শিল্পকলার বিমূর্তধারা বাংলাদেশের চিত্রশিল্প – হুমায়ূন মালিক

শিল্প-সাহিত্যের এক বিশেষ উলেস্নখযোগ্য ধারা বিমূর্তধারা৷ শিল্প ও সাহিত্যে প্রায় যুগপত্‍ এই ধারাটির বিকাশ ঘটতে থাকলেও মাধ্যমটি প্রথম সংজ্ঞা পায় শিল্পমাধ্যমে৷ বিমূর্ত শিল্প সম্পর্কে দেয়া অনেক শিল্প সমালোচকের সংজ্ঞাকে যদি একটি সাধারণ সংজ্ঞায় সরলীকরণ করা যায় তবে তাকে এভাবে প্রকাশ করা যায় যে, এ ধরনের শিল্পে শিল্পী বাসত্মব জিনিস অাঁকার চেষ্টাই করেন না, শুধু বিন্যাস নির্মাণ করেন, তা আঙ্গিক এবং রঙের জন্য আঙ্গিক ও রঙ ব্যবহার করে৷ এভাবেই শিল্পীর অনুভূতি তাতে প্রকাশিত হয়৷ এ ধরনের শিল্পকর্মকে ‘নির্বস্তুক’ বা ‘বিমূর্ত’ (অনংঃত্‍ধপঃ) বলা হয়৷ কারণ এর কোনো নির্দিষ্ট এবং মূর্ত বিষয়বস্তু নেই৷ বলা যায়, দৃশ্যগোচর পৃথিবী এবং মানুষের উপলব্ধি যখন দু’মাত্রায় ফ্ল্যাট গঠনরীতিতে রূপানত্মরিত হয় তখন তাকে আমরা বিমূর্তরূপে দেখি৷ কোনো কোনো বিষয় প্রকাশের জন্য মাধ্যমটি যেমন অনিবার্য হয়ে ওঠে তেমনি কোনো কোনো শিল্পী আছেন যাঁরা তাঁদের চিনত্মা-চেতনা-সৌন্দর্যবোধকে প্রকাশের জন্য বিশেষভাবেই বেছে নিতে পারেন এ ধারাকে৷ তবে তিনি যে অন্যান্য মাধ্যমে কাজ করবেন না এমনটি কিন্তু নয়৷

আমরা জানি, বিশ্বের আধুনিক বা সমকালীন শিল্পকলা প্রধানত বিমূর্ত এবং বিমূর্তাশ্রয়ী৷ তবে তা হয়ে ওঠার পেছনে একটি ইতিহাস আছে৷ বিমূর্ত ধারার শিল্পের সূত্রপাত করেন ভাসিলি ক্যান্ডিনেস্কি (১৮৬৬- ১৯৪৫)৷ তিনি প্রথম ১৯১০ সালে ‘রঙের ফোটা অনুভূতি সৃষ্টিতে’ শিরোনামে জলরঙে বিমূর্ত নিসর্গ সৃষ্টি করেন৷ এরপর ক্রমোত্তরণের মাধ্যমে ক্যান্ডিনেস্কি সৃষ্টি করেন অবাধ, আপাতকাল্পনিক রীতির যা শিল্পপিপাসুর মনে আনে প্রকৃতির মৌলরীতির আবেদন৷ এর ছান্দিক, আলঙ্কারিক উপকরণে থাকে রোমান্টিক প্রত্যয়৷ এই ফর্ম খেয়াল, কল্পনা, উদ্ভটতা এবং রঙের সূক্ষ্ম, পরিশীলিত, পরিমার্জিত ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে দর্শককে অভিভূত করে৷ তাঁর সবচেয়ে উলেস্নখযোগ্য চিত্রকর্ম ‘ইন দ্য ব্যাক স্কোয়ার’৷ ছবিটিতে বৃত্ত, বৃত্তচাপ, ত্রিভুজ ইত্যাদি জ্যামিতিক আকৃতি একটি কালো কাঠামোর অনত্মর্ভুক্ত৷ এর এই জ্যামিতিক বিন্যাস ও রঙের ব্যবহার আনন্দের চমত্‍কার আধার হয়ে উঠেছে৷ বিমূর্তধারায় ভাসিলি ক্যান্ডিনেস্কি-র প্রায় সমসাময়িক আরো একজন শিল্পী কাশিমির মালেভিচের (১৮৭৮-১৯৩৫)৷ তাঁর বিমূর্তধারাটির বৈশিষ্ট্য ক্যান্ডিনেস্কির ফর্ম থেকে আলাদা৷ তাঁর উলেস্নখযোগ্য চিত্র সাদার পটভূমিতে এক কালো চতুষ্কোণ৷ এটি এ ধারায় তার চরম সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত৷ শিল্প সমালোচকদের মতে, চতুষ্কোণটি বিষয়বর্জিত নয়, তা বস্তুর অনুপস্থিতির দ্যোতক৷ এরপর তিনি অাঁকেন রঙিন চতুষ্কোণ, ত্রিকোণ, বৃত্ত৷ বিভিন্ন জ্যামিতিক রীতি ব্যবহার করে এই শিল্পী অনত্মহীনতা, বিশালতা, দিব্যানুভূতি প্রকাশে চমত্‍কার কৃতিত্ব দেখান৷

