বর্ষার ইলিশ – নূর কামরুন নাহার

‘বরষা ওই এল বরষা ।
অঝোর ধারায় জল ঝরঝরি অবিরল
ধূসর নিরস ধরা হলো সরসা
ঘন দেয়া দমকে দামিনী চমকে
ঝঞ্ঝার ঝাঁঝর ঝমঝম ঝমকে -কাজী নজরুল ইসলাম

এভাবে বর্ষা আসে প্রিয় ও প্রিয়ার প্রিয় ঋতু হয়ে। বর্ষা আসে হৃদয়ে দোলা লাগে, জেগে ওঠে মন কোন এক অচেনা আনন্দ বেদনায়। কোন এক চেনা সুর, কোন এক অচেনা সুর মনে ডাক দিয়ে যায়। মন যেন বোঝে না মনের ভাষা। মন যেন কোন কিছুতেই আর লাগে না। মন যেন কোথায় হারিয়ে যায়।
মন হারাবার আজি বেলা/ পথ ভুলিবার খেলা।

আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে / জানিনে জানিনে কিছুতে কেন যে মন লাগে না। (রবীন্দ্র্রনাথ ঠাকুর )
এভাবে বর্ষা আসে মন হারানোর দিন হয়ে। আসে বর্ষা ইলিশের মৌসুম হয়ে। বৃষ্টিদিনের এই মন হারানো, প্রিয় সান্নিধ্যের আকুলতার সাথে প্রকৃতির রিমঝিম বাজনা, ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়া ,ক্ষণে ক্ষণে আকাশ আঁধার হয়ে আসা, মানুষের ভেতরের ভোজন রসনাকেও বাড়িয়ে দেয়। আর তাই বর্ষায় বৃষ্টির এক অবিচ্ছেদ্য অনুসঙ্গ হয়ে ওঠে খিচুরি-ইলিশ, গরম গরম ইলিস ভাজা। এই বর্ষা আর ইলিশের এই মিলন দেখা যায় বাংলা সাহিত্যেও-
‘বর্ষার মাঝামাঝি।

পদ্মায় ইলিশ মাছ ধরার মরসুম চলিয়াছে। দিবারাত্র কোন সময়েই মাছ ধরিবার কামাই নাই। সন্ধ্যার সময় জাহাজঘাটে দাঁড়াইলে দেখা যায় নদীর বুকে শত শত আলো অনির্বাণ জোনাকির মত ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। জেলে নৌকার আলো ওগুলি। সমস্তরাত্রি আলোগুলি এমনিভাবে নদীবক্ষের রহস্যময় ম্লান অন্ধকারে দুর্বোধ্য সঙ্কেতের মত সঞ্চালিত হয়। এক সময় মাঝরাত্রি পার হইয়া যায়। শহরে, গ্রামে, রেলস্টেশনে ও জাহাজঘাটে শান্ত মানুষ চোখ বুজিয়া ঘুমাইয়া পড়ে। শেষরাত্রে ভাঙা ভাঙা মেঘে ঢাকা আকাশে ক্ষীণ চাঁদটি উঠে! জেলে নৌকার আলোগুলি তখনো নেভে না। নৌকার খোল ভরিয়া জমিতে থাকে মৃত সাদা ইলিশ মাছ। লণ্ঠনের আলোয় মাছের আঁশ চকচক করে, মাছের নিষ্পলক চোখগুলিকে স্বচ্ছ নীলাভ মণির মত দেখায়।” (পদ্মানদীর মাঝি , মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়)।

ভরা বর্ষায় ইলিশের মৌসুম। আর এই সময় বাজারে ইলিশের প্রাচুর্যতা আমরা কবিগুরুর গল্পেও দেখতে পাই-

‘‘ছোটো একটা নদীর ধারে হাট। বর্ষাকালে নদী পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। কতক নৌকায় এবং কতক ডাঙায় কেনাবেচা চলিতেছে, কলরবের অন্ত নাই। পণ্যদ্রব্যের মধ্যে এই আষাঢ় মাসে কাঁঠালের আমদানিই সবচেয়ে বেশি, ইলিশ মাছও যথেষ্ট। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে; অনেক বিক্রেতা বৃষ্টির আশঙ্কায় বাঁশ পুঁতিয়া তাহার উপর একটা কাপড় খাটাইয়া দিয়াছে (সমস্যাপূরণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

