কেমন করে জন্ম হলো বাংলা সনের – এসএম নাজমুল হক ইমন
সন ও তারিখ দুইটি আরবি শব্দ৷ প্রথমটির অর্থ হলো বর্ষ বা বর্ষপঞ্জি এবং অন্যটির অর্থ দিন৷ তারিখ বলতে আবার ইতিহাসও বোঝায়৷ সাল হচ্ছে একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ হলো বছর৷ বাংলা সনের সূত্রপাত হয় হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে৷ ইংরেজি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কা থেকে মদিনায় ঐতিহাসিক হিজরত অবলম্বনে হিজরি সনটি প্রবর্তিত হয়৷ এই হিজরি সন শুরম্ন হয় ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জুলাই তারিখ থেকে৷ বাংলা সনের মূলেও রয়েছে হিজরি সন ৷ হিজরি সনকেই বাংলা সনে রূপানত্মরিত করা হয়৷ মোগল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে তারই নির্দেশে ৯৯৮ হিজরি মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়৷ বাদশাহ আকবর ৯৬৩ হিজরিতে (১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ ফেব্রম্নয়ারি) দিলিস্নর সিংহাসনে আরোহণ করেন৷ এই ঐতিহাসিক ঘটনা চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য ৯৬৩ বছর বয়স নিয়ে যাত্রা শুরম্ন করে বাংলা সন৷ উলেস্নখ্য, হিজরি সনের ৰেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল৷ মহানবী (সাঃ) স্বয়ং আনুষ্ঠানিকভাবে হিজরি সন চালু করেননি৷ এটি প্রবর্তন করেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.) ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে৷ তাও হিজরতের ১৬ বছর পর৷ হিজরি সনের ৰেত্রে যে রকম হিজরতের দিন ও মাস (১২ রবিউল আউয়াল) সুনির্দিষ্টভাবে অবলম্বন না করে শুধু সালটিকেই (৬২২ খ্রিস্টাব্দে) সংরৰণ করা হয়৷ বাংলা সনের ৰেত্রে তেমনি সম্রাট আকবরের রাজ্যাভিষেকের দিন ও মাস (১৪ ফেব্রম্নয়ারি) অবলম্বন না করে শুধু বছরটি (৯৬৩ হিজরি) সংরৰিত হয়৷
বাংলা সনের সৃষ্টি হয় ফসল তোলার সময় লৰ্য করে৷ কৃষিনির্ভর বাংলাদেশর রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে সৌর বছর অবলম্বনে এই নতুন সন গণনা শুরম্ন হয়৷ তাই প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ফসলি সন নামে অবিহিত হতো৷ বাংলার জন্য উদ্ভাবিত বলে এটি পরবর্তী পর্যায়ে বাংলা সন নামে পরিচিত হয়৷ সম্রাট আকবরের আমলে সুরা-এ বাংলা (বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা) মোগল শাসনের আওতাভুক্ত হয়; কিন্তু রাজস্ব আদায়ের ৰেত্রে একটি জটিল সমস্যা দেখা দেয়৷ প্রজাদের দেয় খাজনা ফসলের মাধ্যমে আদায় করতে হলে বছরের একটি সময় নির্দিষ্ট থাকা আবশ্যক; কিন্তু সেকালের রাজকীয় হিজরি সন চান্দ্র সন হওয়ায় প্রতিবছর একই মাসে খাজনা আদায় করা সম্ভব হতো না৷ ফলে, সম্রাট আকবর একটি সৌরভিত্তিক সন প্রচলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন৷ উলেস্নখ্য, চান্দ্র বছর ৩৬৫ দিনের না হয়ে ৩৫৪ দিনের হয়ে থাকে৷ ফলে, চন্দ্রভিত্তিক আরবি মাস বছরের সৌরভিত্তিক ঋতুর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট কোনো সামঞ্জস্য বহন করে না৷
