হারিয়ে যাওয়া বাইজি নাচ

85217_1
স্বপন কুমার দাস

এককালে এ ঢাকা নগরীতে ছিল জমজমাট বাইজিপাড়া৷ পুরানো ঢাকার পাটুয়াটুলী ও জিন্দাবাহার লেনে ছিল বাইজিদের সবচেয়ে বড় আখড়া৷ সন্ধ্যা হলে এসব আখড়ায় বসত ধ্রম্নপদী নৃত্য-গীতের আসর৷ বাইজিরা অপরূপ সাজে সেজে সুরের মূর্ছনা তুলে আসরে নাচত৷ তাদের নাচ-গানের সুমিষ্ট আওয়াজে পুরো এলাকা মুখর হয়ে উঠত৷ ঢাকার সুবেদার, নবাব, রাজা ও জমিদারসহ অভিজাত ব্যক্তিরা বাইজিদের আখড়ায় এসে তাদের নৃত্যগীত উপভোগ করতেন৷ যাদের সামর্থ্য ছিল, তারা সুদূর লৰ্নৌ থেকে বাইজি আনিয়ে নিজ রঙমহলে নাচ-গানের মাহফিল বসাতেন৷ সেকালে বাইজিদের মাহফিল করা ছিল নবাব-জমিদারদের অভিজাত্যের প্রকাশ৷

অতীতে ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজস্থান, মহারাষ্ট্র ও গুজরাট রাজ্যে ‘বাই’ শব্দ দ্বারা ধ্রম্নপদী নৃত্য-গীতে পারদশর্ী সম্ভ্রানত্ম মহিলাদের বোঝানো হত৷ খুব ছোট থাকতেই তারা ওসত্মাদের কাছে তালিম নিয়ে নৃত্যগীত শিখতেন৷ শিৰা শেষে শাস্ত্রীয় নৃত্যগীতকে পেশা হিসেবে নিলে লোকে তাদের ‘বাই’ শব্দটির সম্মানসূচক ‘জি’ শব্দটি জুড়ে দিত, তখন তাদের নামে শেষে ‘বাইজি’ শব্দটি শোভা পেত৷ বাইজিরা সম্রাট, সুলতান, বাদশা, রাজা-নবাব ও জমিদারদের রঙমহলে শাস্ত্রীয় নৃত্যগীত পরিবেশন করে বিপুল অর্থ ও খ্যাতিলাভ করতেন৷ অর্থ আয়ের জন্য তারা যেমন বাইরে গিয়ে ‘মুজরো’ নাচতেন, তেমনি নিজেদের ঘরেও মাহফিল বসাতেন৷

মুসলমান শাসকদের আগমনের বহু শতক আগে থেকেই এ অঞ্চলে ধ্রম্নপদী নৃত্য-গীতের প্রচলন থাকলেও বাইজিদের উদ্ভব ঘটে মূলত মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়৷ ধারণা করা হয়, ভারতে মোগল শাসন ব্যবস্থা স্থায়ী হওয়ার পর বাইজিদের প্রসার ঘটে৷ তখন সম্রাট, সুলতান, বাদশা ও নবাবদের অবসর সময় কাটানোর জন্য নানা প্রকার আমোদ-প্রমোদ ও বিনোদনের ব্যবস্থা থাকত৷ বাইজিদের দিয়ে মাহফিল করা ছিল তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির অঙ্গ৷ পরে দিলস্নীর শাসক শ্রেণীর এ সংস্কৃতি ভারতের অন্যান্য রাজ্যের শাসকদের মধ্যেও বিসত্মার লাভ করে৷ বাইজি হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মেরই হতেন৷ তারা খেয়াল, ঠুংরি ও গজল গাইতেন এবং নৃত্যের মাধ্যমে এসব গানের ভাব প্রকাশ করতেন৷ বাইজিদের নাচগানে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট, বাদশা ও নবাবগণ স্বর্ণ-রৌপ্য মুদ্রাসহ হীরা-মুক্তার হার পর্যনত্ম উপহার দিতেন৷ বাইজিদের নাচগান উপভোগ করার জন্য উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি রঙমহলে আমন্ত্রিত হতেন৷ অনেক সময় বিশেষ কোনো মেহমানের আগমনের কারণেও বাইজিদের দিয়ে এমন সঙ্গীত মাহফিলের আয়োজন করা হতো৷ সেকালে বাইজিদের সামাজিক অবস্থানও ছিল বেশ উঁচুতে৷ নাচগান করে তারা যে পরিমাণ অর্থ ও উপহার সামগ্রী পেতেন না দিয়ে তারা বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে পারতেন৷

ঢাকায় বাইজিদের আগমন ঘটে সতেরো শতকের গোড়ার দিকে৷ শাহ সুজা যখন ঢাকার সুবেদার হয়ে আসেন, তখনই এখানে বাইজিদের আগমন৷ তখনো ঢাকায় বাইজিপাড়া প্রতিষ্ঠা পায়নি৷ শাহ সুজা সুদূর লৰ্নৌ থেকে বাইজি আনিয়ে তার রঙমহলে মাহফিলের আয়োজন করাতেন৷ বাইজিদের নাচগানে ঢাকার অভিজাত ব্যক্তিবর্গ মুগ্ধ হতেন৷ এরপর থেকে ঢাকায় নিয়মিত এমন মাহফিল হতে থাকে৷ ঢাকায় ধীরে ধীরে বাইজি পেশার প্রসার ঘটে৷ মাহফিল করে বিপুল অর্থ আয়ের সুযোগ থাকায় বাইজিরা ঢাকায় স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে৷ পাটুয়াটুলী ও জিন্দাবাহার লেন এলাকায় তারা বেশ ক’টি বাড়ি ক্রয় করে৷ নিজ বাড়ির বৈঠকখানায় মাহফিল করার পাশাপাশি বাইজিরা নবাব, রাজা ও জমিদারদের রঙমহল কিংবা বাগানবাড়িতে গিয়ে মাহফিল করত৷