পদ্মার এই ইলিশ ধরা, জেলে নৌকার পাশাপাশি বা কাছে দূরে বিচরণ, পরিচিত জেলেদের এক নৌকা থেকে আর এক নৌকায় গলা উঁচু করে কথা বলা । মাছ ধরা পরার বিষয়ে পারষ্পরিক মতবিনিময়, উচ্ছ্বাস প্রকাশ এর সুন্দর বর্ণনাও দেখা যায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসে
কুবের হাকিয়া বলে, যদু হে এ এ এ- মাছ কিবা?

খানিক দূরের নৌকা হইতে জবাব আসে, জবর।

জবরের পর সে নৌকা হইতে পাল্টা প্রশ্ন করা হয়। কুবের হাঁকিয়া জানায় তাদের মাছ পড়িতেছে জবর। (পদ্মানদীর মাঝি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়)।

এই যে রাত জেগে মাছ ধরা। মাথার ওপর সমূহবিপদ, হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে জীবিকার জন্য অন্ধকার অথৈ নদীতে পরিবার পরিজনদের ছেড়ে পড়ে থাকা। যে কোনো সময় নৌকাডুবির আশংকা। বৃষ্টি আর ঝড়ে ভেজা। এই কঠিন ঘামে ভেজা পরিশ্রমে তেমন কোনো উপার্জন হয় না জেলেদের। তাদের এই কঠিন পরিশ্রমের মাছ বাজারে পায় না উপযুক্ত দাম।

ধনঞ্জয় বলে, সাঁঁঝের দরটা জিগা দেখি কুবের।

কুবের হাঁকিয়া দাম জিজ্ঞাসা করে। সন্ধ্যাবেলা আজ পৌনে পাঁচ, পাঁচ এবং সওয়া পাঁচ টাকা দরে মাছ বিক্রি হইয়াছে। শুনিয়া ধনঞ্জয় বলে, কাইল চাইরে নামবে? হালার মাছ ধইরা জুত নাই। পদ্মানদীর মাঝি, (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়)।

শুধু বাজারের দর উঠা নামা নয়, পড়তি দর নয় । এই খেটে খাওয়া প্রান্তীয় মানুষগুলো পদে পদে ঠকে। তাদের ফাঁকি দেয় সবাই, মহাজন তাদের ফাঁকি দেয়, খুচরা ক্রেতারা দেয় না নায্যমূল্য। আবার কখনও মাছ নিয়ে যায় বাকিতে। ফলে অক্লান্ত আর অমানবিক এই পরিশ্রমের এই রুপালি ইলিশের চকচকে শরীরের কোনো ঐশ্বর্যই ঠাঁই পায় না জেলেদের ঘরে। তাদের পরিবারকে আধপেটা খেয়ে দিন কাটাতে হয়। তাদের পরনে থাকে ছেঁড়া কাপড়।

চারিদিকে নজর রাখিয়া তিনটা মাছ কুবের এক সময় কাপড়ের তলে লুকাইয়া ফেলিল। তীরে উঠিয়া শীতলের হাতে দিতেই মাছ ক’টা সে চটের থলির মধ্যে পুরিয়া ফেলিল।‘পয়সা কাইল দিমু কুবের।’

বলিয়া সে চলিয়া যায়, কুবেরও সঙ্গে সঙ্গে পা বাড়াইয়া বলিল, ‘ লন শেতলবাবু, অমন ত্বরা কইরা যাইবেন না। দামটা দ্যান দেখি।’ ‘কাইল দিমু কইলাম যে।’
‘অঁই অখন দ্যান। খামু না? পোলাগো খাওয়ামু না?’
‘পয়সা নাই ত দিমু কি? কাল দিমু, নিয্যস দিমু।’
…………….
ধনঞ্জয় নৌকায় আসিলে মাথা উঁচু করিয়া কুবের জিজ্ঞাসা করিল, ‘কতটি মাছ হইল আজান খুড়া? শ-চারের কম না, অ্যাঁ?’

