বর্ষশেষ ও পয়লা বৈশাখ : বাঙালির জাতিসত্তা নবায়নের দিন – আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী

বৈশাখী উত্‍সব শুধু বাঙালিরা নয়, পাঞ্জাবিরাও পালন করে৷ আমি লন্ডনের হ্যারো এলাকায় বাস করি৷ এখানে পাঞ্জাবের বহু শিখ হিন্দু ও মুসলমানের বাস৷ প্রতি বছরই পাঞ্জাবি বন্ধুদের কাছ থেকে বৈশাখী উত্‍সবের আমন্ত্রণ পাই৷ তবে পাঞ্জাবি মুসলমানরা এদিনটি পালন করেন বলে মনে হয় না৷ পাঞ্জাবিদের বৈশাখী উত্‍সবে তাদের ধর্মীয় আচার-আচরণের ছাপটা বেশি থাকে৷ এটা আসলে ধর্মীয় আচার-আচরণ নয়; বহু যুগ ধরে অমুসলিম পাঞ্জাবিদের দ্বারা আচরিত তাদের লোকজ রীতিনীতি৷ অনেক দেশের মুসলমানরাও তাদের অমুসলমান পূর্বপুরম্নষদের লোকজ আচার-আচরণ অনুসরণ করে চলেন, যেমন ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারের মুসলমানরা৷ এমনকি সউদি আরবের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানও তা করেন৷
পাঞ্জাবিদের বৈশাখী উত্‍সব এবং বাঙালিদের পয়লা বৈশাখের নববর্ষ উত্‍সব একই মাসে অনুষ্ঠিত হয়, তবে একই দিনে নয়৷ তবে দুটি উত্‍সবই নাচগানের আমেজে ভরপুর৷ পাকিসত্মানের পাঞ্জাবের মুসলমানরা বৈশাখী উত্‍সব পালন করে কি না আমার জানা নেই; কিন্তু বাংলা ভাগ হওয়ার পরও দুই বাংলাতেই পয়লা বৈশাখের নববর্ষ উত্‍সব একটি সর্বজণীন উত্‍সব হিসেবে পালিত৷ ছোটবেলায় (অবিভক্ত বাংলায়) দেখেছি, পয়লা বৈশাখ ছিল ধর্ম-গোত্র নির্বিশেষে সব বাঙালির একটি লোকউত্‍সব৷ তাতে ধর্মীয় আচার-আচরণের ছাপ থাকত না তা নয়; কিন্তু তা সব ধর্মের বাঙালির কাছেই ছিল আদিকাল থেকে পালিত আচার-আচরণ৷
আমার জন্ম পূর্ববাংলার (বর্তমানে বাংলাদেশ) এক মুসলমান জমিদার বংশে৷ সেই ব্রিটিশ আমলে, পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেও দেখেছি, প্রতি বছর আমাদের জমিদারি কাচারিতে পয়লা বৈশাখে শুভ পুণ্যাহ অনুষ্ঠিত হতো৷ প্রজাদের জন্য হালখাতা খোলা হতো৷ তাতে সিঁদুর মাখানো একটি রম্নপার টাকার ছাপ দেওয়া হতো৷ উত্‍সবে থাকত সবার ঢালাও আমন্ত্রণ৷ ভূরিভোজের পর হতো দফায় দফায় মিষ্টান্ন বিতরণ৷ বিকেলে জমিদারবাড়ির কাচারির সামনে হতো লাঠিখেলা অথবা শড়কি খেলার আয়োজন৷
রাতে বসত গানের আসর৷ শুধু গ্রামের বয়াতিরা নয়, দূরের গ্রাম-গ্রামানত্মর থেকে অর্থের বিনিময়ে কবিয়ালদের ও গায়েনদের ডেকে এনে কবির আসর, গানের আসর বসানো হতো৷ বিরাট সামিয়ানার নিচে রাতভর চলত এ গানের আসর৷ তারপর শুরম্ন হতো তিনদিনব্যাপী বৈশাখী মেলা৷ এ মেলায় গ্রামের কুটিরশিল্পজাত পণ্যের যে বিপুল সমাহার ঘটত, তাতে পাওয়া যেত সেকালের বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির বুনিয়াদি ভিত্তিটার সন্ধান৷
সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ হওয়ার পর রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মান্ধতাকে এতটা প্রশ্রয় দেওয়া হয় যে, এ ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতায় ভেদবুদ্ধির আঘাত বাঙালির সমাজ-সংস্কৃতির ওপরও এসে পড়তে থাকে৷ জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হওয়ায় গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে পূর্ববাংলায় শুভ পুণ্যাহ, বৈশাখী মেলা, চৈত্রসংক্রানত্মির মেলা, বসনত্ম উত্‍সব, হৈমনত্মী ও নবান্ন উত্‍সব ইত্যাদি উত্‍সব প্রায় বিলুপ্তির পথে যায়৷ মোলস্নাদের ফতোয়ার ফলে এ উত্‍সবগুলো ইসলামবিরোধী উত্‍সব বলে চিত্রিত হয়৷ যাত্রা, জারি, সারি গানের আসর, কবির লড়াই ইত্যাদিও নিরম্নত্‍সাহিত হতে থাকে ফতোয়ার প্রতাপে৷ এটা দেশ ভাগ-পরবতর্ী পূর্ববাংলার চিত্র৷ পশ্চিমবঙ্গের চিত্রটা অবশ্য ভিন্ন৷ এখানে রাষ্ট্রের বা সরকারের সাম্প্রদায়িক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় ধর্ম-সংস্কৃতি অসাম্প্রদায়িক লোকজ সংস্কৃতির গলা তেমনভাবে টিপে ধরতে পারেনি৷
এটা মুদ্রার এক পিঠের ছবি৷ সাতচলিস্নশের দেশ ভাগের পর মুদ্রার অপর পিঠের ছবিটা আবার অন্যভাবে বদলাতে শুরম্ন করে৷ পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় তো এমনিতেই কয়েক প্রজন্মের শক্তিশালী সম্প্রদায়৷ তাদের মধ্যে আধুনিক নাগরিক চেতনা দেশ ভাগের আগে থেকেই ছিল, স্বাধীনতার পর তা আরও ব্যাপ্তি লাভ করে৷ আগে কলকাতায় পয়লা বৈশাখ ছিল মধ্যবিত্তের বৈঠকি উত্‍সব৷ ক্রমশ তা বৈঠকখানা পেরিয়ে মাঠে-ময়দানে ছড়িয়ে পড়ে৷ শিৰিত মধ্যবিত্তের হাতে পড়ে নববর্ষ উত্‍সবের নাগরিক চেহারায় রূপানত্মর ঘটে৷ গ্রামাঞ্চলের মেলা বা উত্‍সবের পাশাপাশি শহরাঞ্চলে ইংরেজি নববর্ষের কায়দায় নববর্ষ উত্‍সের রূপানত্মর হয়৷ ইংরেজি নিউ ইয়ার্স গ্রিটিংস কার্ডের মতো শুভ নববর্ষের শুভেচ্ছা কার্ড মুদ্রণ ও বিতরণ (বিনিময়) শুরম্ন হয়৷ পশ্চিমবঙ্গে পয়লা বৈশাখ শহরাঞ্চলে এখন পুরোপুরি একটি আধুনিক নাগরিক উত্‍সব৷
পূর্ববঙ্গে বা বর্তমান বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখ উদযাপনে নাগরিকতার ছাপ লাগতে একটু দেরি হয়েছে৷ প্রথমত দেশ ভাগের সময় বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণী ছিল একেবারেই স্ফুটনোন্মুখ৷ তার ওপর রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িকতার ছাপটা তাদের মনে ছিল প্রবল৷ কৃষিভিত্তিক সমাজের নাগরিক বিবর্তনের গতিটাও ছিল শস্নথ৷ গ্রামাঞ্চলে মৌলবাদীদের সামাজিক প্রতিষ্ঠা বেড়ে যাওয়ায় পশ্চাত্‍পদ ধর্ম সংস্কৃতি লোকায়ত সংস্কৃতির বিকাশ তো ঘটতেই দেয়নি, তাকে প্রায় বিলুপ্ত করতে চলেছিল৷
