রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’: হাস্যোজ্জ্বল নারী চরিত্র – হেম-মৃন্ময়ী-চারম্নশশীর হাসির আলোক ধারা -রম্নশিদার ইসলাম রহমান

ভূমিকা – বাংলা সাহিত্যে এবং অধিকাংশ ভাষার সাহিত্যেই গল্প-উপন্যাস একটি সুবৃহত্‍ অংশ জুড়ে রয়েছে৷ গল্প-উপন্যাসের গুরম্নত্ব ও পরিসর বিশাল হওয়াতে এই ধরনের সাহিত্যের কাছে আমাদের প্রত্যাশাও বেশি৷ উপন্যাস এমনকি ছোট গল্পের দৈর্ঘ্য এমন হয় যে সেখানে দুঃখ-আনন্দ পাশাপাশি সাজানো যেতে পারে৷ এমনকি সেখানে অলংকরণে হাস্যরস-শেস্নষ ইত্যাদি সব কিছুরই স্থানসংকুলান হতে পারে৷ দুটি একটি ব্যতিক্রমী চরিত্র আশা করা যেতে পারে যারা হবে হাস্যোজ্জ্বল৷ সব কিছু মিলিয়ে কথাসাহিত্য হতে পারে চিত্তের মুক্তির এক আনন্দ নিকেতন, যে আনন্দ হিলেস্নালে মিলেমিশে থাকতে পারে অশ্রম্ন-আনন্দ-হাসির চন্দ্রালোক৷

বর্তমানকালের হাস্যবিমুখ সাহিত্য

কথা সাহিত্যের ভেতরে বর্ণনায় এবং সংলাপে হাস্যরস থাকলে তাতে মূল আলোচনার গাম্ভীর্য ও গুরম্নত্ব ৰুণ্ন হবে কিনা সেটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন৷ সেটা নির্ভর করবে গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধে কোন্ পরিস্থিতিতে হাস্যরস ঢোকানো হয়েছে, সেটা কতটা সাবলীল ও পরিশীলিত তার ওপর৷

হাস্যবিমুখ হওয়া এবং গম্ভীর চিনত্মাশীল হওয়ার মধ্যে কি কোনো সুসম্পর্ক রয়েছে? যদি না থাকে, তাহলে বাংলা ভাষাভাষিরা কেন নিজেদেরকে ভাষার হাস্যরস থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টারত? লেখাতে সামাজিক সমস্যা বা অন্য গভীর আলোচনা থাকলেই কপালের রেখা গভীরতর হয়৷ মৃদু হাস্যের আলো বিচ্ছুরিত করার কোনো চেষ্টা করলেই সমালোচনার খড়গ শানিত হয়৷ দখিন হাওয়ার সুড়সুড়িতে হাসিয়ে ফেলে পাছে, সেই ভয়েই সবাই রয়েছি বলে ধারণা আরও দৃঢ় হয়৷

আজকাল উপন্যাসে ও ছোট গল্পে মৃদু হাসিও, ‘হিউমার’ বা শেস্নষ খুব কমই থাকে৷ যেটুকু থাকে তা অনেক ৰেত্রেই বেশ মোটা মাপের এবং জোর-জবরদসত্মি করে ঢোকানো৷ টিভি নাটক বা চলচ্চিত্রে তো একেবারে ফমর্ুলা অনুযায়ী হাসির খোরাক যোগান দেয়া হয়৷ কমেডিয়ান নামক এক ধরনের চরিত্র থাকে সেই হাসির ঝুড়ি নিয়ে৷

সাম্প্রতিক কিছু কিছু গল্প ও উপন্যাসে হাস্যরস যোগের চেষ্টা করা হয় কমবয়সী ছেলে-মেয়েদের অকালপক্ক সংলাপের মধ্য দিয়ে অথবা কোনো মুদ্রাদোষ ধরনের শব্দাবলী যোগ করে৷ এগুলো যে শুধু অপরিশীলিত তা-ই নয়৷ হাসির মধ্যে যে অবাক হওয়ার আনন্দ স্ফুরিত হয়, তা এসবের মধ্যে একবারেই নেই৷ এগুলো সবই খুব প্রত্যাশিত ধরনের৷

