জেনারেল হাসপাতালে ছদ্মবেশে দালাল চক্র

এম.এম.রহমান: মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ভেতরে- বাইরে ছদ্মবেশে রোগী ধরা দালাল চক্রের অভাব নাই। শহরের বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে একাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। ফলে হাসপাতালের ভেতরে- বাইরে সক্রীয় রোগী ধরা দালাল চক্র।এসব দালালদের কাজ হচ্ছে পরিক্ষা- নিরিক্ষা ও অপারেশনের রোগী ভাগিয়ে নেয়া।

খোদ এ হাসপাতাল ঘিরেই রয়েছে অর্ধ শতাধিক পেশাদার ছদ্মবেশী দালাল।

সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, বুধবার সকাল ১১টার সময় রোগী নিয়ে একটি সিএনজি মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের গেটের সামনে থামল। রোগী যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। রোগীর পরিজনেরা কী করবেন, কোন দিকে যাবেন,এ সব ভাবছেন। স্ট্রেচার নিয়ে হাজির একদল বোরখা পড়া ছদ্মবেশী মহিলা দালাল। রোগীকে পাঁজাকোলা করে ধরে তারাই স্ট্রেচারে তুললেন। জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে ওয়ার্ডেও পৌছে দিলেন! হাসপাতালের ঢোকার পথ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়ার্ডে, করিডোরে ঘুর ঘুর করে ভদ্রবেশে অনেক ছদ্মবেশী দালাল।রোগীর ভালোমন্দ খোঁজ খবর নেওয়ার অজুহাতে অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেন তারা। তারপর হাসপাতালের চিকিৎসার সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। তাছাড়া বহিঃ বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর পরিক্ষা- নিরিক্ষা হাসপাতালে হয়না, আমার সাথে আসুন স্বল্পমূল্যে আপনার পরিক্ষাগুলো করে দিব। আপনাকে রিপোর্ট দেখাতে আর কষ্ট করে হাসপাতালে আসতে হবেনা।এ ডাক্তার আমাদের ক্লিনিকে বসেন।

আবার ডাক্তাররা রোগীদেরকে সরাসরি দালালদের হাতে তুলে দিয়ে বলেন,ওদের সাথে গিয়ে পরিক্ষাগুলো করিয়ে নিয়ে আসেন। এতে করে গ্রাম থেকে আসা রোগীরা সরল বিশ্বাসে ডাক্তারের কথা মতো দালালদের সাথে গিয়ে বাহিরের ক্লিনিক ও ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারে পরিক্ষা করান।

সূত্র আরো জানায়, হাসপাতালে আসা ডেলিভারী এবং অপারেশনের রোগীদের দালালরা রোগীর মনে ভয় দেখিয়ে বলেন এখানে ভাল চিকিৎসা হবেনা। এর পর সুযোগ বুঝে প্রাইভেট ক্লিনিকে শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন। রোগীর অভিভাবক তাদের কথায় কান দিলেই হলো। সুকৌশলে তারা মস্তিস্ক ধোলাই করে রোগী ভাগিয়ে ক্লিনিক ও ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারে নেওয়ার কাজটি অবশেষে সফল করে দালাল চক্রটি। এ চিত্র এখন হাসপাতালের নিত্যদিনের।

২য় তলায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগী সোরিয়া বেগম বলেন, ডাক্তার দেখাইয়ে বাহির হওয়ার পর রুমের ভেতরে বসে থাকা দালাল আমাকে ক্লিনিকে নিয়ে যায়। ডাক্তারের পরিচিত ল্যাবে পরিক্ষা করিনি বলে ডাক্তার পূনরায় রিপোর্ট করতে বলে নারায়নগঞ্জ থেকে। আমি ডাবল টাকা খরচ করে পূনরায় পরিক্ষা করে ডাক্তারকে দেখালাম।

নিচতলায় ১১২ নাম্বার রুমে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ছাবিনাকে সোমা আক্তার নামের দালাল বাহিরে নেওয়ার চেষ্টাকালে হাতেনাতে ক্যামেরায় ধরা পরেন। রোগী ফেলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে পালিয়ে যায় সোমা। পরে ছাবিনা হাসপাতালেই পরিক্ষা- নিরিক্ষা করেন। ছাবিনা অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতালের ডাক্তাররা বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের দালালদের আশ্রয় দিচ্ছে। প্রকাশ্যে প্রতিটি রুমে ক্লিনিকের দালাল মেয়েরা বোরখা পড়ে সিরিয়াল ম্যানেজ করার অজুহাতে দাঁড়িয়ে থাকে। ডাক্তার রোগীর পরিক্ষা লিখার সাথে সাথে রোগীর হাত থেকে স্লিপ টেনে নিয়ে ভূল বুঝিয়ে বাহিরে পরিক্ষা করতে নিয়ে যায়।

১১২ নাম্বার রুমে দায়িত্বরত ডাক্তার আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতিদিন ৮০-৯০ জন রোগীর চিকিৎসা দেই। রোগীর চাপে অনেকটা দিশেহারা হয়ে যাই । এর মধ্যে দালাল মেয়েরা বোরখা পড়ে মুখে নেকাপ লাগিয়ে রুমে ঢুকে পড়ে। রোগীরা রুম থেকে বের হওয়া মাত্র দালালদের খপ্পরে পড়েন। দালালরা রোগীদের ফুঁসলিয়ে ক্লিনিকে নিয়ে যায় ব্লাড টেষ্ট করানোর জন্য।

হাসপাতালকে দালালমুক্ত করতে ইতিপূর্বে প্রশাসন সোমা আক্তার, রোকসানা, সিরাজমিয়া,লিপি, নাছরিন আক্তারসহ ৫ জন মহিলা দালালকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন। কিন্তু পরে তারা আবার সুসংগঠিত হয়ে পূনরায় রোগী ভাগানোর মিশনে সক্রিয় হয়। আগের সেই সোমারা এখন প্রকাশ্যে হাসপাতালে আরো বেপরোয়া। জামিনে বের হয়ে আসা দালালদের সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাসপাতালে চষে বেড়াতে দেখা যায়।

এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, দালালদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। দালালদের কোনভাবে ছাড় দেয়া হবেনা। ইতিপূর্বে অনেক দালালকে আইনের হাতে তুলে দিয়েছি। দু”একদিনের মধ্যে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

হাসপাতালের ভেতরে- বাইরে রয়েছে রোগী ধরা দালালদের অঘোষিত সিন্ডিকেট। এদের ঐক্যও বেশ মজবুত। আর তাদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেন খোদ হাসপাতালের ডাক্তার ও স্টাফরা। অনেকটা সর্ষের মধ্যে ভূত। সাধারন রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত, দালালদেরকে প্রশ্রয় প্রদানকারীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে প্রশাসন এমনটাই দাবী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের।

সবখবর২৪

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s