কোচবিহারের রাজপ্রাসাদ

শৈশবে কোচবিহারকে দেখার জন্য উন্মনা হয়ে উঠেছিলাম৷ মনে পড়ে দু’-চারজন বন্ধু কোচবিহারকে ‘কুচবিহার’ বলতো৷ ওখানে প্রথম গিয়েছিলাম ১৯৭২ সালে তখন বয়স উনিশ কি বিশ ছিলো৷ কোচবিহারকে দেখে ভাল লাগলেও একটা দিনের বেশি ওখানে থাকা সম্ভব হয়নি৷ কোচবিহারকে পূর্ণাঙ্গভাবে না দেখার কারণে মনে অনুশোচনাই যে থেকে গেলো৷ ১৯৯৪ সালে দার্জিলিং থেকে ফিরবার পথে কোচবিহার হয়েই কলিকাতা যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও তা আর হলো না৷ অবশেষে বহুবছর পরে সম্প্রতি কোচবিহার দেখার জন্য মনটা উতলা হয়ে উঠল৷ যে করেই হোক কোচবিহারে গিয়ে নিজেকে এবার ক্যামেরায় বন্দী করবো বলেই কলিকাতা থেকে দুপুর ২টায় ছেড়ে যাওয়া রকেট বাসে উঠে পরদিন সকাল ৯টায় গিয়ে পেঁৗছলাম কোচবিহারে৷ প্রথম দর্শনেই মনে হলো, এ যেনো কোনো এক রাজকীয় শহর৷ ইলোরা হোটেলে লাগেজ রেখেই মোবাইল ক্যামেরা ও একটি স্টিল ক্যামেরা নিয়ে ছুটলাম রাজপ্রাসাদ দেখার জন্য৷ সম্মুখে এসেই মনে কী যেনো এক শিহরণ জেগে উঠল৷ স্থানীয় একজন বাসিন্দা জানালেন, এই রাজপ্রাসাদ তৈরি হয়েছিল সোয়াশ’ বছর আগে৷ তবু এখনো পুরনো এই প্রাসাদটি তার গঠন নৈপুণ্যে পর্যটককে আকৃষ্ট করে৷ রাজস্থানের যোধপুরের উমেদ ভবন প্যালেসকে এর আগে দেখেছি, কিন্তু কোচবিহার রাজপ্রাসাদকেই আমার কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হলো৷ বহুদূর থেকে অন্ধকার প্রানত্মরের মাঝখানে আলো ঝলমলে প্রাসাদটিকে দেখে মনে হয় যেন আরব্যরজনীর জাদুপুরী৷ শনি-রবিবার সাদা ও বাদামি রঙের প্রাসাদটির প্রতিটি প্রকোষ্ঠে ও থামের গায়ে লাগানো আলো জ্বলে ওঠে সন্ধে ছ’টা বাজতে না বাজতেই৷ সামনের লাগোয়া পুষ্করিণীর বুকে প্রতিবিম্বিত হয় আলোকোজ্জ্বল রাজমহল৷

এ রাজ্যে এ ধরনের স্থাপত্য রীতির সংখ্যা খুবই কম৷ অতীত গৌরবের সাৰ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে এই রাজপ্রাসাদ৷ কোচবিহারের রাজপ্রাসাদ ইতালীয় স্থাপত্য কলার অনুসরণে গম্বুজ ও খিলানের সাহায্যে দ্বিতল এই প্রাসাদটি তৈরি করা হয়েছিল৷ প্রবেশ তোরণ থেকে প্রাসাদের দূরত্ব প্রায় দুশো মিটার৷ দু’পাশে সুন্দর বাগান ও জলাশয়৷ এখানে থেকে থেকেই হলুদ আলো বসানো৷ সন্ধে বেলায় সেখান থেকে আলো ঠিকরে পুরো চত্বরটিকে আলোকিত করে তোলে৷ দ্বিতল এই প্রাসাদটি ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ তৈরি করান৷ মূল গম্বুজটির দু’পাশের অংশে সত্মম্ভ ও খিলানের অভূতপূর্ব সনি্নবেশ ঘটেছে৷ মূল গম্বুজটির তলায় দরবার হল৷ এখানের সৌন্দর্য যেনো অতুলনীয়৷ মাটি থেকে ১২৪ ফুট উঁচু হলটির চার দিকে সুবিশাল চারটি খিলান৷ খিলানগুলো আবার বিশাল বিশাল করিন্থিয়ান পিলারের ওপরে বসানো৷ তার মধ্যে দিয়ে আলো ছুঁইয়ে এসে চমত্‍কার আলোকসজ্জার সৃষ্টি করে৷ প্রাসাদটির প্রধান স্থপতি ছিলেন মার্টিন৷ কাজের দায়িত্বে ছিল ম্যারলিয়র অ্যান্ড একওয়ার্ডস সংস্থা৷ ১৮৮৭ সালে ৮, ৭৭, ২০৩ টাকা ব্যয়ে এই প্রাসাদটি নির্মিত হয়৷ এই প্রাসাদটির আয়তন ৫১৩০৯ বর্গফুট৷ এটি দৈর্ঘ্যে ৩৯৫ ফুট ও প্রস্থে ২৯৬ ফুট৷ একতলা ও দোতলা মিলিয়ে মোট ঘরের সংখ্যা ৬৯টি৷ এখানের দরজা-জানালায় ব্যবহৃত কাঁচ আনা হয়েছিল বেলজিয়াম থেকে৷ মার্বেল এসেছিল রাজমহল থেকে৷ দ্বিতল এই প্রাসাদটি নির্মাণ করিয়েছিলেন মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ৷ কোচবিহারের অন্যতম আরেক আকর্ষণ মদন মোহন মন্দিরটিও তিনি নির্মাণ করিয়েছিলেন৷ সন্ধ্যায় এই মন্দিরে গিয়ে ধূপ, ধুনো, কাঁসর ঘন্টার আওয়াজে কেমন যেনো মোহমায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম৷ বহুদিন পরে কোচবিহারে এসেছিলাম বলেই হয়তো এবার কোচবিহার থেকে ফিরে আসতেই মন চাইছিলো নাঃ.৷ আবারও যে ওখানে যাবো রাজপ্রাসাদের টানে৷

No comments yet

উত্তর রেখে যান

You must be logged in to post a comment.