আর ছোট গল্প উপন্যাসে কিছু চরিত্র তো হাসিতে উচ্ছল থাকবেই, যেমনটি সচরাচর পরিবারে এবং সমাজে দেখা যায়৷ সব চরিত্রই সিরিয়াস হবে, সেটাই বরং অবাসত্মব৷ দৃশ্যমান বিনোদন মাধ্যমগুলোতে যেসব নাটক-সিনেমা ইত্যাদি দেখানো হয়, সেখানে কিছু হাসি জড়িত বা হাসাবার চেষ্টা জড়িত সংলাপ দৃশ্য থাকে৷ কিন্তু সাহিত্যের লিখিত রূপগুলোতে হাস্যময়ী প্রধান চরিত্র? সেরকম চরিত্র অনত্মভর্ুক্ত করতে সাহিত্যিকরা এগোতে চান না৷ এবং করলে হয়তো পাঠক সমাজ বা সাহিত্য সমালোচনা বিশেষজ্ঞগণ (সমালোচনার ব্যাপারে আমরা আবার অত্যনত্ম পারদশর্ীতা প্রদর্শন করি) সেই সাহিত্যিকের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে বসবে৷ সুতরাং প্রতিযোগিতার এই পৃথিবীতে কেই বা সেই সাহসী পদৰেপ নেবে৷

সেজন্যেই রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের আলোচনা করার এই প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে, যাতে পরিস্ফুট হবে যে প্রধান নারী চরিত্র বা কোনো বিশেষ চরিত্র হাস্যোজ্জ্বল হলে রচনার সাহিত্য মূল্য বরং বাড়তে পারে এবং চরিত্রে চিত্রনের দৰতা বিশেষভাবে প্রতিফলিত হতে পারে৷

এই প্রেৰাপটেই বর্তমান প্রবন্ধটিতে তুলে ধরতে চাই বাংলা ছোট গল্পে কত সাবলীলভাবে হাস্যোজ্জ্বল চরিত্র এসেছে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছে৷ রবীন্দ্রসাহিত্যের গভীরে যাওয়ার প্রচেষ্টাতে একটি সার্থকতাবোধ সব সময়ই জড়িত থাকে, এবং এই প্রবন্ধটির মূল উদ্দেশ্যও তাই৷ সেই সাথে যে আরও কিছু গোপন মনোবাঞ্ছা নেই তা নয়, সেটাও স্বীকার করে নেয়া ভাল৷ সেই উদ্দেশ্যটি হচ্ছে বর্তমান বাংলা ছোটগল্পকে হাস্যরস বিমুখতা থেকে বের হয়ে আসতে উত্‍সাহিত করা৷

এই দিকটি মনে রেখে কোনো পাঠক যদি গল্পগুচ্ছ আর একবার পড়েন তাহলে তিনি সহজেই খুঁজে পাবেন সেসব হাস্যরস চিনে নিতে পারবেন হাসির বিভূতিতে উজ্জ্বল আরো অনেক চরিত্রকে৷ এই প্রবন্ধটিতে শুধু কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরছি৷ উদাহরণভিত্তিক হওয়ার ফলে এই প্রবন্ধটি হয়েছে উদ্ধৃতিবহুল৷

গল্পগুচ্ছের কয়েকটি চরিত্রের উদাহরণ এনে কিভাবে তারা হাসির ঝিলিকে আলোকিত করেছে পাঠক হৃদয়, সেই আলোচনা করবো৷ প্রথমে আসবে আমাদের একানত্ম পরিচিত মৃন্ময়ী, তারপরে দৃষ্টিদানের পাশর্্বচরিত্র হেম অর্থাত্‍ হেমাঙ্গিনী, অতপর অতিথি গল্পের চারম্নশশী এবং সবশেষে সৌদামিনি৷ যদিও শেষটি এই প্রবন্ধের শিরোনামে উলিস্নখিত নয় (প্রবন্ধের শিরোনামটি অত্যধিক দীর্ঘ হলে পাঠক বিরূপ হয় কিনা সেই ভয়ে)৷