ধনঞ্জয় মুখে একটা অবজ্ঞাসূচক শব্দ করিয়া বলিল, ‘হ চাইর শ না হাজার। দুই শ সাতপঞ্চাশখান মাছ। সাতটা ফাউ নিয়া আড়াই শর দাম দিছে।’
কুবের উঠিয়া বসিল।

‘ইটা কি কও খুড়া? কাইল যে এক্কেরে মাছ পড়ে নাই, কাইল না দুই শ সাতাইশটা মাছ হইছিল?’
ধনঞ্জয় তৎক্ষণাৎ রাগ করিয়া বলিল, ‘মিছা কইলাম নাকি রে কুবের? জিগাইস না, গণেশ আইলে জিগাইস।’
কুবের নরম হইয়া বলিল, ‘জিগানের কাম কী? তা কই নাই খুড়া। মিছা কওনের মানুষ তুমি না! মাছ নি কাল বেশি বেশি পড়ছিল তাই ভাবলাম তোমারে বুঝি চালানবাবুু ঠকাইছে।( পদ্মানদীর মাঝি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়)

এভাবে বর্ষা আর ইলিশ সমার্থক হয়ে উঠলেও যারা রাত জেগে এই জীবিকার জন্য রুপালি ইলিশ ধরে। জালে ওঠা রুপালি ইলিশের চকচকে শরীর দেখে খুশিতে চকচক করে ওঠে চোখ। দুচোখে স্বপ্নের ঝিলিক আনে। স্বপ্নের সেই চকচকে চোখ স্তিমিত হতে খুব বেশি সময় লাগে না। সেই চোখ যেমন দেখে না ইলিশ বিক্রির চকচকে মুদ্রার ঝিলিক, তেমনি দেখে না তার রুপালি শরীর। ইলিশ তাদের গরিবের ভাঙ্গা ঘর ফাঁকি দিয়ে চলে আসে শহরের বাজারে। শহরের বাতাসে ঘুরে ফিরে ইলিশ ভাজার গন্ধ। ইলিশ ভাজার গন্ধ যখন শহরের বাতাস মৌ মৌ করে তখন তাদের ঘরের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ঘুরে পূতিগন্ধময় বাতাস।

পাশেই কাঠের প্যাকিং কেসে একসারি মাছ ও এক পরত করিয়া বরফ বিছাইয়া চালানের ব্যবস্থা হইতেছে। খানিক দূরে মেন লাইন হইতে গায়ের জোরে টানিয়া আনা একজোড়া উঁচুনিচু ও প্রায় অকেজো লাইনের উপর চার-পাঁচটা ওয়াগান দাঁড়াইয়া আছে। মাছের বোঝাই হইয়া যথাসময়ে ওয়াগানগুলি কলিকাতায় পৌঁছিবে। সকালে বিকালে বাজারে বাজারে ইলিশ কিনিয়া কলিকাতার মানুষ ফিরিবে বাড়ি। কলিকাতার বাতাসে পাওয়া যাইবে পদ্মার ইলিশ মাছ। (পদ্মানদীর মাঝি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়)

পদ্মায় এই ইলিশ, বর্ষায় ইলিশের সমাদর। ইলিশ আর বর্ষার হাতধরাধরি এ নিয়ে যেমন লিখেছে কথাসাহিত্যিকরা, তেমনি নীরব থাকেনি কবিরা।

ওটা কী? জেলের নৌকা ?- তাই তো
জাল টেনে তোলা দায়
রুপোলি নদীর রুপোলি ইলিশ –
ইশ, চোখে ঝলসায় । (নদীর স্বপ্ন- বুদ্ধদেব বসু)

এই ইলিশ আসলেই অনন্য এক স্বাদের মাছ। বাঙালীর জীবন ও সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছে তেমনি এর স্বাদে বুঁদ হয়ে আছে ছেলে বুড়ো সবাই। ইলিশ দেখতে পেলেই যেন মন কেমন আনন্দে নেচে ওঠে। ইলিশ স্বাদ আর রুপালি রূপের ছটায় চোখ আর মন জুড়িয়ে দেয়। ইলিশ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় কিশোর আর বালকদেরও। এই ইলিশ নৌকায় বসে খাবার স্বাদই আলাদা। সেই অনন্য স্বাদের স্বপ্নই দেখে নদীর স্বপ্ন কবিতার কিশোর ভাইটি।

