২৬ মার্চের ডাক – সৈয়দ মনজুরম্নল ইসলাম
২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস, যদিও ১৯৭১ সালের এইদিনে বাংলাদেশ শত্রম্নমুক্ত ছিল না, বরং শত্রম্নর শেষ আক্রমণ মাত্র শুরম্ন হয়েছিল৷ স্বাধীনতার জন্য আরো নয় মাস আমাদের অপেৰা করতে হয়েছে, শত্রম্নও তার শক্তি সঞ্চয় করেছে, সহযোগী খুঁজে পেয়েছে, কিন্তু ধীরে ধীরে ইতিহাসের অমোঘ পরিণতির দিকে গেছে৷ ২৬ মার্চ যে পতাকা উড়েছে বাংলাদেশে তা শত্রম্ন প্রায় সকল জায়গায় নামিয়ে ফেলতে পেরেছে, কিন্তু ১৬ ডিসেম্বরের জ্বলজ্বলে পতাকা নামানোর শক্তি তার আর ছিল না, সে নিজেই তখন গর্তে লুকিয়েছে, অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে৷ অবশ্য এই পতাকা নামাতে না পারলেও একে কালিমা লাগানোর দায়িত্বটা শত্রম্ন দিয়ে গেছে তাদের এদেশীয় সহযোগীদের হাতে৷ তারা প্রাণপণ চেষ্টা করেছে পতাকাকে অপমাণিত করতে৷ তারা পারেনি, কিন্তু সেই সুযোগ তাদের হাতে তুলে দিয়েছে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল৷
সে প্রসঙ্গে একটু পরে যাওয়া যাবে৷ তার আগে ২৬ মার্চের সঙ্গে চিরতরে যুক্ত ‘স্বাধীনতা’ কথাটি নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক৷ এই স্বাধীনতা বাসত্মবে ২৬ মার্চ ১৯৭১ না এলেও মানুষের চিত্তে, চেতনায়, কল্পনায়, প্রত্যয়ে-সংকল্পে এসে গেছে৷ এই স্বাধীনতা এদেশের মানুষ ঘোষণা করেছে ১৯৫২-তে- সেই ভাষা আন্দোলনে আমাদের সাংস্কৃতিক সংগ্রামের শক্তিশালী এক প্রকাশ এবং বিজয়ের মধ্য দিয়ে৷ তারপর এদেশের মানুষ বস্তুগতভাবে, রাজনৈতিক অথবা শারীরিকভাবে পাকিসত্মানীদের উপনিবেশী শাসনের নিচে থাকলেও মানসিকভাবে তারা সব সময় ছিল স্বাধীন৷ এই স্বাধীনতার ঘোষণা তাদের হয়ে দিয়েছে ছাত্র-শ্রমিক এবং সংগ্রামী মানুষ, ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৯-এ৷ এর প্রকাশ বিভিন্ন রকম ছিল, কিন্তু সারবস্তু ছিল এক৷ এটি ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণের, জাতিসত্তা হিসেবে নিজের অসত্মিত্বের পূর্ণ নিশ্চয়তা৷ এর মধ্যে সমাজ ছিল, সংস্কৃতি ছিল, ব্যবসা-বাণিজ্য সবই ছিল৷ একটা সার্বিক বিকাশের লৰ্যে বাঙ্গালি স্বাধীনতার লৰ্যে এগিয়ে গেছে৷ ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন ৬ দফা ঘোষণা করলেন, স্বাধীনতার আন্দোলনটি একটি নির্দিষ্ট রূপ নিল৷ ৬ দফাকে বলা হল বাঙ্গালির মুক্তির সনদ৷ তারপর ১৯৬৯ সালে আরেকবার ঘটল স্বাধীনতার স্পৃহার প্রত্যয়ী প্রকাশ৷ পাকিসত্মানের প্রবল পরাক্রমশালী সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধি শাসকের সিংহাসন টলে গেল৷ বাঙ্গালি জয়লাভ করল৷ পাকিসত্মানীরা যে এরপর প্রতিহিংসাপরায়ণ না হয়ে পারে না, তা মনোসত্মত্ত্বের মৌলিক শিৰাথর্ীটিও বলে দিতে পারে৷ তারপর অবশ্য একটা নির্বাচন দিতে হয়েছিল তাদেরকে৷ সেই নির্বাচনে বাঙ্গালি এভাবে এক হয়ে তাদের সিদ্ধানত্ম জানিয়ে দেবে পাকিসত্মানীদের, তা পাকিসত্মানীরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি৷ তারা ৰমতার মোহে এতটাই অন্ধ ছিল যে, জানালার বাইরে দিনটাকেও পড়তে পারেনি, বাঙ্গালির মন পড়াতো দূরের কথা৷ তারপর যা হবার তাই হল৷ পাকিসত্মানী মিলিটারির সঙ্গে যুক্ত হল তাদের শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্য চক্র৷ হাত মেলালো জুলফিকার ভুট্টোর মত অপরিণামদশর্ী ৰমতালোভী রাজনীতিবিদ৷ কিন্তু বাঙ্গালিরাও এতদিনে বুঝে নিয়েছে তাদের জন্য পথ আলাদা এবং এই পথে আছে মুক্তি, আছে পরিপূর্ণ একটি ভবিষ্যত্৷