বিমূর্ত শিল্পকলাকে দুই ধারায় বিভক্ত করা হয়৷ প্রথমটি গতিশীল ধারা, এর ভিত্তি অনুভূতি৷ দ্বিতীয়টি নির্মাণমূলক৷ নিমর্াণমূলক ধারার প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে যাকে বিবেচনা করা হয় তিনি পিয়েট মোন্দ্রিয়ান ( ১৮৭২-১৯৪৪)৷ তাঁর নির্মিত রীতিটির নাম নিওপাস্টিসিজম৷ তিনি মূলত বর্গৰেত্র ও সরলরেখার মাধ্যমে বিন্যাস তৈরি করতেন৷ এই রীতিতে চতুষ্কোণ বিভক্ত হয় সমানত্মরাল এবং ঊধর্্বরেখায়৷ প্রধানত ব্যবহৃত হয় লাল, হলুদ এবং নীল রঙ৷ কালো, সাদা, ধূসর রঙও থাকে৷ প্রকৃতির বিশাল বৈচিত্র্যকে তিনি নির্ভরশীল ফর্ম ও রঙের সঙ্গতিতে প্রকাশ করেন৷ মোন্দ্রিয়ানের বিশেষ উলেস্নখযোগ্য একটি ছবি ‘ব্রডওয়ে বুগি উগি’৷ এটি শুধুই রঙিনরেখা ও বর্গৰেত্রে পূর্ণ; অথচ তা নিউ ইয়র্ক শহরের আনন্দ ও কোলাহলের এক প্রাণবনত্ম চিত্ররূপ হয়ে দাঁড়ায়৷

বিমূর্তধারায় গুরম্নত্বপূর্ণ কাজ করেছেন শেঁজা৷ তাঁর হাতে মৌলিক জ্যামিতিক আকৃতি একে অন্যের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে কখনো কখনো বিমূর্ত রূপাভিব্যক্তির সৃষ্টি করেছে৷

বিমূর্তধারার আরো একজন উলেস্নখযোগ্য শিল্পী পল ক্লি যাঁর অাঁকা ‘সানফ্লাওয়ার ও মুনফ্লাওয়ার’ এই রীতিটিকে বোঝার জন্য চমত্‍কার উদাহরণ হতে পারে৷ এই ছবির ফুলগুলো বাসত্মবতা থেকে নেয়া নয় বা বাসত্মবের প্রতিচিত্র এই ছবি নয়, তার জন্ম শিল্পীর সৃষ্টিশীল মনের সূতিকাগারে৷ এর গড়ন ও রঙ সত্যি মনোমুগ্ধকর৷

