কারখানার বর্জ্যে দূষিত ধলেশ্বরী

নদীমাতৃক দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। এই দেশের অধিকাংশ নদ-নদী বিলীন হয়ে যাচ্ছে কারখানার বর্জ্যের কারণে। এর ব্যতিক্রম নয় মুন্সীগঞ্জে। কারখানার বর্জ্য ও নদী দখল উৎসবের কারণে দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে, ধলেশ্বরী নদী।

দেশের দীর্ঘতম নদী ধলেশ্বরী নদীর অন্যতম পদ্মা-মেঘনা বেষ্টিত মুন্সীগঞ্জ জেলা।

কয়েক বছর আগেও ধলেশ্বরীতে শুশক মাছ দেখতে যেতো এ অঞ্চলের হাজারো মানুষ। নদী দূষনের ফলেু সেটা এখন ইতিহাস। মেঘনা-পদ্মা ও ধলেশ্বরী নদীতে এক সময় ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ পাওয়া যেত। এই নদীতে মাছ ধরে হাজারও জেলে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু এখন কয়েক বছরের ব্যবধানে মুন্সীগঞ্জ ও নারায়নগঞ্জে কিছু অসাধু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নদীর তীর ঘেষে রাইছ মিলসহ বিভিন্ন কলকারখানা প্রতিকষ্ঠা করার কারণে নদীতে পাওয়া যাচ্ছে না আগের মতো মাছ।

প্রতিযোগিতামূলক ভাবে দেশের দীর্ঘতম মেঘনা অববাহিকার ধলেশ্বরী অংশের হাটলক্ষীগঞ্জ, নয়াগাঁও, মুক্তারপুর, মালির পাথর, ফিরিঙ্গি বাজার ও মিরকাদিম এলাকায় ধলেশ^রীদে ফেলা হচ্ছে কলকারখানার বর্জ্য।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার পঞ্চসার, মিরকাদিম পৌরসভা এলাকায় প্রায় ৮টি অটো রাইছ মিল গড়ে উঠেছে। এসব রাইছ মিলে চাল পরিষ্কার করার জন্য ইউরিয়া সার ও ফিটকারি ব্যবহার করা হয়। এই ইউরিয়ার বর্জগুলো তাদের ড্রেনের মাধ্যমে সরাসরি নদীতে ফেলে। পাশাপাশি ধান সিদ্ধ-শুকানোসহ নানা প্রক্রিয়ার জন্য চাতালও রয়েছে ৪০টি। এসব চাতালগুলোতে প্রতি সাপ্তাহে প্রায় ৪৫হাজার মেট্রিক টন চাল প্রক্রিয়াজাত করা হয়। আর এসব চাল উৎপাদন করতে প্রতিদিন প্রায় ২০মেট্রিক টন চালের কুরা জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

এতে জ্বালানি শেষে প্রায় ৯মেট্রিক টন ছাই সৃষ্টি হয়। আর এসব ছাই মিল মালিকরা রাতের আধাঁরে ধলেশ্বরীতে ফেলছেন। আর তাদের কারখানার বর্জ্য ফেলার কারণে নদীগুলো আজ চর হয়ে যাচ্ছে। যার অধিকাংশ কারখানায়ই বর্জ্য পরিশোধনাগার প্রকল্প(ইটিপি) নাই। যার কারণে সেই সকল কারখানার বর্জ্য ও কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত পানি নিজস্ব পাকা ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে অনবরত।

বর্তমানে ধলেশ্বরী নদীর মাছ খাওয়া এখন দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছুই নয়। ধলেশ^রীর পানিগুলো এখন অনেকটা কালো আলকারতরার মতো রূপ নিয়েছে। নদীর পানি দিয়ে গোসল করলে গাঁয়ে এর্লাজি, খোজ-পাঁচরাসহ নানা ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকার লোকজন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাটলক্ষীগঞ্জ এলাকার মুন্সীগঞ্জ ফাইবার, মুক্তারপুর এলাকার শাহ আলম রাইস মিল, ফিরিঙ্গিবাজার এলাকায় বোগদাদ অটোরাইস মিল, সততা রাইস মিল ও কয়েকটি বোর্ড মিল সহ প্রায় ৮টি রাইসমিল রয়েছে।

স্থানীয় মুরুব্বি বাবুল মিয়া বলেন, মিল মালিকরা সরাসরি নদীতে কারখানার বর্জ্য ও ছাই ফেলছে আমরা ভয়ে তাদেরকে কেউ প্রতিবাদ করতে পারি না। তারা প্রত্যেকে সমাজের এক এক জন প্রভাবশালী। আমরা নদীতে এখন গোসল করতে পারছি না। এখন এই নদীতে গোছল করার পরিবেশ নাই। ধলেশ্বরীকে বাঁচাতে হলে প্রশাসনের শক্ত ভূমিকা প্রয়োজন। আইন প্রণয়ন করে বাধ্যতামূলক সমন্বিত ভাবে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপনে জোড় দিতে হবে।

মৎস ও প্রাণী সম্পদ রক্ষা কমিটির চেয়াম্যান হাজী মুহাম্মদ সেলিম বলেন, এ নদীতে প্রতিদিন বিকেলে শুশক মাছ দেখা ছিল আমাদের বিনেদনের একটা অংশ। নদীর পানি নষ্ট হওয়ার কারণে সেটা আর দেখা যায় না। প্রতিদিন সন্ধার পরে ছোট ছোট নৌকায় হারিকেন জ্বালিয়ে শত শত জেলে মাছ ধরতো যা রাতের বেলায় ভিন্নরকম আবহ সৃষ্টি করতো। এতো সুন্দর দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলার দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহফুজুল হক বলেন, নদী দূষনের বিষয়ে কয়েকটি মিল মালিককে নোটিশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আরো তদন্ত করে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলা প্রশাসক শায়লা ফারজানা বরেন, এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বাংলাপ্রেস

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s