নৌকা প্রার্থীর নির্বাচন বয়কটের নেপথ্যে

পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে একের পর এক কেন্দ্রে ককটেল হামলা চালিয়ে কেন্দ্র দখল করতে না পেরে পুন:নির্বাচনের দাবিতে নির্বাচন বয়কট করে নজির স্থাপন করছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী রিপন হোসেন পাটোয়ারি।

কোনো ইউপি নির্বাচনে সরকার দলীয় প্রার্থীর নির্বাচন বয়কটের এমন ঘটনা বিরল। এ নিয়ে মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক মহলসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।

এমনকি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীও তার সঙ্গে ছিলেন না। দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর রিপন হোসেন পাটোয়ারী বহিরাগতদের নিয়ে বারবার এলাকা দখলের চেষ্ঠা চালিয়ে ব্যর্থ হন।এসময়ে সেখানে শত শত ককটেল ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।

এমনকি নির্বাচনের দিনও কেন্দ্রে কেন্দ্রে শত শত ককটেল ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটায় রিপন সমর্থকরা। পুলিশকে লক্ষ্য করেও তারা ককটেল নিক্ষেপ করেন। এটি সদর উপজেলার চরাঞ্চলের মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের ঘটনা।

স্থানীয়রা জানান, রিপন হোসেন পাটোয়ারী মোল্লাকান্দির স্থানীয় বাসিন্দা নন। গত নির্বাচনে প্রথমবার মোল্লাকান্দিতে এসে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।এরপর এলাকায় নানা ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু করেন।

ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে সাধারণ মানুষদের নির্যাতন চালান।এতে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেন মোল্লাকান্দির মানুষজন। মোল্লাকান্দির দলীয় নেতারাও তার বিপক্ষে অবস্থান নেন। এরইমধ্যে গত ৮ই এপ্রিল মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চরাঞ্চলের ৫টি ও মহাকালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্ধারণে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শহরের জেলা আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে স্থানীয় মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক করেন। অভিযোগ, তৃণমূলের ভোটারদের মতামত উপেক্ষা করে কাউন্সিল ছাড়া জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন।এরপর দল বেধে বঞ্চিত প্রার্থীরা কেন্দ্রে ছুটেন। লিখিতভাবে নানা অভিযোগ করেন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির বিরুদ্ধে।

এদের মধ্যে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মহসীনা হক কল্পনা সবার আগে গত ৯ই এপ্রিল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনী বোর্ডের চেয়ারম্যান শেখ হাসিনার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন মনোনয়ন বাণিজ্য ও প্রার্থী নির্ধারণে তৃণমূলের কোন মতামত না নেয়ার। শেষাবধি রিপন পাটোয়ারিকে চূড়ান্ত প্রার্থী করা হলে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহ আলম মল্লিক, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ফরহাদ খা, সহসভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা হেলালউদ্দিন সৈয়াল, সাধারণ সম্পাদক আজহারউদ্দিন মোল্লা ও সাংগঠনিক সম্পাদক স্বপন দেওয়ানসহ মোল্লাকান্দির তৃণমূল আওয়ামী লীগ মহসীনা হক কল্পনাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী করে মাঠে নামেন।বিদ্রোহী প্রার্থী কল্পনা আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আলম মল্লিকের আপন ভাগ্নি।স্থানীয় নেতাদের মধ্যে সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা মোল্লা রিপন পাটোয়ারিকে সমর্থন দিলেও মাঠে দেখা মিলেনি তার।

এতে করে দলীয়ভাবে নৌকা প্রতীক পেলেও মোল্লাকান্দিতে কোনঠাসা হয়ে পড়েন রিপন পাটোয়ারি। ব্যাপক ককটেলবাজি, বোমা হামলা, গুলি ও বিদ্রোহী প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুর করে এলাকা দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন নৌকার প্রার্থী। ১৮ ই মে পূর্ব মাকহাটি ঈদগা মাঠে নৌকার প্রার্থী রিপন পাটোয়ারির উঠোন বৈঠকে শেষে শতাধিক মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের ছেলে মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ফয়সাল বিপ্লব শহরের বাড়ি ফিরছিলেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে মাকহাটি বাজারে বিদ্রোহী প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুরের অভিযোগে তাদের ওপর হামলা হয়। ফয়সাল বিপ্লব, নৌকার প্রার্থীসহ অন্তত ১০ নেতাকর্মী লাঞ্ছিত হয়। প্রাণ রক্ষার্থে তারা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।এ সময় দুইটি মাইক্রোবাসের কাঁচ ভাঙচুর ও একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়।এরপর আর মোল্লাকান্দিতে যাওয়া হয়ে উঠেনি আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক ফয়সাল বিপ্লবদের।

নির্বাচনের দিন ভোট শুরুর ঘন্টাখানেক পরপরই কেন্দ্র দখলে নৌকার সমর্থকরা ব্যাপক ককটেল হামলা ও গুলিবর্ষণ শুরু করেন।চরডুমুরিয়া কেন্দ্র পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি ছুড়েন। সেখানে প্রায় দুই ঘটনা ভোট গ্রহণ বন্ধ ছিলো। এ কেন্দ্রটি নৌকার ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত এবং নৌকার প্রার্থী এ কেন্দ্রের ভোটার। নিজ কেন্দ্রেই এ রকম ঘটনায় সাধারণ মানুষ বিস্মিত হয়েছেন। নিজের আরেকটি কেন্দ্র মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় কেন্দ্রেও তারা পুলিশ ও কেন্দ্র লক্ষ্য করে শত শত বোমা বিস্ফোরণ ঘটনা। রাজারচর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল ৯টা থেকে খালের ওপাড়ের জমি থেকে নৌকার সমর্থকরা ভোট কেন্দ্র লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ককটেল বিস্ফোরণ ঘটালে ভোট গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়।

