পরকীয়ার জেরে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড!

স্ত্রীর সঙ্গে পর্নোভিডিও দেখে সুমনকে জবাই করে ওহাব
প্রযুক্তি আমাদের অনেক দিয়েছে আবার কেড়েও নিয়েছে কিছু কিছু। রাজিয়া ও ওহাবের দাম্পত্যে তৃতীয় পুরুষ হয়ে দেখা দিয়েছিল যুবক সুমন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিতে হয়েছে তাকে। কারণ ইন্টারনেটে রাজিয়ার সঙ্গে সুমনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কিছু ভিডিও দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি ওহাব। শেষ পর্যন্ত তার হাতে খুন হতে হয় সুমনকে। নিজের জবানিতেই চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন ওহাব, জানিয়েছেন কীভাবে খুন করা হয় সুমনকে।

‘ইন্টারনেটে রাজিয়ার সঙ্গে সুমনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও দেখে ঠিক থাকতে পারিনি। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ছোট মেয়েকে হত্যা করে নিজেও আত্মহত্যা করব। কিন্তু মন সায় দিল না, সিদ্ধান্ত নিলাম সুমনকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেব। অবশেষে বড় ভাইদের (সঙ্গীয় কিলার) নিয়ে গলা কেটে হত্যা করি ওই বিশ্বাসঘাতককে।’Ñ গত শুক্রবার এভাবেই আদালতে জবানবন্দি দেন ওহাব। যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তের ব্যবসায়ী সুমন হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি।

গত ২৫ অক্টোবর কদমতলীর ওয়াসার পুকুরপাড় এলাকায় পানি শোধনাগারসংলগ্ন একটি ম্যানহোলের ভেতর থেকে অজ্ঞাত হিসেবে সুমনের (৩৫) গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নৃশংস এই হত্যাকা-ের ৬ দিন পর অর্থাৎ গত মঙ্গলবার সদরঘাট থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ওহাবকে। তার আগের রাতেই মুন্সীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন ওহাবের স্ত্রী রাজিয়াও।

কদমতলী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী আমাদের সময়কে বলেন, প্রথম যেদিন সুমনের গলা কাটা লাশ উদ্ধার করা হয় সেদিন আশপাশের কেউই তাকে শনাক্ত করতে পারেননি। নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিং, ডিএনএ প্রোফাইলিং, সব থানায় নিহতের ছবি পাঠিয়েও যখন তার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন এক হিজড়ার তথ্যে মেলে আশার আলো। ঘটনার ৫ দিন পর জানা যায়, খুন হওয়া ব্যক্তি যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তের মাছ ব্যবসায়ী সুমন। লাশ শনাক্ত হওয়ার পরও প্রশ্ন থেকে গেলÑ কী কারণে সুমন খুন হলো? কে তাকে খুন করল?

ওসি আরও বলেন, কু-বিহীন এই হত্যা মামলার তদন্তে একপর্যায়ে আটক করা হয় ওহাবের শ্যালকসহ কয়েকজনকে। তাদের তথ্যে গত সোমবার দিবাগত রাতে মুন্সীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ওহাবের স্ত্রী রাজিয়াকে। জিজ্ঞাসাবাদে রাজিয়া জানায়, ওহাব বরিশাল থেকে লঞ্চ কুয়াকাটা-১ এ ঢাকায় আসছেন। ওদিকে চতুর ওহাব কিন্তু রাজিয়ার বর্ণিত লঞ্চে না এসে মঙ্গলবার ভোরে ঢাকায় পৌঁছেন এ আর খান লঞ্চে। তবে পুলিশবাহিনী প্রস্তুতই ছিল। লঞ্চ থেকে নামতেই গ্রেপ্তার করা হয় ওহাবকে।

ওহাব পুলিশ ও আদালতকে জানিয়েছেন, কয়েকটি মামলায় দীর্ঘদিন ধরে জেলে ছিলেন তিনি। স্ত্রীর করা একটি মামলায় ৩/৪ বছর আগে জেলে যায় নিহত সুমন। সেখানেই ওহাবের সঙ্গে সুমনের পরিচয়। কিছুদিন পর জামিনে বের হন সুমন। সে সময় ওহাব তার স্ত্রী রাজিয়ার ফোন নম্বর সুমনকে দিয়ে হাজিরার দিন সে যেন কোর্টে আসেÑ সেই বার্তা দিতে বলেন। জেল থেকে বেরিয়ে সুমন যোগাযোগ করেন রাজিয়ার সঙ্গে। একপর্যায়ে পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন সুমন ও রাজিয়া। রাজিয়ার সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটানোর সময় সেসব মুহূর্তের ভিডিও রাজিয়ার অজান্তেই ধারণ করে রাখেন সুমন।