এবার বাংলাদেশের বিমূর্ত শিল্পরীতির চর্চা নিয়ে আলোচনা করা যাক৷ দীর্ঘকাল ধরে এ দেশে শিল্পের একমাত্র যে ধারাটি এলোমেলোভাবে বয়ে চলছে তা বিমূর্ত ও বিমূর্তাশ্রয়ীই৷ বলা যায়, এর যাত্রা শুরম্ন পাঁচের দশকের গোড়া থেকে৷ অবশ্য স্বাধীনতা-উত্তরকালে সামাজিক বাসত্মবতার লৰণযুক্ত এক ভিন্ন শিল্পধারার প্রচেষ্টা চলে; তবে তা স্বল্প সময়ের জন্য এবং তার প্রকৃত বিকাশ ঘটেনি৷ পাঁচের দশক থেকে প্রায় অবিচ্ছিন্ন ধারায় চলা বিমূর্তধারাটির পাশে বিভিন্ন ধারার আবির্ভাব ঘটেছে; কিন্তু সেসব কোনো আন্দোলনে দানা বাঁধেনি৷ বরং পাঁচের দশকের সেই বিমূর্ত ধারার শিল্প কলা মোটামুটি একটি সংঘবদ্ধ রূপ পরিগ্রহণ করে৷ তবে তা শিল্পান্দোলনে রূপ নেয় বস্তুত ছয়ের দশকে এবং তা বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পীদের দ্বারা৷ এই আন্দোলনের পরিপূর্ণ সাফল্যটা আসে তৃতীয় প্রজন্মের শিল্পীদের সৃষ্টি-স্পৃহা, মেধা ও শ্রমে৷ তবে এটা নিশ্চয়ই বলা যাবে না যেখানে বিমূর্তধারার বিকাশ ঘটবে সেখানে পরাবাসত্মবতা, প্রতীকবাদ বা জাদুবাসত্মবতার বিকাশ ঘটবে না৷ এসব বিষয় যেখানে পরস্পরের পরিপূরক এবং সম্পর্কযুক্ত তখন এমন বিভাজন অনেক ৰেত্রেই কৃত্রিমও ঠেকে৷ তবে এটাও ঠিক, বিমূর্ত শিল্পকলার আধুনিক ধারাটিকে আমাদের শিল্পীরা যে সাফল্যে সমৃদ্ধ এক উত্তরাধুনিক ধারায় উন্নীত করতে পেরেছিলেন, অন্য ৰেত্রে তেমনটি পারেননি৷ এ কথার অর্থ এও নয় যে অন্য ধারায় সাফল্য আসেনি বা সে সাফল্যকে খাটো করে দেখা হচ্ছে৷

বাংলাদেশের শিল্পকলা আজকের এই সমৃদ্ধ পর্যায়ে পেঁৗছেছে মূলত তিন প্রজন্মের শিল্পীদের সাধনায়৷ জয়নুল আবেদিন, কামরম্নল হাসান, শফিউদ্দিন আহমদ, এসএম সুলতান, আনোয়ারম্নল হক এ ভূখণ্ডের প্রথম প্রজন্মের শিল্পী৷ মোহাম্মদ কিবরিয়া, হামিদুর রহমান, আমিনুল ইসলাম, রশিদ চৌধুরী , মুর্তজা বশির, আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পী৷ পারস্পরিক কিছু বৈশিষ্ট্যগত ব্যতিক্রম ছাড়া এই দ্বিতীয় পর্যায়ের শিল্পীরাই এ দেশে বিমূর্ত শিল্পান্দোলনের পথিকৃত্‍৷ প্রথম প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে যে বৈশিষ্ট্য বিকশিত হয়ে ওঠে তা মূলত লোকশিল্পের সঙ্গে রিয়ালিজম ও ন্যাচারালিজমের একটি মিশেল৷ আমাদের শিল্পকলার বিকাশে নানান দিক থেকে তাঁদের বিশেষ উলেস্নখযোগ্য অবদান থাকলেও কলকাতায় ভিক্টোরিয়ান শিল্পাদর্শে লালিত ভাববাদী এ শিল্পীরা এখানে তেমন কোনো নতুন শিল্পধারার জন্ম দেননি৷ শিল্পকলায় বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন এবং ব্যাপক প্রসারের দাবিদার অবশ্যই দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পীরা৷ তাঁদের কাছে বিষয়বস্তু গুরম্নত্বহীন হয়ে ওঠে, তাঁরা প্রথম আকার-আকৃতি এবং আঙ্গিকগত কলাকৌশল নিয়ে পরীৰা-নিরীৰা শুরম্ন করেন৷ তবে তাঁদের অগ্রজ শিল্পীরা বিমূর্ত শিল্পের চর্চা করেননি এমন নয়৷ শাকের আলী, জোবেদা আগা, জয়নুল আবেদিন, শফিউদ্দিন আহমদ বিমূর্তরীতিতে বেশ কিছু ছবি অাঁকেন৷ কিন্তু সমসাময়িক তরম্নণ শিল্পীরাই এ ধারায় বিশেষভাবে নিবেদিত হন এবং উলেস্নখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন৷