পরে র‌্যাবের উপস্থিতিতে বেলা পৌনে ১১টায় পুনরায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়। নোয়াদ্দা এবতেদায়ী সরকারি মাদ্রাসা কেন্দ্রে নৌকার সমর্থকরা ৫০-৬০টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। মুন্সিকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের আশপাশে ভোটগ্রহণের শুরু থেকেই থেমে থেকে ককটেল বিস্ফোরিত হয়। সচেতন মহলের ধারণা, মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের নির্বাচন স্থগিত করার লক্ষ্যে নৌকার সমর্থকরা নিজ কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন কেন্দ্রে ককটেল হামলা চালায়।

শেষাবধি বেলা ১১টার দিকে রিপন পাটোয়ারি পুন:নির্বাচন দাবি করে স্থানীয় নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও জেলা পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। ভোট গননা শেষে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। বিদ্রোহী প্রার্থী মহসীনা হক কল্পনা ১০হাজার ৪৬৮ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। নৌকা প্রার্থী রিপন হোসেন পাটোয়ারি পেয়েছেন।১ হাজার ২৪১ ভোট। নির্বাচনের পরপরই ভয়ে ও হামলা আতঙ্কে নৌকার সমর্থকরা এলাকা ছেড়ে দেয়। তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। আবার অনেকে মুন্সীগঞ্জ শহরেরই আগে থেকেই বসবাস করছেন।

এদিকে, নির্বাচন বয়কটকারী নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী রিপন পাটোয়ারী বলেন, মহসিনা হক কল্পনার সমর্থকরা পুরো ইউনিয়নে শোডাউন, ককটেল হামলার ভয় দেখাচ্ছে। অনেক নৌকার সর্মথকের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে, এমনকি আমার গ্রামের বাড়িটাও বাদ পড়েনি। এখন এসব গ্রামে ছোট ছোট বাচ্চা, মহিলা আর বৃদ্ধরা বাস করছেন। গ্রামের লোকজন মুন্সীগঞ্জ শহরের কাচারি, মানিকপুর, মুক্তারপুর, মাঠপাড়ার বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজন ও আমার বাড়িতে অবস্থান নিয়েছে। পুলিশ প্রশাসনও নিরাপত্তা দিচ্ছে না। আমার বাড়িতে নঙ্গরখানা খোলা হয়েছে। অন্তত অল্প কিছু খেয়ে বেঁচে থাকুক।

নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মহসীনা হক কল্পনা বলেছেন, আমি জনগণ নির্বাচিত করেছেন। আমি কাউকে গ্রাম ছাড়া করবো কেন। আর তারতো কোন জনসমর্থনই নেই। জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. মহিউদ্দিন জনসমর্থনহীন রিপন পাটোয়ারিকেতো টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দিয়েছে। কিন্তু আমার সঙ্গে ছিলেন মোল্লাকান্দির আপমর জনগণ।

তিনি আরও বলেন, তাদেরকে বের করে দেওয়া হয়নি, তারা এমনিতেই চলে গেছে। পরিস্থতি ঘোলাটে করার জন্য রিপন পাটোয়ারি এমন করছে। আমি কল্পনা বলছি, গ্রামের কোনো লোক বাইরে থাকবে না, আমি গ্রামে আসতে বলছি, আমার লোক কেউ কিছু বললে আমি তাদের আইনের কাছে তুলে দিবো। প্রশাসন, আমি আর রিপন সাথে থাকলে কোন সমস্যা নেই। সবাই মিলে গ্রামের লোক গ্রামে নিয়ে আসবো। আর রিপনের ঘরবাড়ি কে ভাঙছে, আমি জানি না।

মুন্সীগঞ্জ পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদার জানান, বাড়িছাড়া কতজন হবে তা সঠিক সংখ্যা জানা নেই। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই আমাদের পুলিশ এখানে আছে। পক্ষ বিপক্ষ অভিযোগ আছে, বিশেষ করে মোল্লাকান্দিতে আমাদের পুলিশ সতর্কাবস্থায় আছেন।

ওদিকে, আধারায় ও মহাকালীতেও নৌকা প্রাথীদের পরাজয় হয়েছে। আধারায় জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সামছুল কবিরকে মনোনীত করেন। কিন্তু কেন্দ্র থেকে হাজী মো. সোহরার হোসেন মনোনয়ন নিয়ে আসেন। শেষাবধি সামছুল কবির স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। তার পক্ষে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির ছোট ভাই সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছউজ্জামা আনিছ, সভাপতির ছেলে ফয়সাল বিপ্লব ও আধারা বিএনপির সভাপতি দেলোয়ার হেসেন দেওয়ান ও সাবেক চেয়ারম্যান রহমত আলী মোল্লাসহ বিএনপির নেতারা মাঠে নামেন। শেষাবধি আওয়ামী লীগের একটি অংশ ও বিএনপির ভোটে বিদ্রোহী প্রার্থী সামছুল কবির জয়লাভ করেন। মহাকালীতে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। এ ইউনিয়নটি বিএনপি অধ্যুষিত।

এবার এ ইউনিয়নের বিএনপির কোন প্রার্থী দেয়া হয়নি। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হন সাবেক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম বিরাজ। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশের ও বিএনপির ভোটে বিদ্রোহী প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম বিরাজ জয়লাভ করেন। নির্বাচনের দিন রাতে শহরের কোটগাঁওয়ে নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বিরাজের বাড়িঘর ভাঙচুর করে কোটগাঁওয়ের আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা।

পূর্ব পশ্চিম

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s