পদত্যাগের ইঙ্গিত দিলেন ‘সম্রাট আকিহিতো’

রাহমান মনি: স্বীয় স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে খুব শীঘ্রই সিংহাসন ছেড়ে দেয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন জাপানের রাজা ‘সম্রাট আকিহিতো’। এক ভিডিও ম্যাসেজের মাধ্যমে ৮ আগস্ট সোমবার সম্রাট এ অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। সিংহাসনে আরোহণের ২৮ বছরের মধ্যে এটি ছিল সম্রাট আকিহিতোর দ্বিতীয়বারের মতো কোনো ভিডিও ম্যাসেজ।

টেলিভিশন ভাষণে ৮২ বছর বয়সী সম্রাট আকিহিতো বলেন, বয়স এবং ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে তার পক্ষে দায়িত্ব পালন দিনকে দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় বিকল্প কোনো চিন্তা করার জন্য তিনি প্রস্তুত রয়েছেন। টেলিভিশনে সম্প্রচার করা সম্রাটের দেয়া ১০ মিনিটের এই ভিডিও ভাষণটি আগেই ধারণ করা হয়েছিল।

সম্রাট আকিহিতোর হৃৎপিণ্ডে এর আগে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এছাড়া ৮২ বছর বয়সী এই সম্রাট প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছেন। পিতা সম্রাট হিরোহিতোর মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালের জানুয়ারি মাসে ৭ তারিখ থেকে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন।

টেলিভিশন ভাষণের শুরুতেই সম্রাট বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭০ বছর পূর্তি এবং আগামী ২ বছর পর হেইসেই (সম্রাটের রাজত্বকাল) যুগের ৩০ বছরকে স্বাগত জানাতে হবে। ইতোমধ্যে আমি ৮০ বছর পার করেছি। এই প্রৌঢ় বয়সে এসে আমি আমার শারীরিক সুস্থতা নিয়ে চিন্তিত এবং শঙ্কিত। আমার হৃৎপিণ্ডে এর আগে অস্ত্রোপচার হয়েছিল। গত কয়েক বছর ধরেই আমি সম্রাট হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনে শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে কিছুটা প্রতিবন্ধকতার সামনাসামনি হই যা আমাকে ভাবিয়ে তোলে। সম্রাট হিসেবে প্রচলিত আইন মোতাবেক বেশকিছু রাষ্ট্রীয় কাজে আমাকে অংশ নিতে হয়। ছুটাছুটি করতে হয়, কিন্তু আমি বর্তমানে চিন্তা করতে শুরু করেছি কাজগুলো কতটুকু করতে পারছি এবং এরপর আর কতটা সময় চালিয়ে নেয়া সম্ভব হতে পারে?

ভাষণে সম্রাট সিংহাসন ত্যাগ করার বিষয়ে সরাসরি কোনো কথা না বললেও বেশ জোরালোভাবেই দায়িত্ব থেকে তার সরে দাঁড়াবার ইঙ্গিত দিয়েছেন। আর জীবিতাবস্থায় সম্রাট আকিহিতো যদি সরে দাঁড়ান তাহলে ২০০ বছরের মধ্যে এটিই হবে প্রথম কোনো ঘটনা। এর আগে ১৮১৭ সালে সম্রাট কোকাকু জীবিতাবস্থায় সিংহাসন ছেড়ে দিয়েছিলেন (১৭৭১ সালে জন্ম নেয়া সম্রাট কোকাকু মাত্র ৯ বছর বয়সে ১৭৮০ সালে উত্তরাধিকার সূত্রে সিংহাসনে আরোহণ করেন। ৩৭ বছর রাজত্ব শেষে স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করেন। সিংহাসন ছাড়ার ২৪ বছর পর ৬৯ বছর বয়সে ১৮৪০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।) প্রচলিত আইন অনুযায়ী সম্রাট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত থাকবেন।

সম্রাট আকিহিতো যদি সিংহাসন ছেড়ে দেন তাহলে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন যুবরাজ নারুহিতো। তবে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন জোট চান না বর্তমান প্রচলিত আইনের পরিবর্তন ঘটুক। কেননা পরিবর্তন ঘটলে বর্তমান আইনটি সংশোধনে সংবিধানের সম্মতি নিতে হবে। নতুন করে বিল আনতে হবে।
তবে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সংবিধানের সম্মতি নিতে ক্ষমতাসীন জোটের তেমন কোনো বেগ পেতে হবে না। কারণ, জাপান পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ ক্ষমতাসীন জোট সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তাছাড়া বিরোধী জোটের সমর্থনও পেয়ে যাবেন অনায়াসেই। আর যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলাতেও অনেকেই পরিবর্তনের দিকে মত দিবেন।