ইলিশ কিনলে? – আঃ বেশ, বেশ,
তুমি খুব ভালো মাঝি!
উনুন ধরাও , ছোকানু দেখাক রান্নার কারসাজি।
পইঠায় ব’সে ধোঁয়া-ওঠা ভাত,
টাটকা ইলিশ-ভাজা
ছোকানু রে, তুই আকাশের রানী
আমি পদ্মার রাজা। (নদীর স্বপ্ন- বুদ্ধদেব বসু)

কথাসাহিত্যিকদের মতো কবির চোখেও শুধু মাত্র রুপালি ইলিশের সৌন্দর্যই ভেসে ওঠেনি। ইলিশ ধরার আনন্দই ছুয়ে যায়নি। শহরের ঘরে ঘরে ইলিশ ভাজার গন্ধে আর সর্ষে ইলিশের ঝাঁজে বর্ষার এই ইলিশ উৎসবের পেছনে যে রয়েছে রাত জেগে ইলিশ ধরা আর রাত্রিশেষে মালগাড়ি বন্দী হওয়া জলের উজ্জ্বল শস্য অসংখ্য ইলিশের শব তাও তাকে ছুঁয়ে যায়। সে চিত্রই আমরা দেখি বাংলা কবিতায়

রাত্রিশেষে গোয়ালন্দে অন্ধ কালো মালগাড়ি ভরে
জলের উজ্জ্বল শস্য, রাশি-রাশি ইলিশের শব,
নদীর নিবিড়তম উল্লাসের মৃত্যুর পাহাড়।
তারপর কলকাতার বিবর্ণ সকালে ঘরে-ঘরে
ইলিশ ভাজার গন্ধ; কেরানির গিন্নি ভাঁড়ার
সরস সর্ষের ঝাঁজে। এলো বর্ষা, ইলিশ উৎসব। (ইলিশ- বুদ্ধদেব বসু)

বাঙালীর সংস্কৃতির সাথে মিশে থাকা এই ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। যার বৈজ্ঞানিক নাম:ঞবহঁধষড়ংধ রষরংযধ। এটি একটি সামুদ্রিক মাছ, যা ডিম পাড়ার জন্য বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতের নদীতে প্রবেশ করে। ইলিশ বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন এলাকা যেমন, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা, আসামেও অত্যন্ত জনপ্রিয়। ইলিশ অর্থনৈতিক ভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ গ্রীষ্মম-লীয় মাছ। বঙ্গোপসাগরের ব-দ্বীপাঞ্চল, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদীর মোহনার হাওড়ে থেকে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে ইলিশ মাছ ধরা হয়। ইলিশ প্রধানত বাংলাদেশের পদ্মা (গঙ্গার কিছু অংশ), মেঘনা (ব্র্রহ্মপুত্রের কিছু অংশ) এবং গোদাবরী নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এর মাঝে পদ্মার ইলিশের স্বাদ সবচেয়ে সুস্বাদু বলে গণ্য। ভারতের রূপনারায়ণ নদী, গঙ্গা, গোদাবরী নদীর ইলিশ তাদের সুস্বাদু ডিমের জন্য বিখ্যাত।

বর্ষার সেই ইলিশ এখন আর নেই। দেবীগঞ্জের মাইল দেড়েক উজানে কুবের মাঝিদের সে মাছ ধরার বর্ণনা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তা লিখেছিলেন ১৯৩৬ সালে। মাছ ধরার সে চিত্র যেন এখন অনেকটাই পরিণত হয়েছে রূপকথায়। নদীতে ইলিশ নেই, নেই জালভর্তি চকচকে রূপালি মাছ তোলার আনন্দ। কুবের মাঝিদের জালে পদ্মার বুক থেকে ১০ কেজি ইলিশও উঠছে না এই বর্ষায়! মাঝিদের হাহাকার চাপা কান্না হয়ে ঝরে- ‘এই পদ্মা এখন মর‌্যা গ্যালছে।…. মরা পদ্মায় ইলিশ আসবে কেথ্যাকা।’

