মুন্সীগঞ্জে আলুর আবাদ শুরু

মোজাম্মেল হোসেন সজল: দেশের বৃহত্তম আলু উৎপাদনকারী অঞ্চল মুন্সীগঞ্জের গোটা জনপদ এখন কর্মচঞ্চল।এ জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল আলু। জেলার ছয় উপজেলার দিগন্ত বিস্তৃত ক্ষেত জুড়ে এখন চলছে শুধু আলুর আবাদ। কৃষকরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। বাড়িতে নারীরাও বীজ আলু কাটার কাজে ব্যস্ত।

আগামী এক মাস ধরে চলবে আলুর আবাদ।গত দুই মৌসুমে আলুর ভালো ফলন ও আলু চাষে লাভবান হওয়ায় মুন্সীগঞ্জের কৃষকরা এবার বেশ উদ্দীপনা ও উৎসাহ নিয়ে আলু চাষ করছেন।

এদিকে, অন্যান্য বছর এ সময় মুন্সীগঞ্জে আগাম আলু বাজারে উঠে।কিন্তু এবার জমি থেকে পানি দেরিতে নামায় আগাম আলু চাষ ব্যাহত হয়।এখন জেলার ৬টি উপজেলার ৩৮ হাজার ৫শ’ ৫০ হেক্টর জমিতে পুরোদমে আলু চাষ শুরু হয়েছে।আগামী এক মাস ধরে এ আলুর আবাদ চলবে।আলু উত্তোলন শুরু হবে আগামী মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে।আলু রোপনের পর তা পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে সময় লাগে তিন মাস।আলু আবাদে জেলার কৃষকদের সহায়তা করছেন বাড়ির নারীরাও।তারা বীজ আলু কেটে দিচ্ছেন।কাটার পর শ্রমিকরা তা জমিতে নিয়ে রোপন করছেন।বর্তমানে বাজারে আলুর চড়া দাম। বীজ আলু কাটার পর অবশিষ্ট কাটা আলু ব্যবসায়ীরা বাড়িতে গিয়েই ১৭-১৮ টাকা কেজি দরে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।আলুর দাম বেশি হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে।

মুন্সীগঞ্জে দিনদিন কৃষকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।সঙ্গে কমছে শ্রমিকের সংখ্যাও।গ্রামের অনেক কৃষক পরিবারের একাধিক সদস্য প্রবাসী হচ্ছেন।অনেকের আর্থিক অনটন না থাকায় চাষাবাদ ছেড়ে দিয়ে জমি লগ্নি বা ভাড়া দিচ্ছেন।আবার কেউ কেউ টাকা লগ্নি খাটাচ্ছেন।এ অবস্থায় গত কয়েক বছর ধরে রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, ময়মনসিংহ, দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গের শ্রমিকরা মুন্সীগঞ্জে ছুটে আসছেন আলু আবাদে।বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলার জমিতে উত্তরবঙ্গের ৯ থেকে ১০ হাজার শ্রমিক আলুচাষে নিয়োজিত রয়েছেন।এর এখানকার স্বচ্ছল কৃষকরা ওই শ্রমিকদের জমি চুক্তি দিয়ে আলু চাষাবাদ করছেন।

আলু চাষকে ঘিরে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সব পূঁজিও যাচ্ছে মাটির নিচে অর্থাৎ আলুর জমিতে।আলু চাষাবাদ মৌসুমে জেলার সব ধরনের ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দেয়।কৃষক সামাজিক বিয়ে বন্ধন থেকে বিরত থাকেন।মার্চ মাসে আলুর উঠার পর ব্যবসা-বাণিজ্য, বিয়ে-সাদিসহ সবকিছুই আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠে।বর্তমানে বাজারে সরকারি বিএনডিসির বীজ আলুর তীব্র সংকট রয়েছে, সারের নেই কোনো সংকট।