এখানে উলেস্নখ করা প্রয়োজন যে, এই প্রবন্ধে কয়েকটি সিরিয়াস বা গম্ভীর বিষয়বসত্মু নিয়ে রচিত গল্পের নারী চরিত্রে কিভাবে হাস্যোজ্জ্বল কিছু বিষয় এসেছে সেটাই আলোচনা করা হবে৷ এছাড়াও গল্পগুচ্ছের বেশ কয়েকটি গল্পই হাসির গল্প হিসেবে পরিচয় পেতে পারে৷ পুরো পস্নটটি যেখানে হাসির ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত সেটাকেই হাসির গল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে৷ তপস্বিনী, ইচ্ছাপূরণ, ফেল, প্রায়শ্চিত্ত এ ধরনের গল্পের প্রকৃষ্ট উদাহরণ৷ এই হাসির গল্পের ধারাকে প্রবহমান রাখার জন্য এগুলো নিয়েও গবেষণা প্রয়োজন৷ তবে একটি প্রবন্ধেই সেটা যথাযথভাবে করা সম্ভব নয়৷

সমাপ্তি : মৃন্ময়ীর অসঙ্কোচ প্রকাশ

সমাপ্তি গল্পের প্রধান চরিত্র মৃন্ময়ীকে চেনা হয়নি, এমন রবীন্দ্র-পাঠক খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে৷ অপূর্বর সাথে সাৰাতের পর থেকে মৃন্ময়ীর জীবন কিভাবে বিভিন্ন ধাপে বিকশিত হলো সেটাই সমাপ্তি গল্পের বিষয়বসত্মু৷

মৃন্ময়ীর সাথে অপূর্বর যখন প্রথম সাৰাত্‍ ঘটেছে, এমনকি যখন বিবাহের ঘটনাটিও ঘটে গিয়েছে, তখনও সে কিশোরী, জীবন সম্পর্কে অনভিজ্ঞ সরল গ্রাম্যবালা৷

মৃন্ময়ীর চরিত্র চিত্রনে হালকা হাসির আভা ছড়ানোর জন্য কয়েকটি উপকরণ ব্যবহৃত হয়েছে: প্রথমত তার সংলাপের মধ্যে শিশুসুলভ সরল সত্যভাষণই হয়ে দাঁড়িয়েছে হাসির উপকরণ; দ্বিতীয়ত: জীবন ও জগত্‍ সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা এবং তৃতীয়ত তার বড় হয়ে ওঠা এবং ধাপে ধাপে পরিবেশসঙ্গত কর্মধারায় বিকশিত হওয়া৷

এছাড়া পারিপাশ্বর্িকতার বর্ণনাতেও একটি প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপ এবং অনেক ৰেত্রেই খোলামেলা ধাক্কা দেয়ার মত বর্ণনা থাকে, সেগুলোও হাস্যরস যোগ করে দেয়৷ এবারে আসা যাক এসব বিষয়ে উদাহরণে৷ বিবাহোত্তর সংলাপে অপূর্ব যখন প্রশ্ন করল, ‘মৃন্ময়ী, তুমি আমাকে ভালোবাস না? মৃন্ময়ী সতেজে জানালো, না আমি কখখনোই ভালোবাসবো না৷ অপূর্ব কারণ জিজ্ঞেস করলে জানালো, তুমি আমাকে বিয়ে করলে কেন? অপূর্বর সঙ্গে সে যখন কলিকাতা যেতে রাজী হচ্ছে না, তখন সে অকপটে স্বীকার করল যে গ্রামের সঙ্গী বালক রাখালকে ছেড়ে যেতে মন কেমন করছে৷ মৃন্ময়ীর অনুরোধ, ফিরে আসার সময় অপূর্ব রাখালের জন্য যেন খেলনা-ছুরি উপহার আনে৷ পারিপাশ্বর্িকতা বর্ণনার শুরম্নই হয়েছে অপূর্ব পিছল ঘাটে কাদায় পড়ে যাওয়া দিয়ে৷ ‘যেমন পড়া অমনি কোথা হইতে এক সুমিষ্ট উচ্চ কণ্ঠে তরল হাস্যলহরী উচ্চসিত হইয়া নিকটবতর্ী পাখীগুলোকে সচকিত করিয়া দিল৷’