পদ্মার সেই সুস্বাদু ইলিশ এখন স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ফারাক্কার বাঁধ মেরে ফেলেছে পদ্মাকে । শুধু পদ্মা নয় আষাঢ়-শ্রাবণের এই ভরা মৌসুমেও মেঘনাতেও তো ইলিশের আকাল। এই জলজ রুপোর দেখা নেই কিত্তনখোলাতেও। বঙ্গোপসাগরেও জাল পেতে বসে থাকতে থাকতে জেলেরা ক্লান্ত।

জুন থেকে সেপ্টেম্বরকেই ধরা হয় ইলিশের ভরা মৌসুম। এই ভরা মৌসুমে অলস সময় কাটাচ্ছেন শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি, চরজানপুর ও জালালপুর মৎস্যপল্লীর জেলেরা। নদীতে ইলিশ না থাকায় সারি সারি নৌকা আর ট্রলার পড়ে আছে নদীতেই। পড়ে আছে এ অঞ্চলের জনশূন্য ৩০০টি ইলিশের আড়ত। নদী অববাহিকায় ৪০টি মাছ বাজারে নেই তেমন ভিড়।

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায়। দিনরাত বিচরণ করে ইলিশ পাচ্ছে না জেলেরা । চাঁদপুর শহরের পুরান বাজার, আনন্দ বাজার, যমুনা রোড, টিলাবাড়ী, লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের রামদাসদী, বহরিয়া বাজার, হানারচর ইউনিয়নের হরিণা ফেরিঘাট নদীতীরবর্তী এলাকায় ইলিশ জেলেদের নৌকা ঘাটেই অবস্থান করছে। জেলেদের ভাষ্য- ইলিশ না পাওয়ার কারণে তারা নদীতে নামছে না। মাছ না থাকায় দেশের খ্যাতনামা ইলিশের আড়তগুলোতো প্রাণ নেই। ব্যবসায়ীরা দাদন দিয়ে এখন দিশেহারা।

অন্যান্য বছর কমবেশি দক্ষিণ অঞ্চলের ইলিশের আমদানি থাকলেও এ বছর পরিমাণ অনেক কম। রমজান মাসে ইলিশ শূন্য ছিল বরিশাল। এভাবে নদী যেন ইলিশ শূন্য হয়ে পড়ছে। এখানের ১৫০টি মৎস আড়ত প্রাণহীন শূন্যতায় পথ চেয়ে বসে আছে ইলিশের ধরা পড়ার।

কেন নদীগুলো এভাবে ইলিশশূন্য হয়ে যাচ্ছে? ইলিশের এই আকালের পেছনে চিহ্নিত করা হয়েছে দুটো কারণকে। প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট সঙ্কট। প্রাকৃতিক কারণের মধ্যে অন্যতম হলো জলবায়ুর পরিবর্তন। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বাড়ছে নদীর পানির উষ্ণতা । বজ্রবৃষ্টির পরিমাণ যাচ্ছে কমে। এ ছাড়া সাগর মোহনায় জমছে পলি, কমে যাচ্ছে নাব্য। আর মানবসৃষ্ট কারণের অন্যতম হলো বাদ-বিচারহীন শিকার। বিশেষ করে বাচ্চা ইলিশ (জাটকা) নির্বিচারে ধরা। এর সাথে রয়েছে নদীদূষণ। নদীতে ক্ষতিকর বর্জ্যরে পরিমাণ সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। নদীগুলো পরিণত হয়েছে মরা নদীতে। বেঁচে থাকার ন্যূনতম পরিবেশ না থাকলে মাছও থাকবে না- সেটাই রীতি।

এক সময় নদীকে ঘিরেই ছিল আমাদের জীবন, অর্থনীতি, কৃষি ও সংস্কৃতি। পদ্মা, মেঘনা, সুরমা, যমুনা আর হাজারো নদী আমাদের সাহিত্য, গান কবিতায় উঠে এসছে বার বার। এই বাংলায় বহু বিদেশীশক্তি জলপথেই এসেছিল বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে। নদীই ছিল তখন সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দ্।ু এই বিস্তৃত জনপদের মানুষের পুষ্টি, আমিষ ও সুস্বাদু খাবারের এক বিরাট উৎস ছিল সুস্বাদু পানির মাছ, নদীর মাছ। হাতের জালে জলের মাছ।

