কলার পাতে বিছানো ক্ষীর যাচ্ছে বিদেশে

ছোট্ট একটি ঘর। একপাশে পরিপাটি একটা চৌকি। অন্যপাশে কলাপাতা আর মাটির পাত্র ছড়ানো ছিটানো। ঘরে একমনে বসে কাজ করছেন একজন। জ্বলন্ত চুলায় বসানো হলো দুধের পাতিল। সেই দুধে মেশানো হলো অল্প পরিমাণ চিনি আর হলুদ গুড়া। আধা ঘণ্টা ধরে চলল জ্বাল। অনবরত নাড়তে হলো দুধের মিশ্রণ। এক সময় দুধ ঘন হয়ে এলো। তারপর মাটির পাত্রে অল্প-অল্প করে উঠিয়ে রাখা হয়। ঘণ্টাখানেক পর ঠাণ্ডা হলে তা পেঁচানো হলো কলা পাতায়। এই হলো পাতক্ষীর।

এটি মুন্সিগঞ্জের জনপ্রিয় একটি নাম। জেলার সিরাজদিখান উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামে শতবর্ষী পুরনো মুখরোচক এই খাবার বানানো হয়। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই ক্ষীর এখন যাচ্ছে বিদেশে। পাতক্ষীর বানানোর শিল্পীরা মনে করেন, সরকার থেকে সহায়তা পেলে এটির প্রসার আরো বাড়ানো সম্ভব।

স্থানীয় সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ বলেন, এই জনপদে ঐতিহ্যের খাবারের নাম এলেই পাতক্ষীরের নাম আসে সবার আগে। তাই এই কাজের সঙ্গে জড়িতদের পৃষ্ঠপোষকতা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

সামসুল হায়দার বাদশার ছবিতে পাতক্ষীর বানানোর শিল্পী
সামসুল হায়দার বাদশার ছবিতে পাতক্ষীর বানানোর শিল্পী

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে গিয়ে দেখা যায়, পাতক্ষীর এখনো সমান জনপ্রিয়। সিরাজদিখান বাজারে বসে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এলাকায় পাতক্ষীর খুবই জনপ্রিয়। আর দামও আমাদের নাগালের মধ্যে। এটি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেছে।’

সিরাজদিখান উপজেলা সদরের অনেক মিষ্টির দোকানেও পাতক্ষীর তৈরি করা হয়। এমন কয়েকটি দোকানের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কারিগরেরা দোকানেই পাতক্ষীর বানিয়ে থাকেন।

পিছনে ফেরা : সিরাজদিখানের সন্তোষপুর গ্রামের সাতটি পরিবার এখনও পাতক্ষীর তৈরির কাজে জড়িত। তবে জনশ্রুতি আছে, পুলিনবিহারী দেব নামে এক ব্যক্তি স্ত্রীকে নিয়ে সর্বপ্রথম নিজ বাড়িতে পাতক্ষীর তৈরি শুরু করেন। পরে তা জেলার বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করতে থাকেন। একই সময়ে তার দেখাদেখি ইন্দ্রমোহন ঘোষ এবং লক্ষ্মী রানী ঘোষও তৈরি করতেন পাতক্ষীর। এখন তাদের বংশধররাই বানাচ্ছেন এই ক্ষীর। তাদের উত্তরসূরি কার্তিক চন্দ্র ঘোষ, ভারতী ঘোষ, সুনীল চন্দ্র ঘোষ, রমেশ ঘোষ, বিনয় ঘোষ, মধুসূদন ঘোষ, সমির ঘোষ ও ধনা ঘোষ এই পেশায় রয়েছেন।

বিদেশে যাচ্ছে : ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স ও জাপান থেকে পাতক্ষীরের অর্ডার আসে নিয়মিত। মুন্সিগঞ্জ ও আশপাশের এলাকার যেসব লোক বিদেশে থাকেন, তারা সে সব দেশে পাতক্ষীরকে পরিচিত করিয়েছেন। অনেকে বিভিন্ন সময় বিদেশে অবস্থানরত স্বজনদের জন্য পাতক্ষীর নিয়ে যান। সিরাজদিখান বাজারের ‘মা ক্ষীর ভাণ্ডার’ নামক দোকানের মালিক ভরত ঘোষ জানান, আমাদের এলাকার কেউ বিদেশে গেলে তাদের স্বজনদের জন্য পাতক্ষীর নিয়ে যায়।