অপূর্ব যখন পাত্রী দেখতে হবু শ্বশুরালয়ে গেল সেখানে মেয়েটিকে ঝাড়িয়া মুছিয়া, খোপায় রাংতা জড়াইয়া, পাতলা রঙিন কাপড়ে মুড়িয়া উপস্থিত করা হইল৷ পাত্রীকে যখন নানাবিধ প্রশ্ন করা হচ্ছিল তখন মৃন্ময়ী সেই আসরে প্রবেশ করল, কনের মাথার ঘোমটা টানিয়া খুলিয়া দিয়া ঝড়ের মতো মৃন্ময়ী ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল৷ অতপর এই নীরব পরীৰা সভা আর অধিকৰণ স্থায়ী হইল না৷

অপূর্বর ফেরার পথে আবারও মৃন্ময়ীর উচ্চ কণ্ঠের অজস্র হাস্যকলোচ্ছ্বাস৷ নৃত্যময়ী প্রকৃতির নূপুর নিক্কনের ন্যায় চঞ্চল হাস্যধ্বনিটি সমসত্ম আকাশ ব্যাপিয়া বাজিতে লাগিল এবং পাঠক শ্রবণেও এই হাস্যধ্বনি অনেকটা স্থায়ী সঙ্গীতে রূপ নিল৷ অবশেষে মৃন্ময়ী অনুতপ্ত হয়ে তার স্বামীকে পত্র লিখেছে৷ খামের উপর শুধু নাম লিখে তা ডাক বাক্সে ফেলতে দিল৷ সেই পত্রের বক্তব্য পাঠ করে স্মিত হাসি ও সহানুভূতিকে পাঠক হৃদয় দ্রবীভূত হয়৷ সমাপ্তিতে অশ্রম্নজলধারায় মৃন্ময়ীর ঋণ পরিশোধ প্রকৃতপৰে হাস্য কলেস্নালের নামানত্মর৷

দৃষ্টিদান গল্পে হেমাঙ্গিনী আছে পাশর্্ব চরিত্রে৷ প্রধান চরিত্র কুমু যখন ডাক্তার স্বামীর ভুল চিকিত্‍সাতে দৃষ্টি শক্তি হারালো তখনই তার স্বামী এদেরকে (হেম ও এবং কুমুর পিসী শাশুড়ী) বাসাতে নিয়ে এসেছে৷ কাজেই ধরে নেয়া যায় শুরম্নতেই নায়িকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হেমের প্রাপ্য হবে পাঠকের বিদ্বেষ ও গালাগালি৷ কিন্তু হেম চরিত্রটি অনতিবিলম্বেই প্রিয় হয়ে ওঠে তার চাঁছাছোলা বক্তব্য এবং হাসি ঠাট্টার মাধ্যমে৷ দৃষ্টিহীন কুমু যখন স্পর্শ দ্বারা হেমকে দেখার চেষ্টা করছিল, তখনই হালকা সংলাপ শুরম্ন: আমি কি তোমার বাগানের সিম না বেগুন যে হাত বুলাইয়া দেখিতেছ কত বড়োটা হইয়াছি৷ কাকীমা এই বাড়িতে এসেছেন, সে বিষয়ে হেমের অভিমত, দয়া করিয়া (আসিয়াছেন)? তাহা হইলে দয়াময়ী শীঘ্র নড়িতেছেন না৷