এটা শেষ পর্যনত্ম সম্ভব হয়নি প্রধানত সমাজের সচেতন ও অগ্রসর শ্রেণী হিসেবে পরিচিত ছাত্রসমাজের ভাষা আন্দোলনের ফলে৷ হাজার বছরের ঐতিহ্য দ্বারা সমৃদ্ধ বাংলা ভাষাকে ‘হিঁদুয়ানি ভাষা’ আখ্যা দিয়ে এ ভাষার ওপর আঘাত দিতে গিয়েই পাকিসত্মানের অবাঙালি শাসক সম্প্রদায় তাদের সবচেয়ে বড় ভুলটি করে বসে৷ ফলে ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবীসমাজ এবং শিৰিতসমাজের একটা বড় অংশ সচেতন হয়ে ওঠে৷ তারা প্রথমে প্রতিবাদী হয়, তারপর প্রতিরোধ গড়ে তোলে৷
মোটাবুদ্ধির পাকিসত্মানি শাসকরা কেবল বাংলা ভাষার মাথাতেই উদ্যত খড়গ তুলে ৰানত্ম হয়নি; তারা বাঙালির হাজার বছরের লোকায়ত সমাজ-সংস্কৃতির মূলোত্‍পাটনেই চেষ্টিত হয়৷ তাদের এ চেষ্টায় রবীন্দ্রসংগীত বর্জন, নজরম্নলসংগীত কর্তন থেকে শুরম্ন করে বাংলা নববর্ষ উত্‍সব বাতিল করাকেও টার্গেট করা হয়েছিল৷ করাচি ও লাহোর থেকে কিছু উদর্ুভাষী আলেম ছাপমারা ব্যক্তিকে ঢাকায় পাঠিয়ে প্রচার চালানো হতো বাংলা নববর্ষ, নবান্ন, শারদ বা বসনত্ম উত্‍সব পালন করা মুসলমানদের জন্য ‘বেদাত’ (ধর্মবিরোধী) কাজ৷ ১৯৫৩ সালে করাচি থেকে পাঠানো পাকিসত্মানের এক ধর্মীয় পীর আলস্নামা সোলায়মান নদভি ঢাকায় এসে কার্জন হলের সমাবেশে এ ধরনের ফতোয়া দিয়ে বাঙালি ছাত্রদের হাতে প্রহৃত হওয়ার ভয়ে পুলিশ পাহারায় পলায়ন করেন৷
একথা সত্য, সাতচলিস্নশের বাংলা ভাগের পর বাংলার পূর্বাংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ দ্রম্নততর হয়৷ রাজধানী ঢাকায় সামনত্মযুগীয় কালচারেও আধুনিক নগর সংস্কৃতির ছোঁয়া লাগতে শুরম্ন করে৷ প্রথমে কিছু শিৰিত মধ্যবিত্তের বাড়িতে সনত্মর্পণে ও ঘরোয়াভাবে বাংলা নববর্ষ উত্‍সব পালন শুরম্ন হয়৷ গ্রাম্যমেলা বা উত্‍সবের খোলস পাল্টে শহরগুলোতে নববর্ষ উত্‍সব শিৰিত মধ্যবিত্তের নাগরিক উত্‍সব হয়ে ওঠে৷ তাতে সাধারণ জনসমাজও যোগ দিতে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে৷ এটা আরও ব্যাপক হয়ে ওঠে মুক্তবুদ্ধির প্রয়াত পুরম্নষ ওয়াহিদ উল হক ও তার স্ত্রী সনজিদা খাতুনের নেতৃত্বে প্রাথমিকভাবে রবীন্দ্রসংগীত প্রসারের জন্য প্রতিষ্ঠিত ছায়ানট সংগীত স্কুল কাজ শুরম্ন করার পর৷ ঢাকায় রমনার বটমূলে, নারিন্দার বলধা গার্ডেনে বাংলা নববর্ষ, শারদ ও বসনত্ম উত্‍সব পালন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে৷