ঐতিহ্যের অংশ : পাতক্ষীর মুন্সিগঞ্জের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে শতবছর ধরে। এছাড়া এই অঞ্চলের দই, মিষ্টি, মাওয়ার রসগোল্লা, চিত্তার দোকানের রসগোল্লা, ছানার আমৃত্তি ও দই বেশ জনপ্রিয়। আর সুস্বাদু রসমালাই তো রয়েছেই। কিন্তু সব কিছুকেই ছাপিয়ে পাতক্ষীর ঐতিহ্যের বড় একটি জায়গা দখল করে আছে। এটি স্বাদ ও গন্ধে অতুলনীয়। বাঙালি ঐতিহ্যের পাটিসাপটা তৈরিতেও প্রয়োজন হয় পাতক্ষীরের। এই এলাকায় নতুন জামাইয়ের সামনে পিঠাপুলির সঙ্গে পাতক্ষীর ব্যবহার না করা বেমানান হিসেবে ধরা হয়। এই অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে মুড়ির সঙ্গেও পাতক্ষীর খাওয়ার পুরনো রীতি প্রচলিত রয়েছে।

দরদাম : প্রতিটি পাতক্ষীরের ওজন প্রায় আধা কেজি। দাম ২৫০ টাকা। বাজারে দুধের দাম বেড়ে গেলে বেড়ে যায় পাতক্ষীরের দামও। দুটো মিলে হয় এক কেজি। তবে এক কেজি আবার ৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়। ঈদে দুধের দাম বৃদ্ধি ও চাহিদা বেশি থাকায় বিক্রি হয় ৫০০ টাকা কেজি দরে। তবে প্রতিটি ক্ষীরে ১০-২০ টাকার বেশি লাভ হয় না বলে কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। দোকানে বিক্রি ছাড়াও বাড়িতে এসে অর্ডার দিয়ে থাকে অনেক ক্রেতা।

শীতে চাহিদা বেশি : মুন্সিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী নানা উত্সবে পাতক্ষীরের পরিবেশন থাকবেই। এটি না হলে যেন আয়োজন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই এই এলাকার মেহমানদারি বা বড় বড় আয়োজনে এই পাতক্ষীর থাকা চাই। ঈদেও এই পাতক্ষীরের কদর থাকে অনেক বেশি। অনেকেই মেহমান আপ্যায়নে সেমাই, পায়েসের সঙ্গে সঙ্গে পাতক্ষীর পরিবেশন করে। ঘরোয়া অনুষ্ঠানে বাড়তি মাত্রা যুক্ত করে এটি। সব মৌসুমে চাহিদা থাকলেও শীতে পাতক্ষীরের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়।

শেখার রীতি : এই পাতক্ষীর তৈরির ব্যতিক্রম একটি দিক হচ্ছে, এ সব পরিবারের সন্তানরা বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজে পড়ে। তারা এটি তৈরি করা শেখে না। এসব বাড়িতে বৌ হয়ে যারা আসেন তাদেরই এ কাজ শেখার রীতি রয়েছে। সন্তোষপাড়ার ঘোষবাড়ির কন্যা শ্যামলী ঘোষ মাস্টার্স শেষ করে এখন বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন। তার মা পাতক্ষীর তৈরিতে পটু হলেও শ্যামলী কিন্তু পাতক্ষীর তৈরি করতে পারেন না। কিন্তু তার বৌদি কয়েক দিনেই বানানো রপ্ত করে ফেলেছেন। শ্যামলী ঘোষ জানান, পাতক্ষীর বানানো চেষ্টা করলে যে পারব না তা নয়। তবে কখনও চেষ্টা করিনি। তবে ভরত ঘোষ বলেন, ‘আমি এবং আমার ভাইয়ের সন্তানদের প্রতিজ্ঞা করিয়েছি, তারা যত উচ্চশিক্ষিত হোক না কেন, আমাদের পরিবারের শত বছরের ঐতিহ্য এই পাতক্ষীর তৈরি থেকে যেন বিরত না হয়।’

কারিগরদের কথা : সিরাজদিখানে পাতক্ষীর বানানোর সঙ্গে এখন অনেকে জড়িত রয়েছেন। তাদের একজন সুনীল ঘোষ বলেন, বানানোর পরে ক্ষীর কলাপাতায় জড়িয়ে থাকে বলেই এটির নামকরণ করা হয়েছে ‘পাতক্ষীর’। তার বাড়িতেই প্রতিদিন ৫০টির বেশি পাতক্ষীর তৈরি করা হয় বলে জানান তিনি।

সুনীল ঘোষের স্ত্রী নয়নতারা ঘোষ বলেন, একটি পাতক্ষীর বানাতে প্রায় তিন লিটার দুধের প্রয়োজন হয়। একটি পাতিলে দুধ ঢেলে অনেকক্ষণ জ্বাল দিতে হয়। জ্বাল দেওয়ার সময় কাঠের তৈরি হাতা (চামচ) দিয়ে নাড়তে হয় যাতে পাতিলের তলায় দুধ লেগে না যায়। এরপর দুধ ঘন হয়ে এলে সামান্য পরিমাণে হলুদ ও চিনি মিশিয়ে চুলা থেকে নামানো হয়। চুলা থেকে নামানোর পর মাটির পাতিলে রেখে ঠাণ্ডা করা হয়। এরপর কলার পাতায় মুড়িয়ে পাতক্ষীর বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়।

ছবি : সামসুল হায়দার বাদশা

ইত্তেফাক

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s