মুন্সীগঞ্জের রনছ হাওলাপাড়া গ্রামের বৃদ্ধ আলু চাষি হাসেম মিজি জানালেন, গত বছর আলু উৎপাদন করে ৩৬ মণ আলু বীজ হিসেবে রেখে দিয়েছিলেন।বিএডিসির বীজ আলু মাটির নিচে নষ্ট হয়ে পড়ায় তিনি নিজস্ব বীজ দিয়ে আলু রোপন করছেন।

কেওয়ার নুরাইতলীর কৃষক কামাল হোসেন জানালেন, তিনি এবার ৫৪০ শতাংশ জমিতে আলুর আবাদ করছেন।এর অর্ধেক জমি ভাড়া নিয়েছেন, বাকিটা পৈত্রিক। জমির ভাড়া, আলুর খরচ, সার, লেবার, চাষের খরচ মিলিয়ে প্রতি কানি অর্থাৎ ১ শ’ ৪০ শতাংশ জমিতে আলু চাষে খরচ পড়বে ১ লাখ ৮০ টাকা।এবার সারসহ অন্যান্য মালামাল গত বছরের সমান থাকায় আলু চাষে এবারও লাভবান হবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

বাড়ির নারীরা জানালেন, তারা দিনরাত আলু বীজ কাটছেন। ৮০ শতাংশ জমির আলু বীজ কাটতে সময় লাগবে ৩-৫দিন।

উত্তরবঙ্গে শ্রমিকরা জানালেন, তারা প্রতি কানি অর্থাৎ ১শ’৪০ শতাংশ জমি ১৮-২০ হাজার টাকায় চুক্তি নিয়ে আলু রোপন করছেন।আলু রোপন শেষে তারা বাড়ি ফিরে যাবেন।আলু উত্তোলনের জন্য আবার চৈত্র মাসে আসবেন।

বিসিআইসি সার ডিলার সমিতির মুন্সীগঞ্জ শাখার সভাপতি মো. নোয়াব আলী জানালেন, চায়না সার বস্তায় ২-৩ কেজি করে কম হয়।এ জেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই।সার নিয়ে কৃষকের কোন সমস্যাও হবে না।

জেলা বিএডিসির বীজ আলু ডিলার সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহমদ উল্লাহ বলেন, বিএডিসির বীজ আলুর প্রচুর চাহিদা রয়েছে।এতো অল্প বরাদ্দ দিয়ে কৃষকের চাহিদা মেটানো যাবে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছেন, মুন্সীগঞ্জ জেলায় ৭৮ হাজার কৃষক পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারের প্রায় ৪ লাখ ৬৮ হাজার সদস্য কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত।এ বছর জেলায় ৩৮ হাজার ৫শ’ ৫০ হেক্টর জমি আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।গত মৌসুমে ১৩ লাখ ৫১ হাজার ১শ’ ২৯ মেট্রিক টন আলু উৎপন্ন হয়।এ আলুর মধ্যে ৬০-৬৫ হাজার মেট্রিক টন বীজ আলু হিসেবে জেলার ৬৮টি কোল্ডস্টোরেজে (হিমাগার) সংরক্ষণ করা হয়।জেলায় ডিলার রয়েছে ১শ’ ৯২ জন।এ মৌসুমে জেলায় বিএডিসির ৭৮ হাজার ১শ’ মেট্রিক টন বীজ আলুর চাহিদা রয়েছে।বরাদ্দ পাওয়া গেছে ২ হাজার মেট্রিক টন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. হুমায়ুন কবীর জানিয়েছেন, জেলায় বিএডিসির ২ হাজার মেট্রিক টন বীজ আলু বরাদ্দ পাওয়া গেলেও কৃষকের কোনো ক্ষতি হবে না।কৃষক নিজেই কোল্ড স্টোরেজে বীজ আলু সংরক্ষণ করে থাকেন এবং বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জে বীজ আলু আমদানি হয়ে থাকে।এ কারণে বাজারে বীজের কোনো সংকট নেই বলে তিনি দাবি করেন।

পূর্ব পশ্চিম

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s