হাওয়ার উত্থান-পতন

hv1

হাওয়ার উত্থান-পতন

লন্ডন প্রবাসী এক সিলেটির প্রিয় স্ত্রীর নাম হাওয়া৷ এ নামটিই জড়িত হয়ে রইলো বিএনপির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্থান পতনের সঙ্গে৷ বনানীর হাওয়া নামের বাসাটি বিএনপির চেয়ারপারসনের সচিবালয় হিসেবে ব্যবহার শুরুর পর এর নামকরণ হয়ে যায় হাওয়া ভবন৷ ১৯৯৭ থেকে ২০০১ পর্যনত্ম বাসাটি বিএনপির আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হলেও তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত এ দফতরটি গত ৫ বছরে অভিশাপের ঠিকানা হিসেবে পরিচিতি পায়৷ সূত্রমতে, অর্থবিত্তের জোরে নির্বাচনে জয়ী হয়ে কয়েক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার লক্ষ্যে তারেক রহমান হাওয়া ভবনে বসে বিএনপির নেতাকর্মীদেরকে অবৈধ সুযোগ সুবিধা দিয়ে অর্থ, বিত্ত ও সম্পদশালী করার উদ্যোগ নেন৷ তার এ কৌশল পরবর্তীতে বিএনপিকে দুর্নীতিবাজদের দলে পরিণত করে৷ এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও একাধিক গোযেন্দা প্রতিবেদনের কারণে ক্ষমতা ছাড়ার পর খালেদা জিয়া হাওয়া ভবনের আশীর্্বাদপুষ্টদের এড়িয়ে সিনিয়রদের গুরুত্ব দেয়া শুরু করেছিলেন৷ এতেও শেষ রক্ষা হয়নি৷ হাওয়া ভবনে বসে সংঘটিত দুর্নীতির কারণেই গতকাল গভীর রাতে যৌথবাহিনী তারেক রহমানকে গ্রেফতার করে৷
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর আ’লীগ প্রথম রিফর্মের কথা চিনত্মা করে৷ প্রথম দিকে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া এবং পরে জার্মানির বিশেষজ্ঞ এনে জরিপ চালানো হয়৷ জরিপ দলটি আ’লীগের ইতিহাস ও ব্যর্থতা নিয়ে ব্যাপক কাজ করে৷ তাদের প্রতিবেদনে দলটিকে ধর্মীয় অনুভূতির পক্ষে থাকা, জয় বাংলা স্লোগান কমিয়ে দেয়া, মৌলবাদবিরোধী অবস্থান থেকে সরে থাকা ও মুরবি্বদের সম্মান করা জাতীয় সুপারিশ করে৷ এরপরই ‘৯৬ সালের নির্বাচনে সফলতা পায় আ’লীগ৷ এ থেকে শিক্ষা নিয়ে তারেক রহমান আরো একধাপ এগিয়ে নিজে সরাসরি আমেরিকা গিয়ে এ বিষয়ে কনসালট্যান্সি গ্রহণ করে৷ ফিরে এসেই হাওয়া নামের বাসাটি লবির নামে ভাড়া নিয়ে বিএনপির সচিবালয় করা হয়৷ লবির নামে নেয়া হয় সরকারের টার্গেট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য৷ তারেক রহমান নিজেই এর কর্মধ্যক্ষ হন৷ দফতরটি মাঠ জরিপ, সুষ্ঠু ভোটার তালিকার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, আসনভিত্তিক যোগ্যপ্রার্থী তালিকা ও অর্থনৈতিক অবস্থা, অন্য দলের যোগ্যপ্রার্থী তালিকা, আসনওয়ারি প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তাদের আদর্শনীতি চিহ্নিতকরণ, নির্বাচনী এলাকার জনপ্রিয় দাবি বাসত্মবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ এ জাতীয় কাজগুলো চিহ্নিত করে৷ আনত্মর্জাতিক সম্পর্ক তৈরি, নির্বাচন কমিশন বিষয়ে খুঁটিনাটি কাজ, সচিবালয় ও প্রশাসনিক দিক মনিটরিং করা, নিরাপত্তা, প্রচার, পুলিশ প্রশাসন ও মিডিয়াকে দেখভাল করার জন্য ১১টি উপকমিটিকে দায়িত্ব দেয়া হয়৷ ইনাম আহমেদ চৌধুরী, রিয়াজ রহমান, মোফাজ্জল করিম, হাসান আহমেদ ও মেজর জেনারেল জেড এ খানদের মতো অবসরপ্রাপ্ত সচিব, কূটনীতিক ও সামরিক আমলাদেরকে এসব কমিটির দায়িত্ব দেয়া হয়৷ তাদের কর্মনিষ্ঠা ও একাত্মতার ফলে ২০০১ সালে দলটি বিজয়ী হয়৷
