বিক্রমপুরের বেদেদের আদি পেশায় দুর্গতি

মো. মাসুদ খান: পেশায় পরিবর্তন আসছে। আধুনিকতার প্রভাব পড়ছে পোশাক-আশাকেও। নৌকায় বাঁধা জীবন তাদের ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছে। সাপখেলা, বিষ ঝাড়া, দাঁতের পোকা ফেলা, রসবাতের তেল বেচা, শিঙা লাগানো, তাবিজ-কবজ আর লোকজ ওষুধ বিক্রি—এই জীবন ছেড়ে তারা এখন আধুনিক জীবনের আঙিনায়ও পা ফেলেছে। ডাঙায় বসবাসের শুরু থেকেই তাদের এই উন্নতি। চিকিত্সক, ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যাংকারও এখন পাওয়া যায় বেদে সম্প্রদায় থেকে আসা। তবু বড় একটি অংশ এখনো আদি পেশায় আছে। তবে তারা আগের মতো ভালো নেই। জীবনের সঙ্গে নৌকায় বাঁধা পড়েছে তাদের ভাগ্যও।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, কথিত আছে ১৭ শতকে শরণার্থী আরাকান রাজ বল্লাল রাজার সঙ্গে আসা বেদে সম্প্রদায় প্রথম বাংলার বিক্রমপুরে এসে বসবাস শুরু করে। পরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসাম পর্যন্ত। তবে বিক্রমপুরকে তারা ভুলে যায়নি। আশির দশকেও বেদেদের ভাসমান নৌকায় বসবাসটা বেশি ছিল মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরে। সারা বছর তারা নৌকায় করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পেশাগত কাজে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকত। কিন্তু বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস হলেই তারা ফিরতে শুরু করত বিক্রমপুরে। বিশেষ করে বিক্রমপুরের লৌহজংয়ের কুমারভোগ ইউনিয়নের খড়িয়া ও হলদিয়া ইউনিয়নের গোয়ালী মান্দ্রা বেদে পল্লীতে। তখন সংখ্যাধিক্যের কারণে এ দুই পল্লীতে জায়গা হতো না। সেখানকার খালগুলোও ভরে যেত বেদে নৌকায়। একপর্যায়ে তারা ছুটে যায় হলদিয়া বাজারের বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে।

এককালে বেদে পল্লীতে ধুম পড়ে যেত বাদ্য-বাজনার। বেদে মেয়েরা লাল লিপস্টিক, হলুদ শাড়ি, কোমরে রুপার বিছা, নাকে নোলক আর পায়ে রুপার মল পরে ছেলেদের সঙ্গে নেচে-গেয়ে আনন্দ উল্লাস করে বেড়াত বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে। বাংলা ছয়াছবির নায়ক-নায়িকার নামে শিশুদের সাবানা, ববিতা, রোজিনা, রাজ্জাক, ওয়াসিম নাম রাখার চলও বলে দেয় তারা কতটা আমুদে সম্প্রদায়।

যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাপখেলা আর ভেলকিবাজি থেকে মানুষ যেভাবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তা দেখে বেদেরাও বুঝতে পারে পিতৃপুরুষের পেশায় কেবল বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। সেই থেকে তাদের নৌকা ছেড়ে ডাঙায় ওঠা শুরু হয়। গড়ে ওঠে বেদেপল্লী। সেই পল্লীর কাঁচা ঘরগুলো এখন টিন-কাঠে, দালানকোটায় রূপ নিচ্ছে। অধুনিকতার ছোঁয়া যেন বেদেপল্লীতেও ছড়িয়ে পড়ে। বেদে মেয়েরা চিরাচরিত তাদের পোশাক ছেড়ে এখন সাধারণ মেয়েদের মতোই সালোয়ার-কামিজ পরে। পোশাক দেখে এখন তাদের আলাদা করা কঠিন। পরিবর্তনের বড় অস্ত্র শিক্ষাও তাদের আদিম জীবনব্যবস্থাকে ভাঙতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে বেদেপল্লী থেকে চিকিত্সক, প্রকৌশলী ও ব্যাংকার তৈরি হয়েছে। অন্য ভালো প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করছে।