এভাবেই নদীকে ঘিরে বহমান ছিল বাংলা এবং বাঙালীর জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি বাঙালীর জীবন আর ঐতিহ্যের সাথে জড়িয়ে আছে ইলিশ মাছ। ইলিশ মাছ আর পদ্মাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল নানা বাণিজ্যকেন্দ্র আর জীবনের মুখরতা। যেমন বলা যায়, কুষ্টিয়া জেলার মীরপুর উপজেলার বহুল আলোচিত তালবাড়ীয়াঘাট ও পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার সাঁড়ারঘাটের কথা। সাঁড়ারঘাট বেয়ে পদ্মা নদী কিছুটা রূপপুরমুখে এগিয়ে বাঁক নিয়ে আবার বয়ে গেছে সোজা শিলাইদহ হয়ে গোয়ালন্দমুখে। এই বাঁক নিতে গিয়েই তালবাড়ীয়াঘাটের কাছে পদ্মার উদর থেকে জন্ম নিয়েছে এক সময়ের গৌড়ি আজকের গড়াই নদী। আঠারো শতকের শেষ দিকে এখানে নদী ছিল খরস্রোতা এবং গভীর। এখানে ছিল ইলিশের বিশাল অভয়াশ্রম। নিরাপদ অথচ প্রজননে স্বাচ্ছন্দ্য এলাকা হিসেবে এটা ইলিশের খুব পছন্দের জলাভূমি ছিল।

ইলিশ মাছ সামুদ্রিক প্রাণী। দল বেঁধে জীবনের বেশির ভাগ সময়টাই কাটিয়ে দেয় সাগরে। কিন্তু প্রজননের সময়টাতে অর্থাৎ ডিম পাড়ার জন্য এরা উঠে আসে নদীতে। বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যে ইলিশের বিচরণস্থল হচ্ছে মূলত পদ্মা-মেঘনা-যমুনা অববাহিকা। আর পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গা। বছরে দুইবার ডিম পেড়ে বাচ্চা ফোটাতে এরা নদীতে ঢোকে। একবার সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে, আরেকবার ফেব্রুয়ারি-মার্চে। স্বভাবগত কারণে ইলিশ ৪০ ফুট গভীরতায় চলাচলে অভ্যস্ত। গভীরতা কম হলেই মাছের চলাচল বিঘ্নিত হয়। আমাদের সমুদ্র মোহনায় কোথাও কোথাও গভীরতা ১৫ ফুটের মতো। ফলে নদীতে না ঢুকে ইলিশ ডিম পাড়ছে মোহনাতেই। এটা স্বাভাবিক নিয়মের পরিপন্থী। এতে ইলিশের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশের নদী বিশেষ করে পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের পাঁচটি অভয়াশ্রম আছে। চাঁদপুর, শরীয়তপুর, লক্ষ্মীপুর, ভোলা ও বরিশালসংলগ্ন এ সব অভয়াশ্রমে এসে ইলিশ ডিম পেড়ে বাচ্চা ফোটায়। মৎস্য বিশেষজ্ঞ মতে, একটি ইলিশ যে ডিম পাড়ে তার থেকে এক লাখ রেণুপোনা উৎপন্ন হয়। আশ্বিনের পূর্ণিমায় ইলিশ ডিম ছাড়ে। সে জন্যই ৬ অক্টোবর থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় জাল দিয়ে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষেধ। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা না মেনে তখনো জাল ফেলে মা মাছ ধরা হয় নির্বিচারে। অসংখ্য ডিম চলে যায় রসনায়। নবেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত জাটকার দ্রুত বেড়ে ওঠার সময়। এর মধ্যে মার্চ ও এপ্রিল হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।