নবাব নুসরাত জং, নবাব শামসদ্দৌলা, নবাব কমরউদ-দৌলার সময় ঢাকায় বাইজিদের জমজমাট ব্যবসা দেখা যায়৷ এমনকি ইংরেজ আমলের প্রথম দিকেও বাইজিদের অত্যনত্ম কদর ছিল৷ পাটুয়াটুলী ও জিন্দাবাহার বাইজি পাড়ায় এ সময় অভিজাত ব্যক্তিদের ভিড় লেগে থাকতো৷ এখানে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যনত্ম জলসা চলত৷ বাইজিদের নাচ-গাচের সুমধুর আওয়াজে পুরো এলাকা মুখর হত৷ বাইজিরা ছিল সুন্দরী এবং নৃত্যগীত পটিয়সী৷ অপরূপ সাজে সেজে জলসার আসরে যখন তারা গাইত এবং শরীরে ঢেউ তুলে নাচত, তখন অনেক নবাব ও জমিদারের বুকে কম্পন সৃষ্টি হতো৷ কেউ কেউ বাইজিদের প্রেমাসক্ত হয়ে পড়তেন৷ এমন অনেক জমিদার ছিলেন যারা বাইজিদের নাচগাচে মশগুল হয়ে দিবারাত বাইজিপাড়ায় পড়ে থাকতেন৷ ফলে সময় মতো সরকারকে রাজস্ব দিতে না পারার কারণে তাদের জমিদারি নিলামে উঠত৷ সেকালে যেসব বাইজি নাচগান ও রূপগুণে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন সুপন জান, খনি বেগম, মুনি্নজান, বেগম জান প্রমুখ৷

বাইজিদের সম্পর্কে ঢাকাবাসীর মধ্যে ছিল তীব্র কৌতূহল৷ বাইজিদের সম্পর্কে বহু কথা ঢাকাবাসীর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল৷ যার বেশিরভাগই ছিল কল্পনাপ্রসূত৷ বাইজিদের বিশেষ ধরনের জীবনযাপন, কঠোর পর্দার মধ্যে বসবাস এবং প্রহরীদের প্রহরায় ঘোড়াগাড়িতে যাতায়াতের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের সম্পর্কে কৌতূহল ছিল পাহাড় প্রমাণ৷ পাটুয়াটুলীর বাইজিরা সঙ্গীদের নিয়ে হেঁটে খুব সকালে অদূরে বুড়িগঙ্গা নদীতে স্নানের জন্য যেতেন৷ তখন বুড়িগঙ্গা নদীর জল ছিল খুবই স্বচ্ছ এবং সুপেয়৷ স্নানপর্ব শেষে বাইজিরা যখন ফিরতেন তখন লোকজন গলির মুখে দাঁড়িয়ে থেকে সিক্ত বসনা বাইজিদের দেখে পুলকিত হত৷ এছাড়া সাধারণ মানুষের পৰে বাইজিদের দেখার আর কোনো সুযোগ ছিল না৷

ভারতে ইংরেজ শাসন স্থায়ী হওয়ার পর বাইজি পেশায় ধীরে-ধীরে ধস নামে৷ ঢাকার বাইজি পাড়ায়ও এর হাওয়া লাগে৷ ইংরেজরা ৰমতাসীন হওয়ার পর এদেশের নবাব, রাজা ও জমিদারদের আয়ের উত্‍স কমে যেতে থাকে৷ ফলে তাদের পৰে বাইজিদের পৃষ্ঠপোষকতা করা আর সম্ভব হয় না৷ তবে ইংরেজ আমলে এদেশে অপর একটি নব্য ধনিক শ্রেণীর সৃষ্টি হয়৷ এরা বাইজিদের নাচগান উপভোগ করার চেয়ে শ্বেতাঙ্গ রমণীদের সঙ্গে বলড্যান্স উপভোগ করতে অধিক অর্থ ব্যয় করতে উত্‍সাহী ছিল৷ ফলে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাইজিরা ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে৷ এ সময় প্রকৃত বাইজির অবর্তমানে এক শ্রেণীর নকল বাইজির উদ্ভব ঘটে৷ নৃত্যগীত নয়, রূপ যৌবনই ছিল তাদের মূল সম্পদ৷ পোশাকে-আশাকে ছিল আটসাট, শরীরের উপরের অংশ ছিল স্পষ্ট৷ নাচগানের মধ্যেই খরিদ্দাররা তাদের শরীর স্পর্শ করতে পারত৷ এরা অনেক খদ্দেরকে

একানত্মে সঙ্গও দিত৷ সাধারণ মানুষের কাছে এদের চাহিদা বেড়ে যায় এবং প্রকৃত বাইজিদের শাস্ত্রীয় নৃত্যগীতভিত্তিক পরিচ্ছন্ন জীবন চাপা পড়ে যায়৷ বিশ শতকের গোড়ার দিকে জিন্দাবাহারের বাইজিপাড়াটি উঠে যায়৷ ওই শতকের চলিস্নশ দশকে পাটুয়াটুলীর বাইজিপাড়াটি একটি পতিতাপলস্নীতে পরিণত হয়৷ এখন অবশ্য তারও কোনো চিহ্ন নেই৷ 

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s