গল্পের শেষাংশে কুমুর স্বামী প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করে হেমকে বিবাহের জন্য গিয়েছিল৷ কিন্তু তাকে প্রতিজ্ঞাভঙ্গের অপরাধ থেকে এবং কুমুকে স্বামীহারা হওয়ার বিপদ থেকে রৰা করতে কুমুর দাদা হেমকে বিবাহ করলেন৷ তারা দুজনে কুমুর কাছে এসেছে বিয়ের পর৷ হেম এসে কুমুকে বললো যে তার আশীর্বাদ নিতে এসেছে৷ কুমু ধরে নিয়েছিল তার স্বামীই হেমকে বিবাহ করেছে, তাই বলল, কেন আশীর্বাদ করব না বোন, তোমার কী অপরাধ৷ হেমাঙ্গিনী সুমিষ্ট উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিল, কহিল, তুমি বিবাহ করিলে অপরাধ হয় না আর আমি করিলেই অপরাধ?

অতিথি গল্পের চারম্নশশী

চারম্নশশী অতিথি গল্পের প্রধান নারী চরিত্র, যদিও বয়সে কৈশোরের সীমানা পার হয়নি৷ আর এই গল্পটিতে আসলে নারী চরিত্র সবাই, এমনকি চারম্নশশীও, আমার বিবেচনাতে পাশর্্ব চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ এই গল্পটি একটি চরিত্র ঘিরেই মূলত আবর্তিত৷ সে হচ্ছে উদাসী কিশোর তারাপদ৷ সে যখন মতিবাবু ও অন্নপূর্ণাদের নৌকাতে যোগ দিল তখনই গল্পের শুরম্ন৷ তারাপদ মতি বাবুদের বাড়িতে অতিথি হয়েছে৷ সে পাঁচালী পাঠ করে, বাঁশী বাজায় আরও অনেক মুগ্ধ করার মত কাজ করে৷ কিন্তু মতিবাবুর কন্যা চারম্নশশী ঈর্ষান্বিত হয়ে তারাপদকে নানাভাবে বিরক্ত করছে৷ সেই ঈর্ষাপ্রসূত ক্রিয়াকলাপ এতই অসহনীয় যে পাঠকের পৰে চারম্নশশীকে ভালবাসা অসম্ভব৷ বরং পাঠক কামনা করতে থাকবে চারম্নশশী যেন তারাপদ এর কাছে ঘেঁষতে না পারে৷ কারণ তারাপদ এমন চরিত্র যাকে সবাই আপন ভাববে, যেমন ভেবেছে চারম্নর বাবা মা৷ কিন্তু তারপরও চারম্নশশীর জন্য পাঠকের মমতা থাকে লেখকের কলমে চারম্নশশীর মনসত্মত্ত্ব বিষয়ে সরস মনত্মব্যের কারণে৷

কিছু উদাহরণ দিলে সেই কটাৰ মেশানো বর্ণনার আকর্ষণটি পরিস্ফূট হবে৷

তারাপদ যখন পড়াশুনা শুরম্ন করল, চারম্নও জিদ ধরল ইংরেজি শিখবে৷ কিন্তু অস্থিরচিত্ত বালিকা নিজে কিছু শিখল না, কেবল তারাপদর অধ্যয়নে ব্যাঘাত ঘটাতে লাগল৷ তারাপদর পাঠাভ্যাস করা ঈর্ষাপরায়ণ কন্যাটির সহ্য হইত না, সে তারাপদর লেখা খাতায় কালি ঢালিয়া আসিত, কলম চুরি করত, বইয়ের দরকারী অংশ ছিঁড়ে রাখত ইত্যাদি৷