এ সময়ও সব নদীতে জাল ফেলা নিষিদ্ধ। কিন্তু জেলেরা এ নিষেধাজ্ঞা মানে না। এমনকি কারেন্ট জাল ফেলে নির্বিচারে ধরা হয় জাটকা। ফলে ভরা মৌসুমে নদী হয়ে পড়ছে ইলিশশূন্য। প্রতিবছর যে ১৪ হাজার ১৫০ টন জাটকা ধরা হয় এর ২০ ভাগও যদি রক্ষা পেত তাহলেও বছরে এক লাখ ৭০ হাজার টন অতিরিক্ত ইলিশ পাওয়া যেত। যার বাজার মূল্য দাঁড়াত তিন হাজার কোটি টাকা। তবে মৎস বিষেজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইলিশ মৌসুম পরিবর্তন হয়েছে। এখন এই মৌসুম হয়েছে আশ্বিন-কার্তিক মাস।

সবজায়গার ইলিশের চেয়ে পদ্মার ইলিশের সুনাম সবচেয়ে বেশি। এর কারণ হচ্ছে সমুদ্রে ধরা পড়া ইলিশের স্বাদ অতটা রাজকীয় নয়। কিন্তু ইলিশ যখন নদীতে ঢোকে মাছের স্বাদ বদলে যায়। একটি মাছ তার জীবনকালে ১২শ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। প্রজনন মৌসুমে বাংলাদেশের নদীগুলো দিয়ে ইলিশ পাড়ি দেয় ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পথ। সমুদ্র্রের নোনা পানি থেকে মাছ যত উজানের পথে ছুটতে থাকে ততই তার শরীর থেকে ঝরতে থাকে আয়োডিন, লবণসহ আরও কিছু খনিজ পদার্থ। এ সময়টাতে ইলিশ কিছু খায়ও না। এভাবে চলতে চলতে উজানের শেষ সীমানা পদ্মায় পৌঁছানো ইলিশ স্বাদেগন্ধে হয়ে ওঠে অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

বাংলাদেশের উপকূলের পরিবেশ দিন দিন বিরূপ হয়ে ওঠার কারণে ইলিশের ঝাঁক মিয়ানমারের ইরাবতী মোহনার দিকে চলে যাচ্ছে। আরেকটি দল গুজরাটের তাপ্তি মোহনার দিকে সরে গেছে। এ রকম পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ তালিকা থেকে উধাও হয়ে যাবে।

মৎস্য গবেষক, মৎস্য ব্যবসায়ীদের অভিমত, পদ্মা-মেঘনা নদীতে ইলিশের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নদীর নাব্যসঙ্কট থেকে নদীকে স্বাভাবিককরণ, প্রজনন মৌসুমে ইলিশ শিকার পুরোপুরি বন্ধ এবং জাটকা নিধন রক্ষায় সর্বস্তরের মানুষ সচেতন না হলে বাঙালীর প্রিয় ইলিশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে । শুধু তাই নয়, মৎস্য বিভাগের মতে পদ্মা, মেঘনা, আড়িয়াল খা, কীর্তিনাশা, জয়ন্তিয়া ও নীলাঞ্জনা নদীর অববাহিকায় তালিকাভুক্ত ১৫ হাজার ১৯৯টি জেলে পরিবারের বাস, চাঁদপুর জেলার প্রায় ২৮ হাজার জেলে আর বরিশালের প্রায় ৫ হাজার মৎস শ্রমিকের আয়ের প্রধান উৎস এই ইলিশÑ তাদের জীবনযাপন বির্পযন্ত হয়ে পড়বে।

ইলিশ আমাদের জনজীবনের সাথে ওতপ্রেতভাবে জড়িয়ে আছে। জড়িয়ে আছে আমাদের আবহমানকালের সংস্কৃতির সাথে। ইলিশ নিয়ে আছে আমাদের বহু অন্তরঙ্গ বিষয়, আমাদের উৎসব, আতিথেয়তার স্মৃতি। আছে আমাদের পারিবারিক আনন্দ ও আন্তরিকতা। এই ইলিশ বর্ষার সাথে, বৃষ্টির সাথে এতটাই মিশে আছে যে আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই ছড়াটি।

