ঐতিহ্য ; শ্বশুর বাড়িতে যায়রে বউ পালকিতে চড়েঃ

‘বর আসবে পালকি চড়ে টোপর মাথায় দিয়ে’ কিংবা ‘বাক বাকুম পায়রা মাথায় দিয়ে টায়রা বউ সাজবে কাল কি চড়বে সোনার পালকি’- এমনি আরো বহু ছড়া, কবিতা, গানের কথায় ‘পালকি’ রয়েছে৷ গ্রাম বাংলায় ঘুরে এখন আর পালকি যেনো চোখেই পড়ে না৷ প্রায় ৫০ বছর আগের কথা- এখনও ভাসা ভাসা মনে পড়ে আমারই চাচাতো বোন মিলনের বিয়ে হয়েছিল দুর্গাপুর গ্রামের আমজাদ সর্দারের সঙ্গে৷ মিলনকে পালকিতে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল শ্বশুর বাড়ি৷ আমজাদ সর্দারও পালকিতে করে পার সাতুরিয়া গ্রামে মোয়াজ্জেম হোসেন মজুর বাড়িতে এসেছিল৷ জামাই আমজাদকে পালকিতে চড়তে দেখে নিলতি নিবাসী আমার ফুপা ফজু জোমাদদার ঠাট্টার ছলে গেয়েছিলেন- ‘শ্বশুর বাড়ি যায়রে আমজাদ পালকিতে চড়ে যায়রেঃ ডাল পরাটা খায়রেঃ.’৷

বর কিংবা বউ এরাই এক সময় শুধু পালকিতে চড়তো না৷ একদা বড় বড় জমিদাররাও এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালকিতে করে আসতেন৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কুষ্টিয়া থেকে শিলাইদহে আসতেন পালকিতে চড়ে৷ আত্রাই থেকে পতিসর যেতেন পালকিতে করেই৷ সেতো প্রায় ৯০ বছর আগেকার কথা৷ পালকি ছিল তখন চলাচলের অন্যতম বাহন৷ তবে মজার ব্যাপার কি, কয়েক বছর আগে ভারতের জৈন তীর্থস্থান পরেশনাথে গিয়ে পালকিতে চড়েই পাহাড় শীর্ষে এসেছিলাম৷ কিন্তু এই আধুনিক যুগে বাংলাদেশের কোথাও আর পালকি ব্যবহৃত হচ্ছে না৷ গ্রামবাংলার বর-কনেরাও আর পালকিতে চড়ে না৷ এখনকার বর-কনেরা গাড়িতে চড়েই শ্বশুর বাড়ি যায়৷

প্রাচীন ও মধ্য যুগের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল পালকি৷ তা আজ বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে ঢাকা জাদুঘরে ঠাঁই করে নিয়েছে৷ যারা পালকি বহন করতো তাদেরকে বলা হতো বেহারা৷ পালকি উঠে যাওয়ার কারণে বেহারারা চলে গেছে অন্য পেশায়৷ পালকি একটি প্রাচীনতম লোকযান৷ একশ’ বছর আগেও পালকির পাশাপাশি চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হতো গরম্নর গাড়ী, ঘোড়ার গাড়ী৷ নৌকাও ছিলো আরেক যোগাযোগের উলেস্নখযোগ্য মাধ্যম৷ হিন্দুদের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থে যে ৪১টি জাতের কথা উলেস্নখ করা হয়েছে তাতে ডোলাবাহী বা ডুলি বেহারা বা দুলিয়া বা দুলেদের কথা জানা যায়৷ এই বংশ তালিকায় পালকি বাহকদের স্থান হয়েছে চলিস্নশ নম্বরে৷ এরা সমাজের একানত্ম প্রয়োজনীয় শ্রমিক হলেও এদের বসবাস ছিল ভদ্র পলস্নীর বাইরে৷ এদের ছোঁয়া কোনো খাবার বা পানীয় উচ্চবর্ণের লোকজন স্পর্শ করতো না৷ স্পর্শ করলেই হিন্দু মুরম্নব্বীরা বলে উঠতেন- ‘জাত গেলো, জাত গেলোঃ.৷’ রাজা কেশব সেনের লিপিতে হাতির দাঁতের তৈরি বাহু দণ্ডযুক্ত পালকির উলেস্নখ রয়েছে৷ রাজা বলস্নাল সেনের সময় পালকির গুরম্নত্ব সবচাইতে বেশি ছিল৷ রাজা-বাদশাদের যুগে অনেক রাজাই শত্রম্নদের চোখে ধুলো দিয়ে গোপনে পালকিতে চড়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতেন৷ কিন্তু সেই দিন আজ আর নেই৷ এ প্রজন্ম পালকির কথা শুনে শুধু অবাকই হয়৷ অবাক হবারই কথাঃ৷

No comments yet

উত্তর রেখে যান

You must be logged in to post a comment.