ঢাকার পল্টনের জনসভায় মাওলানা ভাসানী পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন পাকিসত্মানীদের বিদায়, আসসালামু আলায়কুম৷ এবার ফিরে যান৷ আর ৭ মার্চ রেসকোর্সের মাঠে বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দিলেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তি ও স্বাধীনতার৷ মাঠে উপস্থিত দশ লৰ মানুষ বুঝল, পরদিন রেডিওতো সেই ভাষণ শুনে কারো বুঝতে বাকি রইল না, বঙ্গবন্ধু কি বুঝাতে চেয়েছেন৷ তারা স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হল৷
২৬ মার্চ যে স্বাধীনতার কথা বলে তা শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়- এই স্বাধীনতা সংস্কৃতির, চিত্তের, চিনত্মার, কর্মের, অধিকার ভোগের, ভাষার, আবেগের- অর্থাত্ একটি জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য যতখানি উন্মোচন দরকার, যতখানি স্বতঃস্ফূর্ততা, আনন্দ, কর্মোদ্যম দরকার সব এই স্বাধীনতা নিশ্চিত করে৷ ২৫ মার্চ রাতে যে হত্যাকাণ্ড চালায় বর্বর পাকিসত্মানীরা এদেশের মানুষের ওপর, তাতে একটি চিরস্থায়ী ৰত সৃষ্টি হয়েছে আমাদের চেতনায়, মনে৷ কিন্তু ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ডাক এই ৰত থেকে নিজেদের তুলে আনতে, শোককে ভুলে শক্তির সন্ধান করতে অনুপ্রাণিত করে৷ এবার ২৬ মার্চ আবার আমাদের ডাক দিচ্ছে সেই সার্বিক স্বাধীনতা অর্জনের৷
আমরা কি স্বাধীন? আমরা কি আমাদের সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক স্বাধীনতার ফল ভোগ করতে পারছি, অথবা সেই স্বাধীনতা আদৌ পেয়েছি? যদি গত ৩৭ বছরের ইতিহাস আমরা পড়ি, দেখা যাবে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনো শুধুমাত্র টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত৷ গ্রামবাংলার বিশাল সংখ্যক মানুষ, শহরের এক বিশাল সংখ্যক মানুষ এখনো প্রানত্মবাসী রয়ে গেছে৷ যদিও একটা বড় সংখ্যক মানুষ ক্রমাগত বিত্তশালী হচ্ছে৷ এই বিত্তশালী সুবিধাভোগী শ্রেণীই এতদিনে দেশের রাজনীতি থেকে নিয়ে প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে নিয়ে শিল্প উত্পাদন- সব ৰেত্রেই রাজত্ব করেছে এবং করছে৷ ফলে, সমাজে সৃষ্টি হয়েছে বৈষম্য, জনগোষ্ঠীর ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে অনেকগুলো দেয়াল৷ এই শ্রেণীর হাতে সংস্কৃতিও একটি পণ্যের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত৷ এরা শিৰাকেও করেছে পণ্য৷ এরা সকল সংগ্রামের সুফল ভোগ করলেও সংগ্রামের চেতনার পিঠে চালিয়েছে ছুরি৷ এই শ্রেণী শুধুই ৰমতা এবং ভোগে বিশ্বাসী- এদের দেশপ্রেম শূন্য, কিন্তু আত্মপ্রেম একশ’ ছাড়িয়ে যায়৷ এরা শিৰার কোনো সূত্রকে, কোনো গুরম্নত্বকে জীবনে গ্রহণ করেনি৷ ফলে এদের কোনো আদর্শ নেই জীবনে ও কাজে৷ ব্যতিক্রম যথেষ্ট আছে, প্রচুর ব্যতিক্রম আছে- কিন্তু ব্যতিক্রম এরকম ৰেত্রে নিয়মটাকেই প্রতিষ্ঠা করে৷ ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি যখন সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের ৰমতা গ্রহণ করে, তখন এদের অনেকের ওপর আইনের খড়গ নেমে আসে৷ দেশবাসী তখন অবাক বিস্ময়ে দেখল, কী বিপুল বিত্ত ৰমতা একচ্ছত্র আধিপত্যের অধিকারী ছিল এসব মানুষ৷ তারা দেশের কথা একবারও ভাবেনি, শুধু ভেবেছে নিজের এবং দলের স্বার্থ৷ এদের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই শ্রেণীর আধিপত্য ও অপশাসনের বিরম্নদ্ধে ২৬ মার্চ ডাক দিয়েছিল৷ কিন্তু কিছুদিন পতিত থেকে এই শ্রেণীটি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে৷
[লেখক : কথাশিল্পী ও অধ্যাপক,
ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]
No comments yet