ইলশে গুঁড়ি ইলশে গুঁড়ি
ইলিশ মাছের ডিম,
ইলশে গুঁড়ি ইলশে গুঁড়ি
দিনের বেলা হিম

তাই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলেই আমাদের চোখে মনে ভেসে ওঠে ইলিশের ছবি। আর তা থেকেই আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির শব্দ ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি। বর্ষা আসলেই দড়িতে বেঁধে ঝুলিয়ে বাজার থেকে ইলিশ নিয়ে ঘরে ফেরার দৃশ্য ছিল অতি পরিচিত দৃশ্য আর সে ইলিশ নিয়ে কৌতূহল উৎসূক্যের শেষ ছিল না। পথে পথে সেই ইলিশের দাম জিজ্ঞাসাও যেন ছিল বাঙালীর আন্তরিক ও আপন মননের পরিচায়ক। এই সব নিয়ে হাস্যকৌতুকও কম নয়। গোপালভাঁড়কে ইলিশ কিনে ফিরতি পথে কেউ দাম জিজ্ঞেস না করার ছুড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ আর সেই মাছ নিয়ে গোপালভাঁড়ের দিগম্বর হয়ে বাসায় ফেরা এইসব হাস্যকৌতুকও বাঙালীর জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে পরম মমতায়। এভাবেই ইলিশ মিশে আছে আবহমানকাল থেকে আমাদের জীবনধারায়, প্রতিদিনের গল্পে আর কথা কবিতায় ।

মূলত একটা সময় ছিল যখন ইলিশকেন্দ্রিক নদীর ঘাটগুলোতে বর্ষা হতে শীতের সময় পর্যন্ত প্রতিদিন ইলিশ মাছ ধরার ধুম পড়ে যেত। বিভিন্ন এলাকার জেলেরা ওসব জায়গায় এসে দিবারাত্রি ইলিশ ধরত। এই মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে ওসব এলাকাতে মেলা বসত। পালা গান, যাত্রা গান, মারফতি গানের আড্ডা, মুর্শিদী গান, কীর্তনসহ লোকজ মেলা হতো এখানে। জেলেরা বিভিন্ন জালের সমারোহ ঘটিয়ে মাছ ধরতে প্রতিযোগিতায় মত্ত হতো।

এই মাছ ধরাকে ঘিরে নির্ধারণ করা হতো অনেক পরিবারের বিয়েসহ অন্যান্য অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ। ইলিশের বিখ্যাত ঘাট সাঁড়ারঘাট এবং তালবাড়ীয়াঘাটের মাছকে নিয়ে অনেক গল্প-গানও প্রচলিত ছিল। জলেদের কোলাহল আর আনন্দ আড্ডায় মাতোয়ারা থাকত আশপাশ এলাকার মানুষও। রুপালি ইলিশের চকচকে শরীর স্বপ্নের অঞ্জন এঁকে দিত চোখে। এখন পদ্মা জল হারিয়েছে। মাছ হারিয়েছে। আমরা নদীগুলোকে হত্যা করেছি। নিজস্ব সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে ভুলতে বসেছি। হারিয়ে ফেলেছি সেই বর্ষার আমেজ, সেই বর্ষার ইলিশ। বাতাসে এখন আর ছড়িয়ে পড়ে না খিচুড়ির সাথে ইলিশ ভাজার গন্ধ।

ইলিশ যেমন আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির অংশ, তেমনি ইলিশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থকরি মাছ। তাই একে জলের রুপালি শস্যও বলা হয়। গত পাঁচ বছরে ২২,০২১ মেট্রিক টন ইলিশ রফতানি করে আয় হয়েছে প্রায় ১০০০ কোটি টাকা।

তাই আমাদের সেই হারানো ঐতিহ্যকে পদ্মার সেই সুস্বাদু ইলিশকে, বাতাসে ইলিশ ভাজার সেই গন্ধকে ফিরিয়ে আনতে হবে। আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে ইলিশ মাছকে বাঁচাতে। বাঁচাতে হবে নদী। অবিবেচকের মতো জাটকা মেরে ইলিশ নিধন করলে চলবে না। মা ইলিশকে বাঁচাতে হবে। প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করতে হবে, ফিরিয়ে আনতে হবে ইতিহাস ঐতিহ্যের অনুসঙ্গ, আমাদের সেই রুপালি স্বপ্নের রুপালি রাজাকে।

জনকন্ঠ

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s