সম্রাট আকবরের নির্দেশে প্রচলিত হিজরি সনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজ জ্যোতিষি আমীর ফতেহ উলস্নাহ সিরাজী বহু ভাবনা-চিনত্মার পর উদ্ভাবন করেন ফসলি সন বা বাংলা সন৷
একটি কথা অবশ্য স্মরণে রাখতে হবে, হিজরি সনভিত্তিক হলেও বাংলা সন ও হিজরি সন আদৌ একই ধরনের নয়৷ হিজরি সন হচ্ছে চান্দ্র সন এবং বাংলা সন সৌর সন৷ ফলে, একই সময়কাল থেকে যাত্রা শুরম্ন করলেও (৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জুলাই) হিজরি ও বাংলা সন দুটির বয়সে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে৷ বর্তমানে এই পার্থক্য এসে দাঁড়িয়েছে ১৪ বছরে৷ হিজরি সনের হিসাব অনুযায়ী এ বছরটা হলো ১৪২১; কিন্তু বাংলা সনের হিসাবে এটি হচ্ছে ১৪০৭৷ ফলে ১৪-১৫ বছরের পার্থক্য অতি স্বাভাবিক৷ কারণ চান্দ্র বছর এবং সৌর বছরের সময়কাল সমান নয়৷ দুটির মধ্যে পার্থক্য প্রায় এগারো দিনের৷ সৌর বছর হয় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড৷ চন্দ্র বছরের স্থিতি হলো ৩৫৪ দিন ৮ ঘণ্টা ৫৩ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের৷ চন্দ্র বছরের সময়কাল সৌরবছর অপেৰা প্রায় ১১ দিন কম হওয়ায় হজরি সন বাংলা সন অপেৰা ১১ দিন প্রতিবছর এগিয়ে যায়৷ ফলে ৯৬৩ থেকে ১৪০৬ বাংলা সনের মধ্যে হিজরি সন এগিয়ে গেছে ১৪ বছরেরও বেশি৷
বাংলা মাসের নাম যেমন_ বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ ইত্যাদি আমরা পেয়েছি নৰত্রপুঞ্জ থেকে৷ বর্তমান ভারতের জাতীয় সন হচ্ছে শকাব্দ৷ রাজা চন্দ্রগুপ্ত খ্রিস্টপূর্ব ৩১৯ অব্দে ও গুপ্তাব্দ প্রবর্তন করেন৷ এই সন পরে ‘বিক্রমান্দ’ নামে অভিহিত হয়৷ এই ‘অব্দ’ প্রথমে শুরম্ন হত চৈত্র মাস থেকে৷ পরে কার্তিক মাসকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়৷ শক সনের স্মারক হিসেবে ৭৮ খ্রিস্টাব্দে শকাব্দ চালু করা হয়৷ সৌরভিত্তিক শকাব্দের রবিমার্গের দ্বাদশ রাশির প্রথম মেষ অনত্মর্গত পুনচন্দ্রিকাপ্রাপ্ত প্রথম নৰত্র নিশাখার নামানুসারে বছরের প্রথম মাসের নাম রাখা হয় বৈশাখ৷ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, নাৰত্রিক নিয়মে বাংলা সনের মাসগুলোর নাম নিম্নে বর্ণিত নৰত্রগুলোর নাম থেকে উদ্ভূত হয়েছে৷
মাসের নাম সংশিস্নষ্ট নৰত্রের নাম
বৈশাখ-বিশাখা, জ্যৈষ্ঠ-জ্যৈষ্ঠা, শ্রাবণ-শ্রাবণা, ভাদ্র -ভাদ্রপদা, আশ্বিন-আশ্বিনী, কার্তিক-কার্তিকা, অগ্রহায়ণ -অগ্রহায়ণ, পৌষ-পৌষা, মাঘ-মঘা, ফাল্গুন-ফাল্গুনী, চৈত্র-চিত্রা৷
ফসলি সন যখন প্রবর্তিত হয়, তখন কিন্তু ১২ মাসের নাম ছিল কারওয়াদিন, আরদি ভিহিসু, খারদাদ, তীর, আমরারদাদ, শহরিয়ার, মিহির, আবান, আয়ুব, দাস, রাহমান ও ইসকান্দার মিষ৷