একদিন বিরক্ত হয়ে তারাপদ তাহার মসীবিলুপ্ত লেখা খাতা ছিন্ন করিয়া ফেলিয়া গম্ভীর বিষণ্নমুখে বসিয়াছিল৷ চারম্ন তখন মনে করল মার খাবে৷ কিন্তু তারাপদ তা করল না৷ বালিকা মহামুশকিলে পড়িল৷ কেমন করিয়া ৰমা প্রার্থনা করিতে হয় সে বিদ্যা তাহার অভ্যাস ছিল না৷ অবশেষে ছিন্ন খাতার এক টুকরা লইয়াঃ খুব বড়ো বড়ো করিয়া লিখিল আমি আর কখনো খাতায় কালি মাখাব না৷ লেখা শেষ করিয়া সেই লেখার প্রতি তারাপদর মনোযোগ আকর্ষণের জন্য অনেক প্রকার চাঞ্চল্য প্রকাশ করিতে লাগিল৷ দেখিয়া তারাপদ হাস্য সংবরণ করিতে পারিল না৷ তখন পাঠকের পৰেও হাস্য সংবরণ কঠিন হয়৷ চারম্ন তার সখী সোনামনির প্রতি ঈর্ষাবশত তারাপদর শখের বাঁশিটির উপর মাড়াইয়া নির্দয়ভাবে ভাঙিতে লাগিল৷ তারাপদ চারম্ন আমার বাঁশিটি ভাঙেছ কেন? ‘চারম্ন রক্তিমমুখে বেশ করছি, খুব করছি’ বলিয়া বিদীর্ণ বাঁশিটির উপর অনাবশ্যক পদাঘাত করিয়া বাহির হইয়া গেল৷ অকারণে পুরাতন নিরপরাধ বাঁশিটির দুর্গতি দেখিয়া (তারাপদ) হাস্য সংবরণ করিতে পারিল না৷

অতিথি তারাপদ কখন যে আবার অন্নপূর্ণার মায়া ত্যাগ করে চলে যাবে সেই দুশ্চিনত্মাগ্রসত্ম পাঠক চারম্নশশীর বর্ণনা পড়ে ইষত্‍ স্বসত্মি পেতে পারে৷

এই বর্ণনার শেষে সাধারণভাবে প্রযোজ্য একটি মনত্মব্য করার প্রলোভন সংবরণ কঠিন হচ্ছে৷ মনত্মব্যটি হোল রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের নায়িকাদের বিষয়ে৷ তখনকার কালে মেয়েদের বিয়ের বয়স ছিল নেহাতই কম৷ প্রাক বিবাহ, প্রেমের গল্প সেই বয়সের মেয়েদের ঘিরে লেখাটা কঠিন৷ সেজন্যেই বোধ হয় গল্পগুচ্ছের অনেক প্রধান নারী চরিত্র (বা নায়িকা) বিবাহিতা৷ আর প্রাকবিবাহ প্রেমে মূলত: কিশোরী নায়িকার চপলতা ধরা পড়েছে, যেমন ‘অতিথির’ চারম্নশশীর ৰেত্রে আর সেগুলো গ্রন্থিত হয়েছে হাস্যমুখর সংলাপে বা সরস বর্ণনাতে৷

সৌদামিনীর হাস্য-দীপ্তি

সবশেষে হাস্য-দীপ্তিময়ী যাকে নিয়ে আলোচনা করবো সে হচ্ছে ‘বদনাম’ গল্পের সৌদামিনী (সদু)৷ গল্পটি কিন্তু বেশ সিরিয়াস ধরনের এবং বিষয়বসত্মুতে রয়েছে ইংরেজ শাসন ছিন্ন করার সংগ্রামে যারা জীবন উত্‍সর্গ করেছিল তাদের কাহিনী৷ গল্পের প্রধান নারী চরিত্র সদু, সে প্রাণপণে স্বামীর সেবা করেছে ভালবেসে এবং তাকে বঞ্চনা করে নানা কৌশলে বিপস্নবীকে সহায়তা করেছে দেশপ্রেম ও কর্তব্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে৷ এসব কারণে সদু হয়ে উঠেছে বরেণ্য এবং অন্য একটি প্রবন্ধে তাকে অভিষিক্ত করেছি রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের অন্যতম অসাধারণ নারী চরিত্র হিসেবে৷