শুধু স্টাইলের দিক থেকেই নয়, চেতনা-বিশ্বাসের দিক থেকেও দুই প্রজন্মের শিল্পী দূরে সরে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু কেন দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পীরা তাঁদের গুরম্নশিল্পী জয়নুল, কামরম্নলের রিয়ালিজম আশ্রিত শিল্পরীতির প্রায় বিপরীত অবস্থানে চলে যান? অনেকের মতে, বিমূর্তরীতির আশ্রয় আসলে দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পীদের ছদ্মবেশ৷ সামরিক শাসনের কারণে শিল্পীরা বিমূর্ত ভঙ্গির আশ্রয় নিতে বাধ্য হন৷ তাঁদের বিশ্বাস, স্বাধীনতা পূর্বকালে এখানে বিমূর্তধারাটির বিকাশ লাভের কারণ বিদেশি বা সামরিক শাসকের রক্তচৰুকে উপেৰা করে শিল্পীর আপন চিনত্মা-চেতনা প্রকাশের সুযোগ নেয়া৷ অনেকাংশে তা সত্যি হলেও সর্বাংশে নয়৷ কারণ শিল্পের স্বাভাবিক বিকাশ, পূর্ণাঙ্গ বিকাশ- তার সব ৰেত্রের বিকাশই দাবি করে৷ কোথাও কোনো কারণে বিশেষ একটি ধারার বিশেষ সমৃদ্ধি হতেই পারে৷ যেমন বাংলাদেশে স্বাধীনতা-উত্তরকালে আমাদের স্বাধীনতার বিষয়াশয় নিয়ে রচিত বাসত্মববাদী চিত্রকলা, ভাস্কর্য৷ এৰেত্রে শিল্পীর গণমুখী লৰ্যের কারণে বক্তব্য মূলত সরাসরি উপস্থাপিত হয়৷ উদাহরণস্বরূপ আবদুলস্নাহ খালিদ, শাহাবুদ্দিন, শামীম শিকদার, অলকেশ ঘোষ, তরম্নণ ঘোষ, ঢালি আল মামুনের কাজের কথা উলেস্নখ করা যায়৷ কারো মতে, বাসত্মববাদী শিল্পকলা সম্পর্কে সমকালীন বৈরী সামাজিক মনোভাবের জন্য দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পীরা বিমূর্তধারার আশ্রয় নিয়েছিলেন৷ এ ধারণা সব শিল্পীর ৰেত্রে ঠিক নয়৷ কোনো শিল্পী হয়ত তাঁর চিনত্মা-চেতনার কারণে কিংবা তিনি হয়তো বুঝেছেন এ ধরনের ছবি ধর্মভীরম্ন সমাজ ভালোভাবে নেবে না৷ কারণ তখন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিসত্মানের অনেক বড় শিল্পীই শিল্পের প্রয়োজনে রিয়ালিজম ও ন্যাচারালিজমের মিশেলে প্রাণীর প্রতিকৃতি ব্যবহার করেছেন৷ তাঁরা সাহসী ছিলেন এবং ঝুঁকিও নিয়েছেন নিঃসন্দেহে; কিন্তু শুধু এ ধরনের ছবি অাঁকার জন্য (যা ধর্মত পুণ্যির কাজ নয়) বড় কোনো দুর্ভোগ তাঁদের পোহাতে হয়েছে বলে জানা নেই৷ উদাহরণস্বরূপ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কথা উলেস্নখ করা যায়৷ আমার বিশ্বাস, শিল্পীদের তখন বিমূর্তাশ্রয়ী হওয়ার পেছনে হয়তো উলিস্নখিত সমস্যা-বোধ ব্যাপার কাজ করেছে; তবে তাঁরা আসলে বিষয়াঙ্গিকের প্রয়োজনে অনিবার্যভাবেই কাজটি করেছিলেন৷ অন্যদিকে শহরের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত যে শ্রেণীর কাছে তখন শিল্পকলার কদর ছিল তাদের কাছে বিমূর্তরীতিটি কোনো বাধা হয়ে ওঠেনি৷ এটিও নিশ্চয়ই বিমূর্তবাদী শিল্পীর জন্য একটি ইতিবাচক দিক৷ তবে বিমূর্তধারাটির এই বিকাশের ৰেত্রে একটি প্রধান কারণ সম্ভবত আগের প্রজন্মের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের প্রফেশনাল বা প্রতিষ্ঠাগত দ্বন্দ্ব৷ ধনবাদী সমাজে নতুন কোনো শিল্পীর অসত্মিত্বের বিকাশ খুব কঠিন একটি বিষয়৷ এই সুকঠিন বাধা তিনি অতিক্রম করতে পারেন শুধু স্বতন্ত্র বিষয়-ভঙ্গিমা প্রতিষ্ঠা এবং তার মাধ্যমে সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণের মধ্য দিয়ে৷ জয়নুল আবেদীন, কামরম্নল হাসান, শফিউদ্দিন আহমদ, এসএম সুলতান প্রথম প্রজন্মের এসব প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা যখন তরম্নণ প্রজন্মের শিল্পীদের মাথার ওপর উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো বিরাজমান তখন অখ্যাত ও দ্বিতীয় প্রজন্মের তরম্নণ শিল্পীরা অসত্মিত্বের জন্য, শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠার লৰ্যে ভিন্ন শিল্পাঙ্গিক বেছে নিয়েছিলেন৷ অনেকের উলিস্নখিত সিদ্ধানত্মটি একেবারে অযৌক্তিক বিবেচনা করা যাবে না৷ বিশেষ করে পাশ্চাত্যের বিমূর্ত শিল্পের সংস্পর্শে আসার পর এ ধরনের শিল্প সম্পর্কে তরম্নণ শিল্পীদের প্রবল আগ্রহ এবং পাশাপাশি পাশ্চাত্য ভাবধারায় অনুপ্রাণিত এলিট শ্রেণী ও নব্যপুঁজিপতি শ্রেণীর মধ্যে যখন বিমূর্ত শিল্পের কদর লৰ্য করা যায়৷