সম্রাটের টেলিভিশন ভাষণের পর তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বলেছেন, তারা সম্রাটের দেয়া এই ম্যাসেজকে গুরুত্বসহকারেই নিয়েছেন। আর এ বিষয়ে ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমেই তারা সিদ্ধান্ত নিবেন। আবে বলেন, সম্রাটের জন্য কী করতে পারেন, বেশ সতর্কতার সঙ্গেই তার সরকার তা বিবেচনা করবেন।

২৭০০ বছর যাবৎ বংশপরম্পরায় রাজত্ব করে আসা জাপানের রাজপরিবারের বর্তমান সম্রাট প্রথা ভেঙে প্রথমবারের মতো রাজপরিবারের বাইরে একটি সাধারণ ঘরের মেয়েকে বিয়ে করেন। শোউদা মিচিকো (বর্তমান সম্রাজ্ঞী মিচিকো) রাজপরিবারে এসে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে রাজপরিবার এবং জাপানি জনগণের হৃদয় জয় করে নেন।
সম্রাটের তিন সন্তান, ক্রাউন প্রিন্স নারুহিতো, প্রিন্স আকিশিনোনোমিয়া (প্রিন্স ফুমিহিতো বা প্রিন্স আকিশিনো) এবং প্রিন্সেস সায়াকো (পরে কুরুদা সায়াকো) ও রাজপরিবারের বাহিরে বিয়ে করেন।

জাপানি রাজপরিবারের কোনো পারিবারিক নাম নেই। নিজ নিজ নামেই তারা সকলে পরিচিতি লাভ করে থাকেন। এই জন্য তাদের পারিবারিক নিবন্ধন বা জাপানিজ ভাষায় কোসেকি (যা জাপানিদের জন্য বাধ্যতামূলক) নেই। এমনকি জাপানি সম্রাটের কোনো পাসপোর্টও নেই (সম্মানজনক)। তবে নিজ দেশীয় আইনের প্রতি সম্মান জানিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন বা গ্রহণ করতে হয় দেশের প্রচলিত আইন মেনেই। সম্রাট আকিহিতো মাত্র কিছুদিন আগেও ৮২ বছর বয়সে ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করেন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েই।

সম্রাট আকিহিতো তার ম্যাসেজে বারবারই তার বয়স এবং শারীরিক অসুস্থতার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, এই বয়সে এবং এই শরীর নিয়ে স্বাভাবিক কর্ম করা সহজ নয়। সম্রাট হলো জাপানিজ রাষ্ট্রের প্রতীক। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের প্রতীক। রাজ্যজুড়েই বিচরণ থাকা, তাদের কাছে যাওয়া উচিত। যুবরাজ থাকাকালীন আমি যেটা করতে পেরেছি। এই বয়সে সেটা করা আর সম্ভব নয়। কিন্তু বয়সজনিত কারণে কর্মপরিধি বা দায়িত্ব কাটছাঁট করাও সম্ভব নয় এবং সেটা উচিতও নয়। তাই আমি মনে করি আমার অবসর নেয়ার সময় হয়ে এসেছে।

জাপানে রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজার কোনো ভূমিকা নেই। তবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে রাজার সম্মতি থাকতে হয়। এমনকি সরকার পরিচালনায়ও রাজার সম্মতি নিতে হয়। তিনি ভোট প্রদান থেকে বিরত থাকলেও দুর্যোগপূর্ণ যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন এবং সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা তা মানতে বাধ্য।

৮ আগস্ট সোমবার বেলা ৩টার সময় ১০ মিনিটব্যাপী টেলিভিশন ভাষণের পর তাৎক্ষণিক এক জরিপের ৯০.৯% অংশগ্রহণকারী রাজার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। ৪% মনে করেন আমৃত্যু তার সম্মানজনক এই পদে থাকা উচিত এবং ৫.১% মন্তব্য থেকে বিরত থাকেন।

সম্রাট আকিহিতো ১৯৩৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালের ১০ এপ্রিল ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২৩ ডিসেম্বর জাপানে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। এই দিন সম্রাটের বাসভবন উন্মুক্ত থাকে এবং সম্রাট জনসম্মুখে হাজির হন সপরিবারে।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s