সুগম্ভীর বিষয়বসত্মু নিয়ে রচিত হলেও এই গল্পটিতে কিন্তু প্রধান নারী চরিত্র সৌদামিনীর দেশপ্রেমের জোরে বিপস্নবীদের কাজে জড়িয়ে থাকা, তার সংলাপ ও কার্যকালাপের বর্ণনা হাস্যরসে উজ্জ্বল৷

সুদূর স্বামী পুলিশের ইন্সপেক্টর, অনিল বিপস্নবীকে খুঁজে ফিরছে৷ সে জেনেছে একটি মেয়ে সেই বিপস্নবীকে গা-ঢাকা দিতে সাহায্য করে৷ ধরতে হবে সেই মেয়েকে৷ সেই বর্ণনা:

(সদুর প্রশ্ন) ‘সেই মেয়েটির কোনো খোঁজ পেলে কি?’

উত্তর: ‘দুঃখের কথা বলব কী, এখন একটি মেয়ের জায়গায় রোজ আমার থানার সামনে পঁচিশটি মেয়ের আমদানী হচ্ছেঃ৷

সদু: সে কী, তোমার দরজায় এত মেয়ের আমদানী তো ভালো নয়৷ ওখানে তুমি কি বাবজি সেজে বসেছ নাকি?’

কোনভাবেই অনিল বিপস্নবীকে ধরতে না পেরে ইন্সপেক্টর তার স্ত্রী সদুর সাহায্য নিতে চাচ্ছে৷

ই: ‘দেখো সদু, এবারে আমি তোমার শরণাপন্ন৷’

সদু: ‘কবে তুমি আমার শরণাপন্ন নও, শুনি৷ এই জন্য তো তোমাকে সবাই স্ত্রৈণ বলে’৷

সদু মনে করে যে তার স্বামী সত্যিকারের পুরম্নষ তাই স্ত্রীর কাছে অসংশয়ে হার মেনেই নেয়’৷

পুলিশ নাসত্মানাবুদ হচ্ছে বিপস্নবীকে ধরতে না পেরে, তা নিয়ে লোকে হাসাহাসি করছে৷ সদুও তাতে যোগ দিয়েছে৷ তাই তার স্বামীর খেদ:

‘সব তাতেই তুমি যেমন নিশ্চিনত্ম হয়ে থাক, আমার ভালো লাগে না৷’

সদু: ‘ও আমার স্বভাব, তোমার খুনী ডাকাতদের জন্য আমি চিনত্মা করতে পারব না৷ঃ. তোমার এই পুলিশের থানায় স্বদেশীদের নিয়ে অনেক চোখের জল বয়ে গেছে, এতদিনে লোকেরা একটু হেসে বাঁচছে৷ আমি দুশ্চিনত্মার ভাব করব কী করে বলো দেখি৷’

পাঠকও তাদের সাথে একটু হাসতে পেরেছে৷ অনিল ও সদুর দেশপ্রেম ও বুদ্ধিমত্তা ছিল স্বচ্ছ ও সত্য-সেজন্যেই সংগ্রাম ও হাস্যমধুর সংলাপ মিলেমিশে যেতে পেরেছে সাফল্যের সাথে৷

শেষ কথা

গল্পগুচ্ছের গল্পগুলোতে এবং বিশেষ করে শেষ দিকের গল্পেও এই যে তরল-গভীরে ভারসাম্য এনে স্মিত হাসির জগত্‍ সৃষ্টি হলো, পাঠকের কাছে সেটা এক পরম বিস্ময়৷ সেরকম আনন্দ ফিরে ফিরে আসুক আমাদের সাহিত্যে৷ ০

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s