যাহোক, ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে দ্বিতীয় প্রজন্মের একদল শিল্পী এবং এঁদের প্রবর্তিত বিমূর্ত শিল্পের ধারাটি এ দেশের শিল্পাঙ্গনে একটি শক্ত আসন পেতে নিল৷ এঁরাই আমাদের দেশের শিল্পের ভবিষ্যত্‍ গতি নির্ধারকের ভূমিকা নিয়েছিলেন৷ এরপর এলেন তৃতীয় প্রজন্মের শিল্পীরা৷ তাঁরা ছয় ও সাতের দশকে ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে ডিগ্রি লাভ করেন৷ তাঁদের মধ্যে যাঁরা সাফল্য, সুনাম এবং প্রতিষ্ঠার দিক থেকে এগিয়ে তাঁরা হলেন রফিকুন্নবী, মাহমুদুল হক, হাশেম খান, আমিরম্নল ইসলাম, আবুল বারক আলভী, মোহাম্মদ মহসীন, চন্দ্র শেখর দে প্রমুখ৷ তাঁদের অনেকেই দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পীদের অনুসারী ও তাঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নির্বস্তুক শিল্পকলা চর্চায় ব্রতি হলেও কেউ কেউ ইতিমধ্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও সাফল্যে ভাস্বর৷ উলেস্নখ্য, উভয় প্রজন্মের এসব শিল্পী বিমূর্ত ও বিমূর্তাশ্রয়ী হলেও পার্থক্য সুস্পষ্ট এবং তা বিশেষভাবে লৰণীয়৷ বস্তুত দ্বিতীয় প্রজন্ম যেখানে শিল্পের বিমূর্ত ভঙ্গিমা নির্মাণে মাধ্যম ও আঙ্গিকের পরীৰা-নিরীৰা করেছেন, তৃতীয় প্রজন্ম এসে সেসব বৈশিষ্ট্যকে আরো শাণিত, মনোগ্রাহী এবং নান্দনিক করে গড়ে তুলেছেন৷

