সাফিয়ার আত্মনির্ভরশীল হওয়ার গল্প

মোজাম্মেল হোসেন সজলঃ মুন্সীগঞ্জের সফল নারী সাফিয়া খাতুন। ২০ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর নিঃস্ব ছিলেন তিনি। স্বামী শামসুল হক ছিলেন মুন্সীগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার। স্বামীর মৃত্যুর সময় একটি সেলাই মেশিন ছিল তার একমাত্র আয়ের উৎস। দীর্ঘ সংগ্রাম করে এক মেয়ে ও তিন ছেলেকে মানুষ করেছেন। তার সবার ছোট ছেলে এখন চলচ্চিত্রের নায়ক। চলচ্চিত্রে নাম তার আশিক চৌধুরী। বড় মেয়ে শাহনাজ আক্তার শাবানা তার স্বামীর সঙ্গে সৌদি আরব থাকেন। ছেলে শহীদুল হক বাবুল মুন্সীগঞ্জ আদালতের আইনজীবীর সহকারী ও অপর ছেলে সাইফুল ইসলাম অপু সৌদি আরব প্রবাসী। জীবনযুদ্ধে সংগ্রামী নারী সাফিয়া খাতুন এখন পুরোপুরি স্বাবলম্বী। তাকে এখন আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় না।

এক সময় ৫০ টাকাও তার কাছে ছিল না। এখন লাখ টাকার মালিক। মুন্সীগঞ্জ শহরের খালইস্ট গ্রামের নিজ বাড়িতে গড়ে তুলেছেন দুস্থ বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য হস্ত ও কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণশালা। দুস্থ মহিলা কল্যাণ সমিতি নামের সংগঠনের মাধ্যমে সাফিয়া খাতুন তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। এ কাজ শিখে অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। সাফিয়া খাতুনের দুস্থ মহিলা কল্যাণ সমিতিতে ৪০ জন নারী প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। বিনিময়ে তিনি কোনো টাকা নেন না। এখানে সাপ্তাহিক, পনেরো দিন ও মাসিক কোর্সে হস্ত ও কুটির শিল্পের কাজ শেখানো হয় দুস্থ নারীদের। ৭দিনে পুতি, বেতি, ১৫ দিনে ব্লক বাটিক, এপ্লিক ও ৩০ দিনে বাঁশের মোড়া ও সেলাই শেখানো হয়।

২০০৯ সালে তিনি শহরের খালইস্ট নিজ বাড়িতে দুস্থ মহিলা কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে এ প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। সাফিয়া খাতুন মুন্সীগঞ্জ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের একজন কনটেইনার হিসেবে কাজ করছেন। গ্রামে গ্রামে গিয়েও নারীদের হাতে কলমে কাজ শিখাচ্ছেন। নারীদের প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর যুব উন্নয়নের মাধ্যমে সার্টিফিকেট প্রদান করছেন। এরপর সার্টিফিকেটধারী নারীরা যুব উন্নয়ন থেকে ৫০ হাজার টাকা করে ঋণ নিতে পাচ্ছেন বলে সাফিয়া খাতুন জানালেন। তিনি জানান, ঋণ নিতে বাধা যুব উন্নয়নের শর্ত। শর্ত থাকায় অনেক নারী ঋণ সুবিধা নিতে পারছেন না। ঋণ নিতে হলে বাড়ির দলিল ও কোনো চাকরিজীবীর গ্রান্ডট্যান্ট দিতে হয়। কিন্তু এসব অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ঋণের বেলায় শর্ত সহজ করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

সাফিয়া খাতুন জানালেন, এখন নারীরা আর ঘরে বসে নেই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেয়া হলে কোনো নারী আর দুস্থ থাকবে না। দীর্ঘ সংগ্রাম করে তিনি যেমন স্বাবলম্বী হয়েছেন তেমনি তার দুস্থ কল্যাণ সমিতি থেকে এ পর্যন্ত ৩০০ নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন বলে সাফিয়া খাতুন জানান। সাফিয়া খাতুন মুন্সীগঞ্জ দুস্থ মহিলা কল্যাণ সমিতির সভানেত্রী। সাফিয়া খাতুন জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর আমার কিছুই ছিল না। ধৈর্য ও সংগ্রাম করে ৪ ছেলেমেয়েকে মানুষ করার চেষ্টা করেছি। সে চেষ্টায় আমি সফল হয়েছি। আজ আমার ঘরে ২-৩ লাখ টাকার হস্ত ও কুটির শিল্পের বিভিন্ন রকমের মালামাল রয়েছে। আমার এখানে বেত দিয়ে ব্যাগ, পুঁতি দিয়ে ব্যাগ, শোপিস দিয়ে আম, মাল্টা, আপেলসহ বিভিন্ন রকমের ফল, বাঁশ দিয়ে মোড়া তৈরি, পাটের টেবিল, ম্যাথ, পাপোশ, ব্লক বাটিকের বেড কভার, থ্রিপিস ও শাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। তিনি জানালেন, তার এসব পণ্য বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের এসএমই ও সমবায় মেলায় স্টল নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।

এছাড়া, মুন্সীগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে নারী দিবস ও পহেলা বৈশাখের বৈশাখী মেলায় স্টল নিয়ে বিক্রি করা হয়। আবার অনেকে বাড়ি এসে কিনে নিয়ে যান। জীবনযুদ্ধে সংগ্রামী নারী সাফিয়া খাতুন ২০১৩ সালে বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে জয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তিনি ২০১৪ সালে সফল আত্মকর্মী হিসেবে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

মানব জমিন

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s