ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বোচ্চ মঠ শ্যামসিদ্ধি

গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল: সে এক চমৎকার ঘটনা। একটি স্বপ্নিল আদেশ। সন্তানের প্রতি পিতার নির্দেশ। হ্যা, ঘটনাটি ঘটেছিল ১৭৫৮ সালের কোন এক রাতে। অর্থাৎ ২৪৭ বছর আগে।

গ্রামের নাম শ্যামসিদ্ধি। মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার একটি গ্রাম। এই গ্রামে বাস করতো বিক্রমপুরের ধর্নাঢ্য ব্যক্তি সম্ভুনাথ মজুমদার। এক রাতে শ্রী সম্ভুনাথ ঘুমিয়েছিলেন। স্বপ্নে দেখলেন তার স্বর্গীয় পিতা তার চিতার উপরে একটি মঠ নির্মাণের নির্দেশ দিচ্ছেন। সেই মতো কাজ শুরু। কথাগুলোর সত্যতা কতটা তা বলা মুশকিল। তবে শ্রী সম্ভুনাথ বাবুর তৈরী মঠটি যে ভারতীয় উপমাহাদেশর একটি শ্রেষ্ঠ ইতিহাস হয়ে থাকবে সে কথা অন্ততঃ তার জানা ছিল না।

বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানার শ্যামসিদ্ধি গ্রামে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বোচ্চ মঠ অবস্থিত। বিশাল এই মঠটির উচ্চতা ২৪১ ফুট। মঠের আয়তন দৈর্ঘ্য ২১ ফুট ও প্রস্থে ২১ ফুট। বৃহত্তর এই মঠের গঠন খুবই সুন্দর। অষ্টভুজাকৃতির মঠটি না দেখলে এর সৌন্দর্যের কথা বলে শেষ করা যাবে না। মঠটির ভেতরের সুরং-এর উচ্চতা প্রায় ৮০ ফুট। মঠের ভিতরে ঢুকতে দরজার উচ্চতা ২৭ ফুটেরও বেশি।

প্রাচীনকালে তৈরী ইট সুরকীর এই মঠের ভিত খুবই মজবুত। ঐতিহাসিকদের মতে শ্যামসিদ্ধির এই মঠ উপমহাদেশের সর্বোচ্চ স্মৃতিস্তম্ভ। প্রসঙ্গ উলেখ্য যে, ভারতের কুতুব মিনারের উচ্চতা ২৩৬ ফুট। মঠের ভিতরে ও বাইরে কারুকাজে পরিপূর্ণ ছিল। খুব সুন্দর সুন্দর কাঠের নকশী করা ছিল এর দরজায় ও জানালায়। মঠের মূল অংশের চেয়ে বাড়তি বরান্দা আছে। বারান্দার কাঠের দরজা ও মঠের মূল ফলকের কাঠের গেট অনেক আগেই চুরি হয়ে গেছে। মঠের গায়ে ছিল মূল্যবান পাথর ও পিতলের কলসী যার কোন অস্তিত্ব এখন আর দেখা যায় না। মঠটির ভিতরে কষ্টি পাথরের শিব লিঙ্গটি স্থাপিত ছিল, যার উচ্চতা ৩ ফুট। ১৯৯৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে বিশব লিঙ্গটি চুরি হয়ে যায়। ২ আক্টোবর ১৯৯৫ সালে শ্রীনগর থানায় মামলা হলেও চোর ধরা পরেনি এখনো। মঠটি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য তীর্থস্থান।

গ্রন্থে দিলির লেখক “বারড়ী” শ্যামসিদ্ধির এ মঠের বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। দক্ষিণ দিকের দরজার ঠিক উপরে মার্বেল পাথরের ১র্র্৮ -২র্র্৪ বর্গাকৃতির নামফলক আছে। সেখানে লেখা রয়েছে-“শম্ভুনাথের বাসার্থ মঠশকাব্দ ১৭৫৮, সন ১২৪৩ শম্ভুনাথ মজুমদার মহাশয় অত্র মঠ স্থাপন করেন।

তস্য পৌত্র শ্রীযুত কুমুদিনীকান্ত মজুমদার ওয়ারিশ সূত্রে মালিক হয়ে পূজার কার্যাদি পরিচালনা করিতেছেন। শ্রী উপন্দ্রেনাথ মজুমদার ওরফে কালু সন ১৩৩৬, ১৯ আষাঢ়।” তথ্য সমৃদ্ধ এই পাথরটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। যে কোন সময় এই মূল্যবান পাথরটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মঠটির চূড়ার মধ্যে অসংখ্য ছিদ্র রয়েছে। এই ছিদ্রগুলোতে বর্তমানে অসংখ্য পাখির বাস।

হিন্দু সম্প্রদায় বছরে বিশেষ দিনে মঠে শিব পূজা করে। শিব রাত্রিতে পূজা উপলক্ষ্যে মঠের চারপাশ ধোয়া-মোছা করা হয়। নানা রঙ্গের মোমবাতি দিয়ে সাজানো হয় মঠের আঙ্গিনা। দুধ, কলা, বাঙ্গিসহ নানা রকমের পিঠা ও ফলমূলের সøুপ হয়ে যায় মঠের ভিতর ও দরজার সম্মুখ। পূজা উপলক্ষ্যে শ্যামসিদ্ধি হয়ে উঠে মুন্সিগঞ্জের মিলন মেলা। হিন্দু-মুসলীম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সবাই মিলিত হয়।

মুন্সিগঞ্জের ৬টি থানার নামকরা ব্যক্তিবর্গ দল-মত, ধর্ম, বর্ণ ভুলে গিয়ে উপস্থিত হন। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের কুমারী মেয়েরা ভীর করে এই মঠে, কুমারী মেয়েরা সারিবদ্ধ ভাবে মঠের চারদিকে সাতবার করে ঘুরে আসে এবং সর্বশেষ শিব মূর্তিতে পূজা দেয়।

মুন্সিগঞ্জ নিউজ

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s