শায়খুল হাদিসের মাদ্রাসা দখল

saikul

শায়খুল হাদিসের মাদ্রাসা দখল

অন্য সাধারণ রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীর মতোই দেশের প্রবীণ আলেম ও খেলাফত মজলিসের আমীর শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকও চারদলীয় জোট সরকারের সময় মোহাম্মদপুর জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসাটি দখল করে নিয়েছিলেন৷ চারদলীয় জোটের শীর্ষ নেতা হওয়ার দাপটে পুলিশ প্রশাসনের ছত্রচ্ছায়ায় ৫ সন-ান ও ৬ নাতিসহ পুতরা মুফতি শহীদুল ইসলাম এমপি ও তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে মাদ্রাসাটি দখল করেন শায়খুল হাদিস৷ শুধু তাই নয়, শায়খুল হাদিস মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও সরকার অনুমোদিত পরিচালনা পরিষদের সদস্যদেরও মাদ্রাসাছাড়া করেন৷ বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাদ্রাসা থেকে বিতাড়িত বৈধ পরিচালনা কমিটি মাদ্রাসার কতর্ৃত্ব ফিরে পেতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যৌথ বাহিনী, র্যাব ও মোহাম্মদপুর থানার দ্বারস্থ হয়েছে৷ গত ১২ ফেব্রুয়ারি জামিয়া রাহমানিয়ার মোতাওয়ালি্ল ও সভাপতি আহমদ ফজলুর রহমান, ওয়াকিফ আলহাজ মুহাম্মদ আলী ও মহাসচিব আলহাজ আবদুর রহীম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন৷ তারা মাদ্রাসার প্রকৃত পরিচালকদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন৷ অবশ্য জামিয়া রাহমানিয়ার প্রকৃত পরিচালনা কমিটি বিতাড়িত হওয়ার পর ২শ’ গজ দূরে অভিন্ন নামে আরেকটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন৷ জামিয়া রাহমানিয়া থেকে বিতাড়িত অধ্যক্ষ মাওলানা হিফজুর রহমান ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ৷ বর্তমানে উভয় মাদ্রাসাতেই ছাত্রসংখ্যা প্রায় সমান৷ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হওয়ার পরপরই মাদ্রাসাটি পুনর্দখলের প্রস\’তি নেয়া হয়েছিল৷ কিন\’ সংকটাপন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তা আর হয়নি৷ জরুরি অবস্থা জারির পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়৷ এ নিয়ে দুই মাদ্রাসার ভেতর উত্তেজনা চলছে৷ সূত্র দাবি করেছে, জামিয়া রাহমানিয়া বেদখল হতে পারে_ এ আশংকায় গত রমজানে দুই মাদ্রাসায় বার্ষিক ছুটি কার্যকর করা হয়নি৷ দুই মাদ্রাসাতেই উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ছাত্রদের প্রস\’ত রাখা হয়েছিল৷
বিশিষ্ট ধর্মানুরাগী আলহাজ মুহাম্মদ আলী গং মোহাম্মদপুরের ঐতিহাসিক সাতমসজিদের পশ্চিম পাশে ১৯৮৬ সালে ১৬ কাঠা জমির ওপর মাদ্রাসাটির গোড়াপত্তন করেন৷ ‘৮৮ সালের ৯ নভেম্বর ও ‘৯২ সালের ৩ ডিসেম্বরে তারা পৃথক দুটি নিবন্ধিত দলিলে মাদ্রাসাটি ওয়াকফ করেন৷ যৌথ মূলধন কোম্পানি থেকে নিবন্ধনও করা হয়৷ জনগণের আর্থিক সহযোগিতায় মাদ্রাসাটি এখন ৫ তলা ভবনে রূপ নিয়েছে৷ শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক ছিলেন মাদ্রাসার একজন শিক্ষক৷ ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন৷ অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে বেশকিছু অনিয়ম-দুনর্ীতির অভিযোগ ওঠে৷ এর মধ্যে শায়খের ছেলে মাওলানা মাহফুজুর রহমান পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে বহিষ্কারের পরও তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগে চাপ দেন৷ পরে সেই মাওলানা মাহফুজুল হকই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হন৷ তার বিরুদ্ধে চারিত্রিক স্খলনেরও অভিযোগ রয়েছে৷ শায়খের ছেলে মামুনুল হককে উগ্রতা ও রাজনীতি সম্পৃক্ততার কারণে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার করা হলে শায়খ আবার তাকে ফিরিয়ে আনেন৷ নিজের ছেলে ও নাতিদের বেলায় তিনি কোন নিয়ম মানতেন না৷ শিক্ষক নিয়োগ ও অব্যাহতি প্রদানেও ব্যাপক অনিয়ম করেন৷ জানা গেছে, একবার মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মোস-াক আহমদ শরীয়তপুরী মাওলানা মাহফুজের বিরুদ্ধে সমকামিতার লিখিত অভিযোগ করেন৷ শায়খপুত্রের বিরুদ্ধে এ অভিযোগের বিচার না করে উল্টো অভিযোগকারী শিক্ষককে তাত্‍ক্ষণিকভাবে অব্যাহতি দেয়া হয়৷ মাদ্রাসার পাঠ্যবই ক্রয়ে দুনর্ীতির অভিযোগও রয়েছে৷ জানা গেছে, শায়খ তার নিজস্ব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রশীদিয়া লাইব্রেরি থেকে প্রতিবছর বেশি দামে কয়েক লাখ টাকার বই কিনতে মাদ্রাসা কতর্ৃপক্ষকে বাধ্য করতেন৷ একবার হজে থাকার কারণে একজন শিক্ষক মাওলানা গোলাম মাওলা অন্য লাইব্রেরি থেকে কম দামে বই কেনেন৷ তিনি হজ থেকে ফিরে এ ঘটনা শুনে ক্ষুব্ধ হন৷ এমনকি বই ফেরত দিতে বাধ্য করে ওই শিক্ষককে বহিষ্কার পর্যন- করেন৷ এ ধরনের বেশকিছু অনিয়ম ও দুনর্ীতির অভিযোগ প্রমাণ হলে শায়খ স্বেচ্ছায় ‘৯৯ সালের ১ আগস্ট অধ্যক্ষের পদ থেকে পদত্যাগ করে কেবল শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে থাকেন৷ কিন\’ এরপরও তিনি নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন৷ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে_ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তিনি দলীয় রাজনীতিতে ছাত্র-শিক্ষকদের জড়িত করেন৷ শায়খের ছেলেরা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে রাজনীতি করেন৷ এর মধ্যে চতুর্থ ছেলে মামুনুল হক ঢাকা মহানগর খেলাফত মজলিসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন৷ রাজনীতির অভিযোগে মামুনুল হকসহ ৫ ছাত্রকে কমিটির চাপে শায়খুল হাদিস নিজেই বহিষ্কার করে পরে আবার নিজের ছেলেকে ফিরিয়ে আনেন৷ শুধু তাই নয়, অভিযোগ রয়েছে প্রথম প্রথম মাদ্রাসার ছাদে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের মুফতি হান্নান গ্রুপকে প্র্রশিক্ষণ নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়৷ অবশ্য পরে ঘটনাটি জানাজানি হলে হরকতের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়৷
এসব অনিয়মের কারণে কমিটি শায়খুল হাদিসকে শিক্ষকতা ও পরিচালনা কমিটি দুটি থেকেই অব্যাহতি দেয়৷ এ অবস্থায় উত্তরবঙ্গের সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেম বেসরকারি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মাওলানা নুরুদ্দীন গওহরপুরীর অনুরোধে কমিটি শায়খকে মাদ্রাসায় একটি ক্লাস নেয়ার অনুমতি দেয়৷ কিন\’ তিনি মাদ্রাসার ক’জন শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে কুত্‍সা রটান৷ এর মধ্যে কোন নৈতিক ও যুক্তিসঙ্গত অধিকার ছাড়াই ২০০০ সালের ৬ মে আকস্মিক কয়েকশ’ দলীয় ক্যাডার ও সন-ানাদি নিয়ে মাদ্রাসা দখলের চেষ্টা চালান৷ কিন\’ পরিচালনা কমিটির প্রতিরোধের মুখে প্রথম দফায় তিনি ব্যর্থ হন৷ এ ঘটনায় শায়খকে শিক্ষকতা থেকে আবার অব্যাহতি দিলে বসুন্ধরা ইসলামিক রিচার্স সেন্টারের পরিচালক মুফতি আবদুর রহমান ও যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহমুদুল হাসানের অনুরোধে আবারও তাকে শর্তসাপেক্ষে অধ্যাপনার সুযোগ দেয়া হয়৷ কিন\’ ২০০০ সালের ১ জুলাই তিনি আবারও মাদ্রাসা দখলের চেষ্টা করলে কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়৷ চার মাসের মাথায় চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন৷ ২০০১ সালের ৩ নভেম্বর স্থানীয় বিএনপি ও পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় পুতরা মুফতি শহীদুল ইসলাম এমপি তার ক্যাডার বাহিনী এবং শায়খুল হাদিসের পরিবারের সদস্যরা মাদ্রাসাটি দখল করেন৷
অনুমোদনহীন পারিবারিক কমিটির মাধ্যমে পরে নিয়মবহিভর্ূতভাবে তিনি একচ্ছত্র আধিপত্যে মাদ্রাসাটি নিয়ন্ত্রণ করছেন৷ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মাদ্রাসার নাম ব্যবহার করে চাঁদা সংগ্রহ করছেন৷ মাদ্রাসাটিকে দলীয় রাজনীতিতে ব্যবহার করছেন৷ নিজের ছেলে-নাতিদের অধিকাংশকে শিক্ষক হিসেবে অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়েছেন৷ জোট সরকারের ৫ বছর ত্রাণের চাল নিজ খোরাকি ছাত্রদের কাছে বিক্রি করেছেন৷
এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে শায়খুল হাদিসের তৃতীয় ছেলে জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার অধ্যক্ষ মাওলানা মাহফুজুর রহমান যুগান-রকে বলেন, তারাও শুনছেন এবং কিছু পদক্ষেপের ব্যাপারে বুঝতে পারছেন_ প্রতিপক্ষরা জোর করে হলেও মাদ্রাসা দখল করবেন৷ তবে তারা পাল্টা কোন ব্যবস্থা না নিয়ে আইনের আশ্রয় নেবেন বলে তিনি জানান৷ তিনি বলেন, যেহেতু এ ব্যাপারে আদালতে মামলা রয়েছে, আদালতই সিদ্ধান- দেবেন মাদ্রাসাটি কে পরিচালনা করবে৷ এ প্রশ্নের জবাবে মাওলানা মাহফুজ বলেন, ২০০১ সালের আগে পর্যন- মাদ্রাসাটি ওয়াকফ হয়নি৷ যদি হয়ে থাকে তা অবৈধভাবে হয়েছে৷ কারণ মাত্র ২০০২ সালে ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ে মাদ্রাসাটি নিবন্ধনের জন্য দুটি আবেদন জমা পড়ে৷ পরে ওয়াকফ প্রশাসন বিষয়টি তদন- করে সহকারী প্রশাসক ৬ অক্টোবর ২০০৩ সালে একপত্রে লিখেছেন, দেওয়ানি মোকদ্দমা ৪১০/২০০১ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন- তালিকাভুক্তি ও মোতাওয়ালি্ল নিয়োগ কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে না৷
শায়খুল হাদিসের অনিয়ম-দুনর্ীতি ও স্বজনপ্রীতি সম্পর্কে পুত্র মাওলানা মাহফুজ অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা অভিহিত করে বলেন, যারা এখন হুজুরের বিরুদ্ধে বলছেন, হুজুর যখন অধ্যক্ষ ছিলেন তখন তারাই হুজুরের প্রশংসা করে বক্তব্য দিয়েছেন৷ এসব মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির মিটিংয়ের কার্যতালিকায় লিপিবদ্ধ আছে৷ তিনি বলেন, পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে ধরা পড়ে তিনি বা তার কোন ভাইকে বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেনি৷ তিনি দাবি করেন, স্বজনপ্রীতি নয়_ ছেলে ও নাতিদের নিয়মতান্ত্রিকভাবেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে৷ অন্যদিকে পারিবারিক কমিটি দিয়ে মাদ্রাসা পরিচালনার বিষয়ে মাওলানা মাহফুজ বলেন, ১২/১৩ সদস্যের কমিটিতে পরিবারের ২/১ জন সদস্য থাকতেই পারে৷ এটা অপরাধের কী?
মাদ্রাসার জমি ওয়াকফের বিষয়ে মাওলানা মাহফুজের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে জামিয়া রাহমানিয়ার সভাপতি ও মোতাওয়ালি্ল আহমদ ফজলুর রহমান বলেন, ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে একাধিক দাবিদার থাকলে বা এ নিয়ে সিভিল মামলা থাকলে ওয়াকফ প্রশাসক আদালতের রায় ছাড়া তালিকাভুক্ত করতে পারেন না৷ কিন\’ রাহমানিয়ার জমি নিয়ে একাধিক দাবিদার নেই৷ তবে দুটি পরিচালনা কমিটির দাবিদার রয়েছে৷ বিষয়টি নিয়ে ওয়াকফ প্রশাসক প্রথমদিকে কিছুটা বিভ্রান-িতে ছিল৷ কিন\’ পরে বুঝতে পেরে গত ২৬ জানুয়ারি ২১ সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা পরিষদ কমিটিকে সরকারের ওয়াকফ প্রশাসন থেকে ৩ বছরের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়৷ বর্তমান সভাপতি ও মোতাওয়ালি্ল নিযুক্ত হন আলহাজ আহমদ ফজলুর রহমান৷ এটিই বৈধ কমিটি৷ শায়খুল হাদিসের পক্ষে জমির কোন মালিক নেই, তারপরও কোন যুক্তিতে তারা ওয়াকফে নিবন্ধন চেয়েছেন তা কারও বোধগম্য নয়৷ তিনি বলেন, আইনে যদি সম্ভব হতো তাহলে বিএনপি সরকারের সময়ই তাদের পক্ষে নিবন্ধন দেয়া থেকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারত না৷ কারণ তখন সবই ছিল তাদের পক্ষে৷ ক’দিন পরপরই প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে শায়খুল হাদিসের ছবি ছাপা হতো৷ অন্যদিকে মাওলানা মাহফুজ ও পিতা শায়খুল হাদিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অপরাধী কখনও অপরাধ স্বীকার করে না, এটাই স্বাভাবিক৷ তবে বিষয়টি তদন- করলেই এর সত্যতা প্রমাণ হবে৷

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.