মাওয়া ঘাটে ইলিশ দিয়ে সাহরি

ঘড়িতে তখন রাত একটা। মাওয়া ঘাটে খাবারের হোটেলগুলোর সামনে দাঁড়ানো কর্মচারীরা তারস্বরে ক্রেতাদের ডাকছেন। কোনো কর্মচারী বলছেন, ‘আসেন স্যার, পদ্মার ইলিশ’। কেউবা বলছেন, ‘একদম ফ্রেশ ইলিশ, মজা পাইবেন স্যার’।

শুক্রবার রাতে মাওয়া ঘাটে খাবারের হোটেলগুলোতে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ল। প্রতিবার রোজার মাসে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে বিভিন্ন বয়সী মানুষ ইলিশ দিয়ে সাহরি খেতে মাওয়া ঘাটে আসেন। ঢাকা থেকে তিন বন্ধুসহ এসেছেন হাসিব। তাঁরা সবাই একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। হাসিব বলেন, ‘সবার মুখে মুখে শুনি, মাওয়া ঘাটের ইলিশ নাকি তাজা। সামনে সাজানো থাকে। দেখিয়ে দিলে রান্না করে দেয়। সেই টেস্ট (স্বাদ) নেওয়ার জন্যই আমাদের আসা।’ এত রাতে কীভাবে এলেন, জবাবে হাসিব বললেন, এক বন্ধুর বাবার গাড়ি নিয়ে তাঁরা এখানে এসেছেন।

খাবারের হোটেলভেদে এক টুকরা ইলিশের দাম ৬০-৭০ টাকা। আর আস্ত ইলিশ ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হয়। যেসব হোটেলে কেনাবেচা একটু কম, সেসব হোটেলে ইলিশের দাম একটু কম রাখা হয়। এ ছাড়া ইলিশের ডিম ভাজাও পাওয়া যায় এখানে। ইলিশ না কিনে শুধু ডিম খেতে চাইলে সে ক্ষেত্রে ডিমের জন্য গুনতে হবে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।

পরিবার নিয়ে ঢাকা থেকে নিজের গাড়িতে করে এসেছেন ব্যবসায়ী মো. ইব্রাহিম। ঘাটে গাড়ি থামিয়ে সোজা ঢুকে পড়লেন হোটেলে। দোকানের কর্মচারীর কাছে ইলিশ দেখতে চাইলেন। এরপর দেখেশুনে চারটি ইলিশের দাম ৩ হাজার টাকায় ঠিক করলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে এক কর্মচারী মাছগুলো কাটাকুটি শুরু করলেন। হোটেলের বাইরে রাখা চেয়ারে পরিবার নিয়ে আড্ডা জুড়ে দিলেন ইব্রাহিম।

ঢাকার এত নামীদামি হোটেল রেখে মাওয়া ঘাটে কেন পরিবার নিয়ে খেতে আসা—এমন প্রশ্নে ইব্রাহিম বলেন, ‘সব সময়ই তো ঢাকায় খাওয়া-দাওয়া করি। পরিবারের সবাই বলছিল, এখানে এসে একদিন সাহরি করবে। তাই সবাইকে নিয়ে চলে এলাম।’

মাওয়া ঘাটের হোটেলগুলোতে শুধু ইলিশ ভাজা নয়, কেউ চাইলে মাছের লেজ ও ফুলকার তৈরি ভর্তাও খেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে মাছ ভাজার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে একটু বেশি সময় লাগে। তবে এখানে যাঁরা খেতে আসেন, তাঁদের বেশির ভাগেরই প্রথম পছন্দ ইলিশ। হোটেলগুলো ঘুরে দেখা গেল, অন্যান্য তরকারি তেমন বিক্রি হচ্ছে না।

ইলিশ মাছের ভর্তা খেয়েছেন এমন একজন হলেন মাহমুদা বেগম। তিনি বলেন, ‘এখানে এর আগেও এসেছি। ইলিশ মাছের ভর্তাটা এত বেশি ভালো লাগে যে এখানে এলে ভর্তাটা আমার চাই-ই চাই।’

জানতে চাইলে এক হোটেলের মালিক হোসেন আলী বলেন, পবিত্র রমজান মাসে দিনের বেলা মানুষ ঘাটে কম আসে। শুধু বাস-ট্রাকের চালক ও সহকারীরা খেতে আসেন। রাতের বেলা একটু বেচাবিক্রি হয়। তা-ও খুব বেশি না।

রাতে যে হারে মানুষ খেতে আসেন তারপরও কেন একজন হোটেল মালিকের পোষায় না—এমন প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। তারপর জানা গেল, এখানে বেশির ভাগ হোটেলের দিনের ভাড়া দিনে পরিশোধ করতে হয়। কোনো হোটেলের ভাড়া প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ টাকা, আবার কোনোটার ১ হাজার টাকা। আর রাতে যেসব কর্মচারী কাজ করেন, তাঁদের জনপ্রতি দিতে হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। এ ছাড়া কয়েকটি হোটেলের মালিক জানালেন, তাঁদের অনেকেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছেন।

ফেরার পথে এক পান দোকানদারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁর নাম ওয়াহেদ মিয়া। কথার একপর্যায়ে ওয়াহেদ বললেন, ‘এই ঘাডে কত মানুষ আহে-যায়। কত কিছু দেহি! কত সাহেব-ম্যাম ট্যাকা উড়াই যায়…খালি দেহি আর মনে মনে কই যদি লেখাপড়াটা করতাম হেইলে (তাহলে) আইজ…।’

লিংকন মো. লুৎফরজামান সরকার
প্রথম আলো

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s