জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন এবং কিছু কথা

moni610রাহমান মনি: ‘সাপ্তাহিক’-এ কাজ করার সুবাদে এবং সম্পাদক গোলাম মোর্তোজার কল্যাণে জাপান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাংবাদিক নিবন্ধন পাওয়ার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক স্বীয় কার্যালয়ে আয়োজিত প্রায় প্রতিটি প্রেস কনফারেন্সে যোগ দেয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখার একটা ভাবনা কিছুদিন ধরে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। লিখি লিখি করে লেখা আর হয়ে উঠছিল না। লিখব লিখব ভাব যখন করছি, তখনই একটা তাগিদ এনে দিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অতি সম্প্রতি কয়েকটি প্রেস কনফারেন্স দেখার (ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে) অভিজ্ঞতা।

গত আগস্ট ২০১৬ তারিখে প্রেস কনফারেন্সটি, যেটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সাংবাদিক সমাজের প্রতি একটা বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে তা দেখে একজন খুদে সংবাদ কর্মী হিসেবে অগ্রজদের দেখে, তাদের এই ভূমিকা একটু লজ্জা পেয়েছি বৈকি।

২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি যখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন লাভ করি প্রধানমন্ত্রী তারো আসো (ঞধৎড় অংড়)’র নেতৃত্বে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) অব জাপান রাষ্ট্র ক্ষমতায়। এরপর দীর্ঘ ৫৪ বছর (ডিসেম্বর ১৯৫৬-সেপ্টেম্বর ২০০৯) নোদা ইয়োশিহিকো (সেপ্টেম্বর ২০১১-ডিসেম্বর ২০১২) এবং তিন বছর পর আবে শিনজোর নেতৃত্বে (২০১২ ডিসেম্বর থেকে আজ অবধি) পুনরায় জাপানের রাষ্ট্রক্ষমতায়।

এই আট বছরে ভিন্ন ভিন্ন জোট সরকারসহ মোট ৫ জন প্রধানমন্ত্রীর অফিসসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বেশকিছু সংবাদ সম্মেলনসহ তৃতীয় দেশসমূহের রাষ্ট্রপ্রধানদের যৌথ সংবাদ সম্মেলনেও যোগদানের সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এখানে প্রধানমন্ত্রী বদল হলেও প্রধানমন্ত্রীর অফিসের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বহাল তবিয়তে দেখেছি।
ক্ষমতার পালাবাদলে উচ্চপর্যায়ের নিয়োগে বেশকিছু পরিবর্তন হলেও সরকারি কর্মকর্তাদের পদে তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটে না এবং তাদের কাজেও বিঘœ ঘটানো হয় না। স্বাভাবিকভাবেই তাদের পদোন্নতি বা রদবদল হয়ে থাকে। কারণ, এখানে সরকারি কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর জন্য নয়, প্রধানমন্ত্রীর অফিসের জন্য প্রজাতন্ত্রের কাজে নিয়োজিত। জনগণের কল্যাণে তারা কাজ করেন।

জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা একটি ই-মেইল বা ম্যাসেজ সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো হয় এবং নিবন্ধিত সাংবাদিকরাই কেবল অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়ে থাকেন। অংশগ্রহণকারীদের ইচ্ছা প্রকাশ করে নির্দিষ্ট তথ্যসহ বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে আবেদন করতে হয়। তথ্যগুলোর মধ্যে নাম, কোম্পানি (মিডিয়া)’র নাম, পদবি, নিবন্ধন নাম্বার, মেয়াদ, যোগাযোগ নাম্বার (জরুরি প্রয়োজনে) জানান দিতে হয়। অনেক সময় স্বল্প সময়ের নোটিশে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হলেও তথ্য সরবরাহের ব্যাপারে কোনো পরিবর্তন হয় না।