বৈশাখ মাস শুধু বাঙালির নতুন বছর শুরম্নর মাস নয়৷ বাঙালির মর্মচেতনার কবি রবীন্দ্রনাথেরও জন্মগ্রহণের মাস৷ পয়লা বৈশাখে ও ২৫ বৈশাখে তাই বাংলা ভাষাভাষী মানুষ যে যেখানেই থাকেন, বাঙালির ভাষা-সংস্কৃতির অখ- চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন৷ এই মাসটাকেই তাই সবচাইতে বেশি ভয় পেতেন পাকিসত্মানের অবাঙালি এবং সাম্প্রদায়িক শাসকরা৷ পয়লা বৈশাখ উদযাপনকে তো বেদাত ও বেশরিয়তি বলে ফতোয়া দেওয়ানো গেল৷ কিন্তু রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রজন্মজয়নত্মী পালন করা নিয়ে কী করা যায়? ক্রীতদাস বুদ্ধিজীবী সব দেশেই পাওয়া যায়৷ বাংলাদেশেও পেতে পাকিসত্মানি শাসকদের অসুবিধা হয়নি৷ এই ক্রীতদাস বুদ্ধিজীবীরা ফতোয়া দিলেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু কবি (তিনি যে ধর্মমতে ব্রাহ্ম ছিলেন একথাটা গোপন রাখার চেষ্টা হয়েছিল) এবং তার কবিতা মুসলমানদের মন-মানসিকতার উপযোগী নয়, সুতরাং তার জন্মদিবস উদযাপন বর্জন করা দরকার৷ তার বদলে প্রায় একই সময়ে কবি ইকবালের মৃতু্যদিবস (২১ এপ্রিল) তা পালন করা হোক৷ তিনি মুসলমানদের জাতীয় কবি৷ সুতরাং পাকিসত্মানের পূর্বাংশে বাংলাদেশেও কবি ইকবালের মৃতু্যদিবস সরকারিভাবে উদযাপনের ব্যবস্থা হয়৷ সরকারের এ চেষ্টা সফল হয়নি৷
বাংলাদেশে বাংলাভাষার ওপর যত আঘাত এসেছে, সেই আঘাত বৈশাখের নববর্ষ দিবসের ওপরও ততটাই বর্ষিত হয়েছে৷ গোটা পাকিসত্মানি আমলে স্কুল-কলেজে এ দিবসটি পালনে বাধা দেওয়া হয়েছে৷ তার বদলে ইংরেজি নববর্ষ পালনে উত্‍সাহ জোগানো হয়েছে৷ সম্ভবত সউদি আরবের বর্ষ শুরম্নর মাস মহররমের প্রথম দিনটিকে পাকিসত্মানেরও নববর্ষ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হতো৷ কিন্তু দেড় হাজার বছর আগে মহররম মাসের দশ তারিখে কারবালার যুদ্ধে হজরত মোহাম্মদ (দঃ)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন নিহত হন৷ গোটা মহররম মাসই মুসলমানদের কাছে শোকের মাস৷ ফলে পয়লা মহররমে কোনো উত্‍সব করা যায় না৷
পাকিসত্মানে বাঙালিদের নববর্ষ উত্‍সব হিসেবে পয়লা বৈশাখকে উত্‍খাত করার জন্য সেই আমলে আরেকটি চক্রানত্ম হয়েছিল৷ পাকিসত্মানের ফৌজি প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা দ্বিতীয় বিবাহ করেছিলেন এক ইরানি সুন্দরী মহিলাকে৷ তার নাম নাহিদ মির্জা৷ তার পরামর্শে প্রেসিডেন্ট মির্জা প্রসত্মাব তুলেছিলেন, ইরানের নওরোজ উত্‍সবকে (নববর্ষ উত্‍সব) পাকিসত্মানের নববর্ষ উত্‍সব পালনের দিন হিসেবে গ্রহণের জন্য৷ যুক্তি ছিল ইরানের ভাষা ফারসি৷ বাংলা ভাষায় লেখা পাকিসত্মানের প্রথম জাতীয় সংগীত (বেসরকারিভাবে আট-নয় বছর যাবত্‍ ব্যবহৃত) বর্জন করে কবি হাফিজ জলন্ধরি (ভারতীয় কবি) কতর্ৃক ফারসি ভাষায় রচিত জাতীয় সংগীত সরকারিভাবে গৃহীত হয়েছে৷