বিজয়ের পর এদেরকে কূটনীতিক ও বিভিন্ন দায়িত্ব প্রদান করা হয়৷ এরপরই হাওয়া ভবন মেধাশূন্য হয়ে পড়ে এবং সর্বত্র ধস নামতে শুরু করে৷ এ অবস্থায় কমবয়সী ও অপরিপক্ব বকুল, আশিক ইসলাম, মেহেদী আসাদ, অপু ও নাইটরা তারেক রহমানকে ঘিরে অপকর্ম শুরু করে৷ এরা সবাই পরবর্তীতে কোটিপতি বনে গেছেন৷ তারেকের প্রথম পিএস নাইট বগুড়া ও শ্বশুরবাড়ি ঘোড়াঘাটে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক এবং একটি ব্যাংকের পরিচালক হয়েছেন৷ পরে তাকে সরিয়ে আমানউল্লাহ আমানের বিশ্বসত্ম হিসেবে পরিচিত অপুকে পিএস করা হয়৷ এসময় তারেক রহমানের সঙ্গে ব্যবসায়ী শাহআলম, ওরিয়ন গ্রুপের ওবায়দুল করিম, যমুনা গ্রুপের বাবুল, লুত্‍ফুজ্জামান বাবর, সিলভার লাইনের সেলিম এমপি, সাবেক এমপি রশিদুজ্জামান মিল্লাত, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, এহসানুল হক মিলন, এমজিএইচ গ্রুপের আনিসুল হক, অধ্যাপক মাজেদুল হক, মীর নাছির, মফিকুল হাসান তৃপ্তি, রুহুল কুদ্দুছ তালুকদার দুলু, আসাদুল হাবিব দুলু, জিয়াউল হক জিয়া, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, কৃষিবিদ জাবেদ ইকবাল, শাহজাহান সিরাজের ছেলে অপু, নাভানার তারেকসহ অনেকের সঙ্গে ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে৷ এছাড়া এসময় হাওয়া ভবন থেকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয় হারিছ চৌধুরী, মোসাদ্দেক আলী ফালু, ব্যারিস্টার আমিনুল হক, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, ডা. জাহিদ, কবির হোসেন ভুঁইয়া, প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন, এসএ সুলতান টিটু, সাবেক মন্ত্রী মোশারফ হোসেন ও আমানউল্লাহ আমানসহ অনেককে৷ দেশব্যাপী এদের দুর্নীতি সীমাহীন পর্যায়ে পেঁৗছে যায়৷ বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন প্রথমদিকে হাওয়া ভবনে নিয়মিত যাতায়ত করতেন৷ ক্ষমতার ২ বছরের মাথায় সবকটি গোয়েন্দা সংস্থা মামুনকে হাওয়া ভবন থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করে৷ কারণ হিসেবে সীমাহীন অপরাধ ও দুর্নীতিতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ার কথা বলা হয়৷ এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বোনের ছেলে শাহরিন ইসলাম তুহিনও প্রধানমন্ত্রীর নৈকট্যের সুযোগে ব্যাপক দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়৷ ক্ষমতার শেষ সময়ে এসে আবারো গোয়েন্দারা প্রধানমন্ত্রীকে জানায় যে, হাওয়া ভবনের সঙ্গে জড়িতরা নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে থাকলে বিএনপির ভরাডুবি হবে৷ এ সময় খালেদা জিয়া সংগঠনে গুরুত্বহীন হয়ে পড়া সিনিয়রদেরকে সামনে টেনে আনতে শুরু করেন৷ দুর্নাম ঘুচাতে ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ও মনোনীতদের কাউকে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করতেও দেয়া হয়নি৷ একারণে হাওয়া ভবনের সঙ্গে জড়িতদের অনেকেই মনোনয়ন পাননি বরং সিনিয়রদের বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছিল৷

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.