সংবাদ সম্মেলনের নির্দিষ্ট সময়ের মাত্র ২০ মিনিট আগে সম্মেলন কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি মেলে এবং ১৫ মিনিটের জন্য তা উন্মুক্ত থাকে। অর্থাৎ সংবাদ সম্মেলন শুরু হওয়ার ৫ মিনিট আগেই নিজ নিজ আসন কনফার্ম করতে হয়। আসন কনফার্ম করার পর আর রদবদলের সুযোগ থাকে না। এরই মধ্যে ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো তাদের ধারণ করার সুবিধার্থে সাউন্ড সিস্টেম, ক্যামেরা সেটিং, পর্যাপ্ত আলোসহ যাবতীয় কাজগুলো পরখ করে নেয়। যদিও প্রচারের সুবিধার্থে সম্মেলন কক্ষের যাবতীয় সিস্টেম ও সর্বাধুনিক টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়। তবুও নিজেদের সুবিধার্থে দূরত্ব এবং এঙ্গেল অনুযায়ী চেকগুলো করে সেটিং করে নেয়া। চ্যানেলগুলোর ভিন্নতা থাকলেও চেক করার সময় সবাই প্রায় এক ও অভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে থাকে। আমরা যেমন চেক করার সময় ‘হ্যালো মাইক্রোফোন টেস্টিং’, ‘ওয়ান, টু, থ্রি’ কিংবা ‘চেক চেক’ শব্দগুলো ব্যবহার করে থাকি। জাপানি চ্যানেলগুলো এই ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী দাঁড়ানোর নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে একটি কাগজ বুকের সামনে ধরে কেবল ‘পা, পি, পু, পে, পো’ বলে রিপিট করতে থাকে। এভাবে যে কেউ তা পরখ করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ছাড়া যে কেউ ইচ্ছা করলে প্রধানমন্ত্রীর স্থানে দাঁড়িয়ে সেলফিও তুলতে পারেন। যদিও কেউ তা করেন না। তবে এই ক্ষেত্রে তাতে বাধা নেই।

সবার আসন নির্দিষ্ট করার পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এবং উপসচিব প্রথমে জাপানি ভাষায় এবং পরে ইংরেজিতে সম্মেলন কক্ষ অভ্যন্তরীণ নিয়মগুলো এবং মোট কতটা সময় সংবাদ সম্মেলন চলবে এবং এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য কতক্ষণ থাকবে, প্রশ্নোত্তর পর্ব কতক্ষণ হবে তার বর্ণনা প্রদান করেন।

নিয়মগুলোর মধ্যে সবার মোবাইল ফোন সাইলেন্ট মুডে রাখার জন্য, সম্মেলন চলাকালীন সরাসরি সম্প্রচার থেকে বিরত থাকা, সঞ্চালকের অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন করার সময় নিজের নাম, মিডিয়ার নাম, বিদেশি হলে দেশের নাম ও পদবি উল্লেখ করে সরাসরি প্রশ্ন করা, সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে প্রশ্ন করা, সংবাদ সম্মেলন চলাকালীন নোটবুক কিংবা ক্যামেরার সাটার অফ অন না করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলন শুরু হবার ঠিক ১ মিনিট আগে একজন সিনিয়র মন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এবং সচিব, সরকারের মুখপাত্র এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব হলে প্রবেশ করে নিজ নিজ আসনের সামনে দণ্ডায়মান অবস্থায় অবস্থান নেন।

এরপর প্রধানমন্ত্রীর অফিস সেক্রেটারি তার বক্তব্যটি টেবিলের উপর রেখে যাওয়ার পর পরই প্রধানমন্ত্রী সম্মেলন কক্ষে প্রবেশ করে জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান জানিয়ে (জাপানি বোঁ বা কুর্নিশ) টেবিলের পাশে ফটোসাংবাদিকদের জন্য ২০ সেকেন্ড সময় দেন। ফটোসাংবাদিকরা এ সময় নিজেদের মতো করে ছবি তুলে নেন। প্রধানমন্ত্রী হলে প্রবেশ বা প্রস্থানকালীন কোনো সাংবাদিকই তাকে অভিবাদন বা দাঁড়িয়ে সম্মান জানান না। কেবল উপরে উল্লিখিত ৫ জন জাপানি রীতিতে মাথা নিচু করে সম্মান জানান।

সঞ্চালকের অনুমতি পাবার পর প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য পেশ করেন। তার বক্তব্য শেষ হলে সঞ্চালক ধন্যবাদ জানিয়ে সাংবাদিকদের জন্য ফ্লোর দেন। এই সময় প্রশ্ন করতে ইচ্ছুকদের হাত উঁচু করে সঞ্চালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হয়। তার অনুমতি সাপেক্ষে প্রশ্নকারী নিজের পরিচয় দিয়ে কোনো প্রকার স্তুতি না গেয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে থাকেন। এখানে মিডিয়া কভারেজ পাবার জন্য প্রধানমন্ত্রী কিংবা সাংবাদিকরা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়াদি টেনে হাসি তামাশায় অবতীর্ণ হন না। এমন কি সাংবাদিকদের বদনগুলোও দেখানো হয় না কোনো প্রচার মাধ্যমে।

তবে ৮ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি দুজনকে সাধারণত প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া হয়ে থাকে। তার একটি হচ্ছে জাপান জাতীয় সম্প্রচার (এনএইচকে) প্রতিনিধি এবং অপরটি হচ্ছে জাপান কেইজাই সিমবুন (অর্থনীতি) প্রতিনিধিকে। তারা ২ জনও কোনো স্তুতি না গেয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে থাকেন। এবং আমার অভিজ্ঞতায় তাদের প্রশ্নগুলো ধারালো থাকে বেশি। বাকিদের প্রশ্ন করার সুযোগ অনেকটা ভাগ্যের উপর নির্ভর করে।