এসব যুক্তি ধোপে টেকেনি পাকিসত্মানে শিয়া-সুনি্ন বিবাদের জন্য৷ ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী শিয়া, পাকিসত্মানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা সুনি্ন৷ ইস্কান্দার মির্জা ও তার স্ত্রী শিয়া ছিলেন৷ তা সত্ত্বেও ইরানের নওরোজ দিবসকে পাকিসত্মানের নববর্ষ দিবস হিসেবে পালনের ব্যবস্থা করা যায়নি৷ পাকিসত্মানের সুনি্ন সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী আলেমরা বলে বসলেন, প্রাচীন পারসিকরা (ইরানিরা) ছিল অগি্নপূজক৷ তাদের নববর্ষ উত্‍সব ছিল নওরোজ৷ পারসিকরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পরও তাদের অগি্নপূজক পূর্বপুরম্নষদের সামাজিক রীতিনীতি, উত্‍সব, আচরণ ত্যাগ করেননি৷ এই অগি্নপূজকদের নববর্ষ উত্‍সব নওরোজকে পাকিসত্মানের নববর্ষ উত্‍সব হিসেবে গ্রহণ করা যায় না৷
পাকিসত্মানে পয়লা বৈশাখকেই জাতীয় নববর্ষ উত্‍সবের দিন বলে গ্রহণ করার দাবি উঠেছিল সেই পঞ্চাশের দশকের শেষদিকেই৷ একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী অত্যনত্ম জোরালোভাবে দাবিটি তুলেছিলেন৷ তিনি বলেছিলেন নওরোজ যেমন প্রাচীন অগি্নপূজক পারসিকদের আধা ধর্মীয় উত্‍সব ছিল, পয়লা বৈশাখ তেমন উত্‍সব কোনোকালে ছিল না৷ বরং শুরম্ন থেকেই পয়লা বৈশাখ ছিল একটি লোকজ উত্‍সব৷ পাকিসত্মানের অধিবাসীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বাঙালি৷ তাদের লোকজ উত্‍সবকে অবশ্যই পাকিসত্মানের জাতীয় নববর্ষ দিবস হিসেবে গ্রহণ করা যায়৷ তত্‍কালীন আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খান ও আবুল মনসুর আহমেদের কাছে মুনীর চৌধুরী অনুরোধ জানিয়েছিলেন প্রসত্মাবটি যাতে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়৷ তারা তাতে রাজি হননি৷ এমনকি বিষয়টি নিয়ে একটি বিতর্ক ও সংলাপ শুরম্ন করার ব্যাপারেও সম্মতি দেননি৷ ফলে এ ব্যাপারটি সাধারণ মানুষের গোচরেও কখনো যায়নি৷