নাগরিক অধিকারও প্রয়োগ করছে বেদেরা। লৌহজংয়ের কুমারভোগ ও হলদিয়া ইউনিয়নে বেদে সম্প্রদায়ের দুজন মেম্বার নির্বাচিত হয়ে এখন জনসেবা করছেন। কুমারভোগ ইউনিয়নের গোয়ালী মান্দ্রায় দুই হাজার ১০০ এবং হলদিয়া ইউনিয়নের খড়িয়ায় এক হাজার ৭০০ ভোটার রয়েছে বেদেদের। পেশাগত কারণে তারা যেখানেই থাকুক, নির্বাচনের সময় হলে দলবেঁধে এলাকায় চলে আসে। ফলে এ দুটি ইউনিয়নে বেদেদের ভোট বড় নির্ধারক হয়ে উঠেছে। শুধু এ দুটিই নয়, বেদেদের আবাসস্থল রয়েছে লৌহজংয়ের কনকসারেও। মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলার ধলেশ্বরী, সিরাজদিখানের ইছামতি ও টঙ্গীবাড়িতেও এদের বসবাস রয়েছে। শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘরের খালে বেদেদের নৌকায় বসবাস থাকলেও এ বছর খালটি অবৈধ দখলদাররা ভরে ফেলায় বেদেরা এখন শ্রীনগর ব্রিজের কাছে নৌকায় বসবাস করছে।

আধুনিক জীবন গ্রহণ করে বেদেদের অনেকে ভালো থাকলেও বিক্রমপুরের আদি বেদে পরিবারগুলো এখন অতি কষ্টে জীবন যাপন করছে। ঢাকার পাশের জেলা মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরে অতি দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন মার্কেট, আধুনিক দোকানপাট। তাই গাঁয়ের পথে ঝুড়ি মাথায় কিংবা কাঁধে লম্বা ব্যাগ ঝোলানো বেদে পরিবারের সদস্যদের আগের মতো চুড়ি-ফিতা বিক্রি করতে দেখা যায় না। ফলে নিদারুণ অর্থকষ্টে থেকে তাদের কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছে অপরাধপ্রবণতায়। এর মধ্যে মাদক ব্যবসা অন্যতম।

সিরাজদিখান উপজেলার সদর থেকে আট কিলোমিটার আগে মালখানগর ইউনিয়নের তালতালা বাজারের পেছনে ইছামতি নদীতে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় বর্তমানে অতি কষ্টে আছে ৬০টি বেদে পরিবার। বংশপরম্পরায় এ নদীতে বসবাস করে আসছে ওই বেদে পরিবারগুলো। অভাবের তাড়নায় এই বেদেরা এখন আদি পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৬৩৮ সালে মুন্সীগঞ্জ জেলার এই সিরাজদিখানেই প্রথম বেদে আসে শরণার্থী আরাকান রাজ বল্লাল রাজার সঙ্গে।

এ ছাড়া সিরাজদিখান উপজেলার শেখেরনগর ইউনিয়নের ঘনশামপুর গ্রামের ইছামতি নদীতে ৪০টি পরিবার বসবাস করছে। আর নদীর পাশে গ্রামের ভূখণ্ডে ঘর তুলে বসবাস করছে আরো ২৫টি পরিবার। স্থলভাগে বসবাসকারী ২৫টি পরিবার এখন আদি পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদসহ তাদের ছেলেমেয়েদের বিদেশ পাঠিয়ে ভালো উপর্জন করছে। গ্রামের অন্যান্য পরিবারের সদস্যদের মতো ছেলেমেয়েদের উন্নত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছে। তবে ইছামতি নদীতে নৌকায় বসবাসকারী ৪০টি বেদে পরিবার এখনো মাছ ধরে, মাটির তৈরি খেলনা বিক্রি, ঝোলা হাতে গ্রামগঞ্জে ঘুরে বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি, তাবিজ-শিঙা লাগিয়ে আদি পেশায় অর্থ উপার্জন করে অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছে। আদি পেশায় জীবন না চলায় তাদের কাউকে কাউকে পথচারীদের সাপ দেখিয়ে টাকা আদায় করতে দেখা যায়। এতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে পথচারীরা ১০-২০ টাকা দিয়ে নিজেদের আত্মরক্ষা করছে।

সিরাজদিখান বাজারে ঝোলা কাঁধে বের হওয়া বেদে পরিবারের সদস্য হোসনে আরা বেগম (৫৫) বলেন, ‘আমাদের কাছ থেইক্কা মানুষ আগে চুড়ি-ফিতা কিনলেও এখন বাড়ির বউ-ঝিরা হাট-বাজারে গিয়া কিনে। এ ছাড়া যেহানে সেহানে ডাক্তার থাকায় আমাগো কাছ থেকে শিঙা ও তাবিজ কেউ নেয় না। তাই গ্রামেগঞ্জে ঘুরে কোনো কাজ করতে না পাইরা বাঁচার জন্য মানুষের কাছে হাত পাততাছি।’

মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গীবাড়ি) আসনের এমপি অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেছেন, ‘আমার এলাকায় বেদেদের প্রায় পাঁচ হাজার ভোটার রয়েছে। বর্তমান সরকার তাদের ভোটার হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের মতো তারাও ভিজিএফ, বয়স্কভাতাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে।’

কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s