছে৷ তারা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে প্রথমে নাখালপাড়ায় তখনকার জাতীয় সংসদ ভবনে এবং পরে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে রাখে৷ সেখান থেকে পরে বঙ্গবন্ধুকে পাকিসত্মানে নিয়ে যাওয়া হয়৷ তবে গ্রেফতারের আগ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে যান৷

২৫শে মার্চ মধ্য রাতে অপারেশন সার্চ লাইট নামে বর্বর পাকিসত্মানী বাহিনীর নৃশংস আক্রমণে ইপিআর, পুলিশ ও সাধারণ মানুষসহ হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারান৷ আগুনের লেলিহান শিখা এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিবর্ষণের শব্দে বিভীষিকার নগরে পরিণত হয় ঢাকা৷ একযোগে হামলা হয় পিলখানায় তদানীনত্মন ইপিআর সদর দফতরে, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও আবাসিক এলাকায়, শাঁখারী বাজারে ও সদরঘাট নৌ টার্মিনালে৷ রাজারবাগ পুলিশ লাইনে বাঙালী পুলিশ সদস্যরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুললেও পাকবাহিনীর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সামনে বেশীৰণ টিকতে পারেননি৷ আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইন৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল (বর্তমান জহুরম্নল হক হল) ও জগন্নাথ হলে চলে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ৷ বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার থেকে টেনে এনে হত্যা করা হয় ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতাসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ জন শিৰককে৷ কিন্তু এই কাল রাতের অবসানে ২৬শে মার্চের সূর্যোদয় বাঙালীর জন্য বয়ে আনে নতুন আলোকবর্তিকা- জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের৷ শুরম্ন হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ৷ জয় বাংলা শেস্নাগানে উচ্চকিত বীর বাঙ্গালী শত্রম্ন নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়ে অমিত তেজে৷

No comments yet

উত্তর রেখে যান

You must be logged in to post a comment.