যাক, বাংলাদেশে বিমূর্ত শিল্পকলার এই বিকাশকে যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক, এটা সর্বজন স্বীকৃত মোহাম্মদ কিবরিয়া, আবদুল বাসেত, মনিরম্নল ইসলাম, মাহমুদুল হক- এঁরা অসাধারণ সাফল্য নিয়ে বাংলাদেশের শিল্পকলায় বিমূর্তধারার এক সমৃদ্ধ জগত্‍ নিমর্াণ করেছেন৷

দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পীদের বিষয়ে আরো কিছু কথা বলা প্রয়োজন৷ সম্পূর্ণ ছয়ের দশক দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পীরা বিমূর্ত ধারায় আধিপত্য বিসত্মার করে রাখেন৷ এখানে উলেস্নখ্য, এ দেশের জাতীয় চেতনা বিকাশের সঙ্গে বিমূর্ত শিল্পকলার বিকাশের বিষয়টি যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে৷ এ শিল্পকলা একানত্মভাবেই ধর্মনিরপেৰ৷ বিষয়বস্তুতে তো নয়ই, এমনকি এই শিল্প প্রয়াসের কৃত্রিম ফর্মগুলোর সঙ্গেও কোনো ধর্ম, সমাজ বা মিথ কোনো কিছুরই উলেস্নখ বা সাদৃশ্য পাওয়া যাবে না৷ দেখা যাচ্ছে, যে সময়টাতে এই সমাজে ধর্মনিরপেৰ চেতনার বিকাশ ঘটেছে তখন বিমূর্ত শিল্পকলারও বিকাশ ঘটেছে৷ শিল্পীরা এটা সচেতনভাবেই করম্নন কিংবা তা নির্জ্ঞানেই ঘটুক, এটা যে কালেকটিভ আনকনসাস থেকে ইতিহাসের গতির অনিবার্য দাবিতে হয়েছে তা আজ নির্দ্বিধায় বলা যায়৷ কারণ তখন একই সময়ে পাকিসত্মান, ইসরায়েল ও ভারতে ধমর্ীয় বিষয়াশয়কে পুঁজি করে আধুনিক আঙ্গিকে প্রচুর ছবি অাঁকা হয়েছে৷ এৰেত্রে পাকিসত্মানের অন্যতম প্রধান শিল্পী সাদেকিনের নাম উলেস্নখ করা যায়৷ তিনি তাঁর ছবির মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন ইসলামি ক্যালিগ্রাফি৷ এদিকে অনেকের বিশ্বাস, বাঙালি শিল্পীরা সজ্ঞানেই ধর্মীয় উপকরণ বা বিষয়াশয় পরিহার করে বিমূর্তাশ্রয়ী হয়েছেন৷ ইসলামি রাষ্ট্র পাকিসত্মানে এ ঘটনা অবশ্যই অবিশ্বাস্য৷ এভাবে তাঁদের বিমূর্ত শিল্পের পূজারি হয়ে ওঠা কি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তা তাঁদের বিদ্রোহের প্রতীক নয়! নাকি তা তাঁদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাসত্মবতা থেকে উটপাখির মতো নির্বস্তুকতায় মুখ গুঁজে থাকা? উটপাখির মতো নির্বস্তুকতায় মুখ গুঁজে থাকাটাকে সত্য বলে ধরে নিলে বলতে হবে আমাদের এই সময়ের শিল্পীরা বাসত্মবতাবিবর্জিত শিল্পী৷ বলা বাহুল্য কোনো বিবেকবান শিল্পীর পৰে তা অসম্ভব৷ তবে এও অনেকটা সত্যি, সেই সময়কার অাঁকা ছবি থেকে শিল্পীদের ব্যক্তিগত-পারিবারিক, সামাজিক কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না৷ অবশ্য এভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে বিমূর্ত শিল্পকলা চর্চার কারণে আবার এই শিল্পীরা আনত্মর্জাতিক, কারণ আধুনিক চিত্রকলার আনত্মর্জাতিক ধারায় তাঁরা স্থান করে নিতে পেরেছিলেন৷ হয়ত তা স্বীকৃতির প্রশ্নে নয়, বিষয়াঙ্গিকে তাঁরা অন্য যে কোনো দেশের আধুনিক শিল্পীর সমমর্যাদার দাবিদার৷ এখানে উলেস্নখ্য, তাঁদের অনেকের তখন বিদেশ তথা পাশ্চাত্যে যাওয়ার সুযোগ হয় যা তাঁদের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে এবং আনত্মর্জাতিক মানের ছবি অাঁকার যোগ্য করে তোলে৷ উপসংহারে বলা যায়, দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পীরা সচেতনভাবেই হোক বা কালেকটিভ আনকনসাসের জন্যই হোক, তাঁদের বিমূর্ত শিল্পকলা শাসকগোষ্ঠীর বিরম্নদ্ধে প্রতিবাদী শিল্পকর্ম হয়ে দাঁড়ায়৷ তবে পরের এসব শিল্পীর অনেকেই তো বটেই এমনকি তৃতীয় প্রজন্মের অনেক বিমূর্তবাদী শিল্পী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন৷

এদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরই অর্থাত্‍ সাতের দশকের প্রায় গোড়া থেকে শিল্পাঙ্গনে নবীন তৃতীয় প্রজন্মের আবির্ভাব শুরম্ন৷ তবে সাতের দশকের মাঝামাঝি সময়টিকে স্বাধীন বাংলাদেশে তরম্নণ তৃতীয় প্রজন্মের উদ্ভবের সময় বলে ধরা হয়৷ উলিস্নখিত তিনটি প্রজন্ম বাংলাদেশের শিল্পকলাকে আনত্মর্জাতিক মানে উন্নীত করেছেন৷ তাঁরা যে তা করতে সমর্থ হয়েছেন তার একটি প্রমাণ তাঁদের নানা আনত্মর্জাতিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি লাভ৷

এবার বিশেষভাবে তৃতীয় প্রজন্মের শিল্পীদের প্রসঙ্গে আসা যাক৷ আগেই বলা হয়েছে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় উভয় প্রজন্মের শিল্পীরা বিমূর্তাশ্রয়ী হলেও দুই প্রজন্মের পার্থক্য সুস্পষ্ট এবং তা বিশেষভাবে লৰণীয়৷ বস্তুত দ্বিতীয় প্রজন্ম যেখানে শিল্পের বিমূর্তভঙ্গিমা নির্মাণে মাধ্যম ও আঙ্গিকের পরীৰা-নিরীৰা করেছেন, তৃতীয় প্রজন্ম এসে সেসব বৈশিষ্ট্যকে আরো শাণিত, মনোগ্রাহী এবং নান্দনিক করে গড়ে তুলেছেন৷

এভাবে আজ বাংলাদেশের চিত্রশিল্পে বিমূর্তধারাটি সবচেয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ জায়গাটি দখল করে নিয়েছে৷

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.