২০১১ সালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর প্রধানমন্ত্রী নাওতো কান-কে আমি প্রশ্ন করার প্রথম সুযোগটি পেয়েছিলাম। ওইটা ছিল আমার জীবনে কোনো প্রধানমন্ত্রীকে প্রথমবারের মতো প্রশ্ন করার সুযোগ। প্রথমবারের মতো প্রশ্ন করতে গিয়ে আমি এতটাই নার্ভাস হয়েছিলাম যে, ‘সাপ্তাহিক’ বাংলাদেশ, টোকিও প্রতিনিধি বলতে গিয়ে, রাহমান মনি বলার পর কেবল ‘সাপ্তাহিক’ বাংলাদেশ বলে প্রশ্ন করে ফেলেছিলাম। সঞ্চালকের সামনে তালিকা থাকায় তিনি পরে তা সংশোধন করে দেন। এই হলো জাপান।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংবাদ সম্মেলন শেষ করা এখানকার রীতি। সংবাদ সম্মেলন শেষ করে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান জানিয়ে স্থান ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে যে যার মতো করে স্থান ত্যাগ করেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমন কিংবা প্রস্থানের সময় সাংবাদিকগণ নিজ নিজ আসনে থাকেন এবং সংবাদ সম্মেলনকালীন কেবল প্রধানমন্ত্রী দণ্ডায়মান থাকে আর বাকি সবাই আসনে বসা অবস্থায়। এমনকি প্রশ্ন করার সময়ও বসে বসেই প্রশ্ন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী দাঁড়ানো অবস্থাতেই উত্তর দিয়ে থাকেন। সঞ্চালকও দাঁড়িয়ে তার দায়িত্ব পালন করেন। পেন রিপোর্টাররা নিজ আসন থেকে ছবি তোলার কোনো অনুমতি পান না।

দেশের অভ্যন্তরীণ কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে সংবাদ সম্মেলন হলে বা জনস্বার্থ সংক্রান্ত কোনো বিষয় হলে এবং তা যদি সাধারণ জনগণের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন কোনো বিষয় হলে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সামনে (মেইন গেইট-এ) বিক্ষোভ প্রদর্শন স্বাভাবিক একটি ঘটনা। পূর্ব অনুমতি নিয়ে এবং পুলিশ প্রহরায় বাদ্যযন্ত্র নিয়ে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে থাকেন। এ সময় মাইকে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সেøাগান দিয়ে তার পদত্যাগ চাওয়া হয়। বাদ্যযন্ত্রের তাল প্রধানমন্ত্রী অফিস পর্যন্ত অনায়াসেই পৌঁছায়। তাতে প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে কোনোরূপ বিঘœ সৃষ্টি করা হয় না। বরং পুলিশ বাহিনী দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় বিক্ষোভকারীদের। বিক্ষোভকারীরাও কোনো প্রকার অসংযত আচরণ করেন না। সরকারের পক্ষে কোনো সমাবেশ হয়েছে সংবাদ সম্মেলনের দিন এমনটি দীর্ঘ ৯ বছরে চোখে পড়েনি।

এখানে কোনো প্রধানমন্ত্রী যদি দেশের বাইরে কোনো সামিট কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলন শেষ করে এসে সংবাদ সম্মেলন করেন, সাংবাদিকরা তখন চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তাকে তুলোধুনা করেন। সরকারি সংবাদ সংস্থার মিডিয়াও কোনো প্রকার ছাড় দিতে চায় না। কারণ জাপান সরকারি মিডিয়া চলে জনগণের করের টাকায়। তাই, তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা থেকেই তাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব তারা পালন করে যায়।

ব্যক্তি পরিচয়ে আমি বেশ কয়েকজন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝতে পেরেছি তা হলো প্রধানমন্ত্রীর পদটি সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব পাওয়া একটি পদ। যখন যার উপর দায়িত্ব পড়বে তখন সে পালন করবে। বেতনভুক একজন কর্মচারী যার নিয়োগকর্তা জনগণ।

একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা : প্রথম যেদিন সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে যাই নার্ভাস এর কারণেই হোক বা অসাবধানতাবশতই হোক পকেটে থাকা চাবির ছড়াটি কখন যে কোথায় পড়ে গিয়েছিল তা টেরই পাইনি। সবশেষে প্রধানমন্ত্রীর অফিস ত্যাগ করার সময় সিকিউরিটি অফিসার এসে চাবির ছড়াটি হাতে দিয়ে বললেন, এই চাবির ছড়াটি নিশ্চয়ই আপনার!
rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s