বাঙালির অখ- সাংস্কৃতিক সত্তা সম্পর্কে পাকিসত্মানি শাসকদের কী ভয়ানক ভীতি ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলা নববর্ষ দিবসটির ওপরও তাদের প্রচ- আক্রোশের মধ্যে৷ বাংলাদেশে পাকিসত্মানি শাসনের চবি্বশ বছরে প্রায় প্রতি বছরেই কোথাও না কোথাও বৈশাখী মেলার ওপর হামলা তো হয়েছেই, তদুপরি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশে পাকিসত্মানি হানাদারদের গণহত্যা শুরম্ন হওয়ার পর এপ্রিল মাসের গোড়ায় হানাদারদের বাঙালি কোলাবরেটর নেতা খুলনার আবদুস সবুর খান অধিকৃত ঢাকা বেতার থেকে প্রচারিত ভাষণে বাংলাদেশের মানুষকে পয়লা বৈশাখ ও পঁচিশে বৈশাখ বর্জন করে নিজেদের খাঁটি পাকিসত্মানি প্রমাণের আহ্বান জানান৷
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও পয়লা বৈশাখের ওপর হামলা শেষ হয়নি৷ কয়েক বছর আগে রমনার বটমূলে উদীচী আয়োজিত বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানেই মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা ভয়াবহ হামলা চালিয়েছিল৷ তাতে অসংখ্য নিরীহ নর-নারীর মৃতু্য ঘটে৷ কিন্তু এত হামলা, এত সন্ত্রাস সত্ত্বেও বাংলাদেশের বাঙালির হৃদয় থেকে তাদের সেকু্যলার জাতিসত্তার চেতনা বিলুপ্ত করা সম্ভব হয়নি৷ বরং কয়েক বছর ধরে রমনায় অনুষ্ঠানের নৃশংসতা সত্ত্বেও পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে ঢাকায় যে জনজোয়ার সৃষ্টি হয় তা এক কথায় বিস্ময়কর৷ সারা বাংলাদেশে এই দিনে কোটি কোটি মানুষ আবার তাদের ‘বাঙালি-স্বরূপ’ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে৷ তা দেখে ঢাকার একটি কাগজ মনত্মব্য করেছিল_ ‘এ যৌবন জলতরঙ্গ রোধিবে কে দিয়া বালির বাঁধ?’
আমার এক পাকিসত্মানি সাংবাদিক বন্ধু গত বছর ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী বাংলাদেশের অবস্থা স্বচৰে দেখার জন্য ঢাকায় গিয়েছিলেন৷ তিনি লন্ডনেই বসবাস করেন৷ আমার সঙ্গে দেখা হতেই বললেন, বাংলাদেশে বাঙালির জাতিসত্তা, ভাষা, সংস্কৃতি ধ্বংস করার জন্য পাকিসত্মানি আমল থেকে শুরম্ন করে বর্তমানেও যত চেষ্টা হয়েছে এবং হচ্ছে, তারপরও বাঙালিদের মধ্যে বাঙালিত্বের অপরাজেয় অসত্মিত্ব দেখে বিস্মিত হতে হয়৷ মনে হয় এই ভাষা-সংস্কৃতির একটা প্রাণভোমরা কোনো গোপন কৌটায় লুক্কায়িত আছে, যাকে খোঁজ করে হত্যা করা কোনো হামলাকারীর পৰেই সম্ভব নয়৷
আমি তাকে কিছু বলিনি৷ কিন্তু মনে মনে জানি, বাঙালির মুখে যতদিন বাংলা ভাষা আছে, হৃদয়ে আছে চর্যাপদ থেকে রবীন্দ্রনাথ ও নজরম্নল আর আছে তাদের অসত্মিত্ব রৰার জন্য পয়লা বৈশাখের মতো লোকজ উত্‍সবগুলোর দুর্ভেদ্য দেয়াল, ততদিন বাংলাদেশে কোনো চক্রানত্ম বাঙালির অসত্মিত্ব এবং তাদের বাঙালিয়ানা ধ্বংস করতে পারবে না৷ য়
লন্ডন \\ ১২ এপ্রিল, শনিবার, ২০০৮ \\

No comments yet

উত্তর রেখে যান

You must be logged in to post a comment.