বাদ্যি বাজে ঢাকের হাটে

ঢাকের হাট। বসে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পুরান বাজার এলাকায়। এই হাটে ঢাকঢোলসহ ঢাকিরা এলেও পণ্য বিক্রি হয় না। শারদীয় দুর্গাপূজার বিভিন্ন পূজামণ্ডপের আয়োজকদের সঙ্গে ঢাকিদের চুক্তি হয় এই হাটে, মণ্ডপে বাজনা বাজানোর জন্য।

দুর্গাপূজার আরতি থেকে বিসর্জন—সর্বত্র লাগে ঢাকের বাজনা। তাই দুর্গাপূজায় ঢাক ও ঢাকিদের কদর বেড়ে যায় কয়েক গুণ। পূজা শুরুর কয়েক দিন আগে ঢাকিরা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েন অনেকটা নিজেদের চেষ্টাতেই। ব্যতিক্রম ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, গাজীপুর ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকা। এসব অঞ্চলের পূজারিরা ঢাকিদের আমন্ত্রণ জানান হাটে গিয়ে। আর তাই কটিয়াদীর এই ব্যতিক্রমী হাটে চলে আসে ঢাকির দল। এবারও হাট বসেছিল বুধ ও বৃহস্পতিবার (৫ ও ৬ অক্টোবর)। এই হাটের আছে ৪০০ বছরের ঐতিহ্য।

বলা হয়ে থাকে, কটিয়াদীর চারিপাড়া গ্রামে ছিল সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের রাজমহল। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রাজা তাঁর প্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন। স্থানীয় ঢাকিদের বাজনা তাঁর পছন্দ ছিল না। সেই সময় তিনি সেরা ঢাকির খোঁজ করতে থাকেন। একপর্যায়ে বিক্রমপুর পরগনার (বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ) সব ঢাকিকে আমন্ত্রণ জানান। নৌপথে অসংখ্য ঢাকি দল পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীর কটিয়াদীর যাত্রাঘাটে এসে জড়ো হন। রাজা নিজে দাঁড়িয়ে একে একে বাজনা শুনে সেরা দলটি বেছে নেন। সেই থেকেই যাত্রাঘাটে ঢাকের হাটের প্রচলন শুরু। পরবর্তী সময়ে স্থানান্তরিত হয়ে পুরান বাজারে বসে আসছে এ হাট।

৬ অক্টোবর হাটে গিয়ে দেখা গেল, এবার ঢাকিরা এসেছেন গাজীপুরের শ্রীপুর, ঢাকার নবাবগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, নরসিংদী ও মুন্সিগঞ্জ থেকে। ৪ অক্টোবর মানে হাট বসার আগের দিন ঢাক, কাঁসি, সানাই, নানা জাতের বাঁশি, করতাল, মঞ্জুরি নিয়ে দলে দলে সমবেত হয়েছেন তাঁরা। পুরান বাজারে হাটের জায়গায় সব ঢাকির স্থান সংকুলান হয়নি এবার। কারণ, বৃহস্পতিবার ছিল কটিয়াদীর হাটবার। সেই কারণে পুরান বাজার ছিল ব্যবসায়ীদের দখলে। স্থান না পেয়ে অনেক ঢাকি দলকে কালীবাড়ি, লক্ষ্মী নারায়ণ জিউর আখড়াসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অবস্থান নিতে হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার ঢাকির সংখ্যাও ছিল অপেক্ষাকৃত কম।

ঢাকিরা হাটে এসে নীরবে বসে নেই কিংবা দাঁড়িয়ে পূজারিদের অপেক্ষায় নেই। অনবরত বাজিয়ে চলেছেন তাঁরা। ঢাকিদের বাজনা দেখেই তাঁদের সঙ্গে চুক্তি হয় পূজার আয়োজকদের।

কথা হয় মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর থেকে আসা ঢাকি বিমলচন্দ্র বর্মণের সঙ্গে। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে এই হাটে এসে বিভিন্ন মণ্ডপে গিয়ে ঢাক বাজিয়ে আসছেন। অনেকটা হাটের টানে হাট ছাড়তে পারছেন না তিনি। বিমল বলেন, ‘সব ঢাকি একসঙ্গে অবস্থান করে বাজনা বাজিয়ে পূজারিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, এটাই হাটের সৌন্দর্য। এবার একসঙ্গে অবস্থান করতে না পারায় সৌন্দর্যহানি হয়েছে।’

নরসিংদীর মাধবদী থেকে আসা ঢাকি দলের নেতা বিষ্ণু সাহার মতে, ‘ব্যবস্থাপনার অভাবে হাটে আসতে ঢাকিরা এখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। একই কারণে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পূজারির সংখ্যাও কমে আসছে।’

এই নিয়ে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের মনোবেদনার শেষ নেই। উপজেলা পূজা উদ্‌যাপন পর্ষদের সভাপতি শীতল সাহা জানালেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। মণ্ডপগুলো উন্নত সাউন্ড সিস্টেম-নির্ভর হয়ে পড়ছে। মুঠোফোনের প্রচলনের কারণে ঢাকি ও পূজারির মধ্যে যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে। হাটে আসার প্রয়োজন পড়ছে না। এই অবস্থায় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো না গেলে বিশেষ করে নির্দিষ্ট স্থান, থাকার শেড ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হবে।

তারপরও কটিয়াদীর এই হাটে এবারও বেজেছে ঢাকের বাজনা। ঢাকিরাও বাজানোর জন্য চুক্তিতে গেছেন বিভিন্ন মণ্ডপে। ঢাকের বাজনায় পূর্ণতা পেয়েছে শারদীয় উৎসব।

প্রথম আলো