এরপর সেই ভিডিও দেখিয়ে দিনের পর দিন রাজিয়াকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকেন সুমন। তার অত্যাচার থেকে বাঁচতে ওহাব জেলে থাকা অবস্থায়ই রাজিয়া দেশ ছেড়ে লেবাননে পাড়ি জমান। পরবর্তী সময়ে ওহাব জেল থেকে বের হওয়ার পর আবার দেশে ফেরেন রাজিয়া। কিন্তু ফের ব্ল্যাকমেইল করতে থাকেন সুমন। একপর্যায়ে রাজিয়া সাড়া দিতে অস্বীকার করলে দুজনের গোপন ভিডিও সুমন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেন। এর কিছুই জানতেন না ওহাব। গত শবেবরাতের ৪ দিন পর, ওহাব তার মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করে পর্নোভিডিও দেখতে দেখতে ঘটনাক্রমে রাজিয়া-সুমনের অন্তরঙ্গ ভিডিও দেখতে পান।

ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী আরও জানান, পরদিন বিষয়টি সুনিশ্চিত হয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানতে রাজিয়াকে চাপ দেন ওহাব। রাজিয়া স্বামীর কাছে পরকীয়া সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। ওহাব জানান, এরপর একপর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তাদের একমাত্র কন্যাসন্তানটিকে মেরে ফেলবেন, তারপর তিনি নিজেও আত্মঘাতী হবেন। বিষয়টি তার এক কথিত বড়ভাইকে জানান ওহাব। সব শুনে সেই কিলার বড়ভাই বলেন, ‘আত্মহত্যা না করে প্রতিশোধ নে।’

এরপর অনেক খোঁজাখুঁজির পর হত্যার ৪ দিন আগে ওহাব সন্ধান পান সুমনের। যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তে ব্যবসা করেন সুমন এ তথ্য জানার পর সুমনকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ওহাব জানান, রাজিয়াকে তিনি তালাক দিয়েছেন। এরপর ওহাব বাসায় ফিরে রাজিয়াকে চাপ দিয়ে ফোন করান সুমনকে। ওহাবের কাছ থেকে তালাকপ্রাপ্তা হয়ে তিনি এখন গার্মেন্টসে চাকরি করেন ও একা বাসা নিয়ে থাকেন সুমনকে এমনটি জানান রাজিয়া। এসব তথ্য পেয়ে সুমনের মাথায় দোল খায় পুনরায় সম্পর্ক গড়ার বিষয়টি। তিনি দেখা করতে চান রাজিয়ার সঙ্গে। এ খবর হাতে পেয়ে বড় ভাইয়ের দেওয়া লোকজনসহ চাকু ও ব্লেড নিয়ে প্রস্ততি নেন ওহাব। ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় তারা চারজন অপো করতে থাকেন ওয়াসার গেটে। একসময় সুমন এসে দাঁড়ান গেটে, রাজিয়াও এসে দাঁড়ান। এরপর সুমনকে সেখান থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায় ঘাতকরা। অন্যদিকে রাজিয়া চলে যান বাসার ভেতরে।

পরবর্তী সময়ে ওহাবসহ ঘাতক ৫ জন জেরা শুরু করে সুমনকে। প্রথমে ব্লেড দিয়ে সুমনের গোপনাঙ্গ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় ওহাব, যেন আর কারো সর্বনাশ না করতে পারে সে। কিন্তু বাদ সাধে বাকিরা, সবাই মামলা খাওয়ার ভয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে সুমনকে নৃশংসভাবে জবাই করে লাশ সুইচগেটের ভেতর ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায় সবাই। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে সুমনের লাশ উদ্ধার করা হয় ম্যানহোল থেকে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ওহাবের অন্য সহযোগীদের ধরতে অভিযান চলছে বলেও ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী জানান।

আমাদের সময়

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s