ঘরের হাট – বাণিজ্য বসতি

ইচ্ছা হলো একদিনেই ভালো মানের একটা দোতলা বানিয়ে থাকবেন। তাহলে আপনাকে মুন্সীগঞ্জে ছুটতে হবে। কারণ মুন্সীগঞ্জে এটি সম্ভব। রেডিমেড আস্ত ঘর কিনতে পাওয়া যায় সেখানে। জেলার অনেক জায়গায় জমে উঠেছে ঘরের হাট। সেই হাটে গিয়েছিলেন মাসুদ খান

একসঙ্গে কয়েকটি ঘর। দেখতে বেশ, ঝকঝকে নতুন। কিন্তু এসব ঘরে এখনো কেউ থাকে না। মুন্সীগঞ্জে চলতে চলতে এ রকম অনেক ঘর দেখা যায়। লৌহজংয়ের কলাবাগান কাঠপট্টি, টঙ্গীবাড়ির বেতকা, সিরাজদিখানের মালখানগর, কুচিয়ামোড়া বাজার, সদরের হাতিমারা, বজ্রযোগিনীসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে কাঠের ঘরের হাট।

কলাবাগান কাঠপট্টিতে ঘর বানাচ্ছিলেন মিস্ত্রি কামরুজ্জামান। তৈরি করছিলেন ২৩ বন্দরের একটি দেড়তলা ঘর। ২৩-বন্দর মানে ঘরটি লম্বায় ২৩ ফুট। টিন ও কাঠের দৃষ্টিনন্দন এই ঘরে রয়েছে একটি বারান্দা। প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ। তিনি জানান, এ রকম একটি ঘর তৈরি করতে চারজন মিস্ত্রির ১৫ থেকে ২০ দিন লাগে। মিস্ত্রি রানা শেখ জানালেন, ‘নদীভাঙন-কবলিত অঞ্চল বলে এখানে কাঠের ঘরের কদর বেশি। ভাঙনের শিকার হলে সহজেই সরিয়ে নেওয়া যায়। তা ছাড়া বিপদ-আপদে ঘর বিক্রি করে নগদ অর্থও পাওয়া যায়। আমরাও ক্রেতাদের পছন্দের কথা ভেবে নানা কারুকার্য দিয়ে ঘর তৈরি করে থাকি।’

লৌহজংয়ের ঘোড়দৌড়ের মিস্ত্রি বাবুল এ কাজের সঙ্গে আছেন এক যুগ। উন্নতমানের কাঠ দিয়ে ঘর তৈরি করছেন। নাইজেরিয়া লোহাকাঠ দিয়ে ঘর বানাচ্ছেন। তিনি জানালেন, ‘একটি ২৩ বন্দর (২৩/১৩ ফুট) ঘর ৩ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা, ২১ বন্দর (২১/১১ ফুট) ঘর আড়াই থেকে ৩ লাখ, আর ১৭ বন্দরের (১৭/৯ ফুট) ঘর ১ লাখ ৭০-৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে।’ আগে শুধু এক দোতলা ঘর তৈরি করে বিক্রি করা হতো, এখন তিনতলা ঘরও তৈরি করা হয়। ক্রেতারা ঘর কেনার পর কয়েকটি অংশ আলাদা করে নিয়ে যায়। বাড়িতে ভিটে তৈরি করে অংশগুলো জোড়া লাগালেই হয়ে যায় বাসের উপযোগী।

মুন্সীগঞ্জে এই ব্যবসা শুরু হয় গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। শুরু করেছিল কাঠ ব্যবসায়ীরা। তারা গাছ কিনে কাঠ তৈরি করে বিক্রি করে। কিন্তু একটি গাছের বড় ফালি থেকে মূল কাঠ বের করার পরও অনেক টুকরাটাকরা থেকে যায়। নিন্মমানের এই কাঠগুলো ক্রেতারা কিনতে চায় না। তাই ব্যবসায়ীরা ওসব কাঠ মিস্ত্রি দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করতে শুরু করে টিন-কাঠের ঘর। কাঠের মধ্যে এমনভাবে জোড়াতালি দেওয়া হতো যে সাধারণভাবে চোখে ধরা পড়ত না। কম দামে এসব ঘর বিক্রি করে ব্যবসায়ীরা মুনাফা করত। নিন্ম ও মধ্যবিত্তের লোকজন অল্প দামে এসব ঘর কিনে তখন প্রতারিতও হয়েছে। তার পরও বাহারি ডিজাইন আর ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকায় লোকজন এসব ঘর কিনতে শুরু করে। দিন বদলেছে। ক্রেতারাও জোড়াতালির ঘর কিনতে চায় না। ব্যবসা পরিচিতি পাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও এখন ভালো কাঠ দিয়ে ঘর বানিয়ে বিক্রি করছে।

যদিও এখন মানুষের দৃষ্টি পাকা ভবনের দিকে। কারণ ভালো কাঠ দিয়ে একটি দোতলা ঘর বানাতে যা ব্যয় হয়, ওই টাকায় আনায়াসেই একটি পাকা ভবন করা যায়। কিন্তু এর পরও এই অঞ্চলের অধিকাংশ লোকই টিন-কাঠের ঘরের মায়া ছাড়তে পারেননি। তারা ঘরের ভিট পাকা করে বানিয়ে চলছেন কাঠের ঘর।

কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s