অভিযোগের দায় কাঁধে নিয়ে গভর্নর মাসুযোয়ের পদত্যাগপত্র দাখিল

রাহমান মনি: রাজনৈতিক তহবিলের অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ কাঁধে নিয়ে টোকিও মেট্রোপলিটন গভর্নর ইয়োইচি মাসুযোয়ে পদত্যাগপত্র দাখিল করেছেন। ১৫ জুন বুধবার সকালে টোকিও মেট্রোপলিটন অ্যাসেম্বলি প্রেসিডেন্ট তোশিআকি ইয়োশিনো বরাবরে তিনি এ পদত্যাগপত্র দাখিল করেন। আর এতে করে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলে আসা অচলাবস্থার অবসান ঘটে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে শিনজো আবের জোট সরকার।

গত মে মাসের প্রথম দিক থেকেই গভর্নর মাসুযোয়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক তহবিল ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে ব্যবহারের অভিযোগ চলে আসে মিডিয়াতে। প্রথমে মাসুযোয়ে এ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন আখ্যায়িত করে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে থাকেন।

হোটেল খরচ, কেনাকাটা এবং অফিস সাজানোর জন্য চিত্রকর্ম ক্রয়ে বিধিবহির্ভূত খরচ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ মিডিয়ায় আসলে মেট্রোপলিটন অ্যাসেম্বলি পরিষদ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

তদন্তে এমন কিছু খরচের সন্ধান পান যা আদৌ প্রয়োজন ছিল না বা মাসুযোয়ের ব্যক্তিগত খরচই বলা চলে। তদন্ত প্রতিবেদনে মাসুযোয়ের বিরুদ্ধে ৪৪ লাখ ইয়েন বা ৪০ হাজারেরও কিছু বেশি মার্কিন ডলারের তছরূপের কথা উল্লেখ করা হয় এবং এ ব্যাপারে মাসুযোয়ের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে কারণ ব্যাখ্যার দাবি জানানো হয়। মিডিয়াগুলোও বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াগুলো কারণ ব্যাখ্যা প্রদানের দাবিতে সোচ্চার হতে থাকে।

কিন্তু মাসুযোয়ে প্রথম থেকেই বিষয়টি খোলাসা না করে ইনিয়ে বিনিয়ে এবং অস্পষ্ট কারণ দেখিয়ে একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালান। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগে তিনি বলেন, ৪৪ লাখ ইয়েনের অসঙ্গত ব্যবহার তদন্ত কমিটি অবৈধ বলে উল্লেখ করেননি। তারা দেখিয়েছেন ব্যবহৃত খরচগুলো রাজনৈতিক তহবিল থেকে ব্যয় করা সমীচীন হয়নি। এগুলো আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকেই ব্যয় করা যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু সেটা করা হয়নি। এজন্য আমি আমার অন্তর থেকেই আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। সত্যিই আমি অনুতপ্ত। আপনাদের ক্ষমা নিয়ে আমি মেট্রোপলিটন সরকারের হাল ধরার জন্য আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাব। প্রয়োজনে বাকি সময়টা আমি সম্পূর্ণ অবৈতনিক শ্রম দিয়ে জনগণের বিশ্বাস অর্জনে কাজ করে যাব। এমনকি ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে জনগণের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে তাদের বিশ্বাস অর্জনে কাজ করে যাব এবং আমি আশাবাদী যে, আমি তা অর্জনে সক্ষম হবো।

তার এই প্রস্তাবেও কারোর আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হননি ইয়োচি মাসুযোয়ে। ক্রমেই তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আসতে থাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো থেকে। বিরোধী দলগুলো তো বটেই, তার প্রথম রাজনৈতিক দল এবং জাট সরকারের প্রধান ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ১৩ জুন সোমবার সর্বশেষ মাসুযোয়েকে হুঁশিয়ারি করে দিয়ে বলে মাসুযোয়ে যদি তার অবস্থান ১৪ জুন মঙ্গলবারের মধ্যে পরিষ্কার করতে না পারে তাহলে ১৫ জুন বুধবার তার বিরুদ্ধে মেট্রোপলিটন পরিষদে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হবে। ইতোমধ্যে ৭টি দল থেকে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয় মাসুযোয়ের বিরুদ্ধে। দলগুলো থেকে দাবি উঠে যে, মাসুযোয়ে সপরিবারে ঘুরতে গেলে তার হোটেল স্যুটে যে ব্যক্তিটি সাক্ষাৎ করেছিলেন জনসম্মুখে তার নাম প্রকাশ করতে হবে। এবং কী পরিমাণ অর্থ তিনি রাজনৈতিক তহবিল থেকে ব্যক্তিগত খরচ করেছিলেন তাও জানানোর দাবি উঠে সর্বমহল থেকে। আত্মপক্ষ সমর্থনে মাসুযোয়ে বলেন, তার নাম আমি কোনোমতেই জনসম্মুখে প্রকাশ করতে পারি না এবং রাজনৈতিক তহবিলের অর্থ আমার জ্ঞাতসারে খরচ হয়নি। সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারেই খরচ করা হয়েছিল তাই আমি অপারগতা প্রকাশ করছি এবং ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

