আমন্ত্রণপত্রে লিখুন ‘সুধী’, ‘সুধি’ নয়

বাংলা সুধি শব্দের অর্থ বোধ, চৈতন্য, হুঁশ, স্মৃতি, শুভবুদ্ধি, সহজ ইত্যাদি৷ প্রাকৃত বাংলায় এই অর্থে ‘সুধী’-ও ব্যবহার হয়েছে৷ অন্যদিকে সংস্কৃত ‘সুধী’ অর্থ বিদ্বান, জ্ঞানী, পণ্ডিত, সুবুদ্ধি, উত্তম বুদ্ধিবিশিষ্ট ইত্যাদি৷ কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে সম্বোধনে সুধি (ভুল করে) বা সুধী যা-ই লেখা হোক না কেন, সে শব্দ দিয়ে আমরা আমন্ত্রিতজনকে বিদ্বান, পণ্ডিত বা জ্ঞানী হিসেবে গণ্য করতে চাই; বোধ, চৈতন্য, হুঁশ, শুভবুদ্ধি ইত্যাদি হিসেবে নয়৷ সেটা করলে তা হবে অপপ্রয়োগ৷ সংস্কৃত ‘সুধী’ ঈ-কারানত্ম, কিন্তু পুরম্নষ-বাচক শব্দ৷ এর সম্বোধন পদ সুধীঃ৷ বাংলায় আমরা সাধারণ ব্যবহার এবং সম্বোধন উভয় ৰেত্রেই ‘সুধী’ শব্দের সংস্কৃত প্রথমার একবচনে ‘সুধীঃ’-র বিসর্গ (ঃ) বাদ দিয়ে লিখি ‘সুধী’৷ এ ব্যাপারে আমরা ‘নদী’ শব্দ দিয়ে তুলনা করতে পারি৷ ‘নদী’ সংস্কৃত ভাষার ঈ-কারানত্ম স্ত্রী-বাচক শব্দ৷ এজন্য এর সম্বোধন পদ ‘নদি’৷ এটা সংস্কৃত নিয়ম৷ বাংলায় প্রায়ই এটা আমরা মানি না৷ আমরা সম্বোধনেও লিখি ‘নদী যা নাকি ‘নদী’ শব্দের সংস্কৃত প্রথমার একবচন রূপ এবং বাংলায় ‘নদী’ শব্দের সাধারণ ব্যবহৃত শব্দ৷৷ যদিও সংস্কৃত নিয়ম ধরে বাংলাতেও সম্বোধনে ‘নদি’ লেখার সুযোগ রয়েছে৷ কিন্তু মূল ‘সুধী’ শব্দের সম্বোধনে ‘সুধি’ বানান কীভাবে লেখা যায়৷৷ যেখানে সম্বোধনে ‘সুধি’ বানান লেখার কোনো সুযোগই নাই৷ আমরা কি তাহলে ‘নদী’ শব্দের সম্বোধন পদ ‘নদি’-র সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে ‘সুধি’ বানান লিখছি? কিন্তু না, ‘নদি’-র সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না৷ কারণ সুধী ও নদী দুটি ভিন্নবাচক শব্দ৷ প্রথমটি পুরম্নষ-বাচক, পরেরটি স্ত্রী-বাচক৷ আর একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে৷ সংস্কৃত সখি (বটফণ তরধণভঢ) শব্দের প্রথমার একবচনে সখা এবং সম্বোধনে সখে৷ অন্যদিকে সংস্কৃত সখী (তণবটফণ তরধণভঢ) শব্দের প্রথমার একবচনে সখী এবং সম্বোধনে সখি৷ বাংলায় সাধারণত সংস্কৃত সম্বোধন পদ ব্যবহার করা হয় না৷ রবীন্দ্রনাথ ‘সখি’ শব্দের সম্বোধনে ‘সখা’ শব্দ ব্যবহার করেছেন (হে সখা, মম হৃদয়ে রহো; আয় আর-একটিবার আয় রে সখা, প্রাণের মাঝে আয়) এবং ‘সখী’ শব্দের সম্বোধনে ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ ছাড়া বাকি সব জায়গায় ‘সখী’ শব্দ ব্যবহার করেছেন (বল, গোলাপ, মোরে বল, তুই ফুটিবি, সখী, কবে; সখী, প্রতিদিন হায় এসে ফিরে যায়), কিন্তু উলেস্নখিত পদাবলীতে রবীন্দ্রনাথ সংস্কৃত সম্বোধন পদ ‘সখি’ ব্যবহার করেছেন (সখি লো, সখি লো, নিকরম্নণ মাধব; বার বার, সখি, বারণ করম্ননু)৷ সমগ্র সখা ও সখী-র তুলনায় সখি শব্দের ব্যবহার মাত্র ৮%-১০%-এর মধ্যে৷ পদাবলীর ভাষা বাংলা নয়, ব্রজবুলি বা মৈথিলি ভাষা বা বাংলার নৈকট্য ভাষা৷ মৈথিলি ভাষায় সম্ভবত সংস্কৃত সম্বোধন পদের ব্যবহার রয়েছে৷ তাই ঐ পদাবলীতেও রবীন্দ্রনাথ সংস্কৃত সম্বোধন পদ ব্যবহার করেছেন৷ কিন্তু এও সেই একই ঘটনা৷ সখী শব্দ নদী শব্দের মতোই স্ত্রী-বাচক শব্দ৷ ফলে ‘সখী’-র সঙ্গেও ‘সুধী’-র তুলনা করা চলে না৷ তাই ‘সুধী’ শব্দের সম্বোধনে লিখতে হবে সংস্কৃত হলে ‘সুধীঃ’, আর বাংলা হলে ‘সুধী’৷ কোনোভাবেই ‘সুধি’ লেখা যায় না৷ বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এর ‘সুধি’ বলে কোনো শব্দই নাই এবং ‘বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ গ্রন্থে ‘সুধি’ বানানকে অশুদ্ধ বলা হয়েছে৷ এ ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, যেমন পশ্চিমবঙ্গের সংসদ, চলনত্মিকা, প্রেসিডেন্সি ইত্যাদি থেকে প্রকাশিত বাংলা সাধারণ অভিধানগুলোতে ‘সুধি’ বলে কোনো শব্দই দেয়া নাই৷

ইঞ্জনিয়ার সাইদ আহমেদ,

সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার সওজ,

দিনাজপুর সড়ক সার্কেল, দিনাজপুর৷

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s