প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা সনের প্রথম মাস কোনটি ছিল সে বিষয়ে কিঞ্চিত্ মতানৈক্য রয়েছে৷ অতীতে আমাদের নববর্ষের দিন ছিল পহেলা অগ্রহায়ণ৷ অর্থাত্ ‘হায়ন’ বা বছরের প্রারম্ভে যায় যে মাস তার প্রথম দিন ছিল আমাদের নববর্ষের দিন; কিন্তু ৯৬৩ হিজরিতে যখন ফসলি সন বা বাংলাসন শুরম্ন করা হয়, তখন হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম, বৈশাখ মাসের সঙ্গে মিলে যায়৷ ফলে, এদেশে ১ বৈশাখই নওরোজ বা নববর্ষ হিসেবে চিহ্নিত হয়৷ উলেস্নখ্য, ইংরেজি তথা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের ৰেত্রে প্রথমে ১ মার্চ ছিল নিউ ইয়ারস ডে; কিন্তু পরে পহেলা জানুয়ারি সে সম্মানজনক স্থান দখল করে নেয়৷ সম্রাট আকবরের সময় মাসের প্রতিটি দিনের জন্য পৃথক পৃথক নাম ছিল৷ সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে ওই জটিল প্রথা পরিহার করে সপ্তাহের সাতটি দিনের জন্য সাতটি নাম নির্ধারণ করা হয়৷ বর্তমানে ব্যবহৃত ওই সাতটি নামের সঙ্গে রোমান সাপ্তাহিক নামগুলোর সাদৃশ্য সহজেই পরিলৰিত হয়৷ অনুমিত হয় যে, বাদশা শাহজাহানের দরবারে আগত কোনো ইউরোপীয় (সম্ভবত পতর্ুগিজ) মনীষীর পরামর্শক্রমে মূলত গ্রহপুঞ্জ থেকে উদ্ভূত নিম্নে বর্ণিত নামগুলোর প্রচলন করা হয় : (১) রবি (সূর্যা) ঝঁহ বা সূর্য থেকে (২) সোম (চন্দ্র) গড়হধহ অর্থাত্ গড়ড়হ থেকে (৩) মঙ্গল সধত্ং বা মঙ্গলগ্রহ থেকে (৪) বুধ গবঃপঁবু বা বুধগ্রহ থেকে (৫) বৃহস্পতি ঔঁঢ়রঃপব বা বৃহস্পতি গ্রহ থেকে (৬) শুক্র ভত্রমম (বা াবহঁং) থেকে এবং (৭) শনিবার ংধঃঁঃহ বা শনি গ্রহ থেকে৷
পাশ্চাত্য জগতে ঝঁহকে মূল করে ঝঁহফধু মাধ্যমে সপ্তাহ শুরম্ন করা হয়৷ বাংলা সপ্তাহ ও ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমী কতর্ৃক বহুভাষাবিদ জ্ঞান তাপস ড. মুহম্মদ শহীদুলস্নাহর তত্ত্বাবধানে বাংলা সনে যুগোপযোগী সংস্কার সাধিত হয়৷ অধিবর্ষের ব্যবস্থাসহ দিন ও তারিখাদির অনিয়ম সংশোধন করে নিম্নে বর্ণিত সিদ্ধানত্মগুলো গৃহীত হয়৷
(১) মোগল আমলে বাদশাহ আকবরের সময়ে হিজরি সনভিত্তিক যে বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করা হয় তা থেকে বছর গণনা করতে হবে৷
(২) বাংলা মাস গণনার সুবিধার্থে বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যনত্ম প্রতিমাস ৩১ দিন হিসাবে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যনত্ম ৩০ দিন হিসাবে গণনা করা হবে৷
সংশোধিত এই বাংলা সনকে কিন্তু সহজে কেউ গ্রহণ করেনি৷ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের স্বীকৃতি প্রদানের ৰেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলো যে রকম গড়িমসি করেছিল, বাংলা একাডেমী কতর্ৃক সংশোধিত বাংলাসন গ্রহণের ৰেত্রে বাংলাদেশেও কিন্তু কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা যায় দেখা যায়৷ ফলে, সংশোধনের প্রায় এক যুগ পর ১৯৮৮ সালে ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার কতর্ৃক বাংলা সনের সংশোধিত রূপ স্বীকৃত হয়৷ সন হিসেবে বাংলা সন নিঃসন্দেহে অতীব কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত বলে বিবেচিত হয়৷ এর কারণ হলো, এটি একই সঙ্গে চন্দ্র (খঁত্ধহ) ও সৌর (ঝড়ষধত্) পদ্ধতির সার্থক উত্তরাধিকারী৷
No comments yet