গভর্নর মাসুযোয়েকে এমনি এক সময় চলে যেতে হচ্ছে যখন নিজেকে তুলে ধরার এক অপার সম্ভাবনাময় দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল। ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ রাগবী, ২০২০ সালে টোকিও অলিম্পিক এবং প্যারা অলিম্পিকের আয়োজক শহর হচ্ছে টোকিও।

টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিষয়ে গ্রাজুয়েশন করা মাসুযোয়ে ইয়োইচি ১৯৯৯ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে টোকিও মেট্রোপলিটন গভর্নর পদে লড়ে ইশিহারা শিনতারোর কাছে হেরে যান। সেই সময় হাতোইয়ামা কুনিও নামের আরেকজন প্রার্থী ছিলেন।

এরপর ২০০১ সালে তিনি আনুষ্ঠানিক এলডিপিতে (ক্ষমতাসীন দল) যোগ দেন এবং ২০০১ সালেই সংসদের উচ্চকক্ষ নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০৭ সালে শিনজো আবে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করলে জনাব মাসুযোয়ে আবে সরকারের হেল্থ, লেবার অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান (আগস্ট ২০০৭-সেপ্টেম্বর ২০০৯) আবে সরকার পদত্যাগ করলে মাসুযোয়ে ২০১০ সালে এলডিপি ত্যাগ করে নিজেই ঘবি জবহধরংংধহ চধৎঃু (ঘজচ) নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪ সালে এলডিপির সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো টোকিও মেট্রোপলিটন সরকারের গভর্নর পদে লড়েন এবং জয়ী হন। ১৯৯৯ সালে যার কাছে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ে হেরে গিয়েছিলেন সেই শিনতারো ইশিহারাকে হারিয়ে গভর্নর হিসেবে জয়লাভ করেন।

তার সময়ে টোকিও মেট্রোপলিটন শহরের অনেক সাফল্য থাকা সত্ত্বেও মাত্র সামান্য কিছু অর্থ রাজনৈতিক তহবিল থেকে ব্যক্তিগত খরচ করার কারণে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হলো মাসুযোয়েকে। অর্থের পরিমাণ মাত্র ৪৪ লাখ ইয়েন বা ৩০ লাখ টাকা প্রায়। যদিও মাসুযোয়ে তা অস্বীকার করে আসছেন এবং যদি হয়েও থাকে তাহলে তার অজান্তেই হয়েছে এবং এইজন্য তিনি অন্তরের অন্তস্থল থেকে দুঃখ প্রকাশ করে অনুকম্পা প্রার্থনা জানান।

তার এই পদত্যাগ আগামী ২১ জুন টোকিও মেট্রোপলিটন অ্যাসেম্বলিতে ওঠানো হবে এবং এই দিনই তা কার্যকর বলে বিবেচিত হবে। এরপর আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে ৫০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন গভর্নর নির্বাচিত করে তার উপর পরবর্তী ভার অর্পণ করতে হবে এবং তিনিই বিশ্বকাপ রাগবী, টোকিও অলিম্পিক এবং প্যারা অলিম্পিক আসরের আয়োজক শহরের দায়িত্ব নিবেন। আর এইজন্য টোকিওবাসীকে তাদের গভর্নর নির্বাচনে গুনতে হবে মাত্র ১ হাজার ৫০০ কোটি ইয়েন বা বাংলাদেশি ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবে ভোটাররা মনে করেন মাসুযোয়ে যদি প্রথম থেকেই বিষয়টি স্বীকার করে নিতেন এবং ধামাচাপা দেয়ার জন্য সময় ক্ষেপণ না করতেন তাহলে আজকে তার পরিস্থিতি এমন হতো না। এইজন্য তিনি নিজেই দায়ী।

আগামী ৩১ জুলাই অথবা ৭ আগস্ট পরবর্তী সম্ভাব্য নির্বাচনের দিন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে নোবুতেরু ইশিহারা (প্রাক্তন গভর্নর শিনতারো ইশিহারার ছেলে) একজন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে রাজনীতিতে হাত পাকিয়েছেন। দেখা যাক টোকিওবাসী কাকে বেছে নেন।

rahmanmoni@gmail.com
সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s