একাত্তরের কথা – ইমদাদুল হক মিলন

সে এক আশ্চর্য সময় ১৯৭১, সে এক গভীর আনন্দ-বেদনার দিন। বাঙালি জীবনে এত সুসময় আর কখনো আসেনি। এত দুঃসময়ও আর কখনো আসেনি। সুসময় এ জন্য, আমরা প্রতিটি মানুষ স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। কিছু স্বাধীনতাবিরোধী ছাড়া সবাই যে যার জায়গা থেকে মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছি। দুঃসময় এ জন্য, সেই যুদ্ধে আমরা ৩০ লাখ প্রাণ হারিয়েছি। আমাদের দুই লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন।

আমি এক বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা বলি। জুন মাসের ঘটনা। রাজশাহী জেলার রোহনপুর এলাকায় একজন মুক্তিযোদ্ধা ধরা পড়েছেন পাকিস্তানি জন্তুদের হাতে। তাঁর ওপর চালানো হচ্ছে অবর্ণনীয় অত্যাচার-নির্যাতন। প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করা হচ্ছে তাঁকে, সহযোদ্ধাদের নাম-ঠিকানা বের করার জন্য। শত অত্যাচারেও তরুণ মুক্তিযোদ্ধা মুখ খুলছেন না। অত্যাচারের মাত্রা বাড়ছে, মৃত্যুমুখে চলে যাচ্ছেন তরুণ, তবু মুখ খুলছেন না। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি মেজর তাঁর বুকে স্টেনগান ধরল—প্রশ্নের উত্তর দাও, নইলে এখনই গুলি করে মারব। নির্ভীক সেই বীর, বাংলার শ্রেষ্ঠতম এক সন্তান মুখ নিচু করে মাতৃভূমির মাটিতে চুমো খেলেন। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। আমার রক্ত আমার প্রিয় দেশটিকে, আমার মাতৃ-পিতৃভূমিকে স্বাধীন করবে।

এই হচ্ছে ১৯৭১। এই হচ্ছে আমাদের সেই সময়কার বীরত্ব।

এক বীরকন্যার কথা বলি। ষোলো-সতেরো বছর বয়সের গৃহবধূ। তাঁর নাম জানা যায়নি। স্বামী আনোয়ার কুড়িগ্রাম অঞ্চলের উলিপুর থানার ঘড়িয়ালডাঙ্গা গ্রামের যুবক। মুক্তিযোদ্ধারা আনোয়ারদের বাড়িটি ব্যবহার করতেন। আনোয়ার অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন না, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। এক রাতে বারোজন মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় নিলেন আনোয়ারদের বাড়িতে। বাড়ির তিনজন মাত্র মানুষ এ কথা জানলেন। আনোয়ার, আনোয়ারের বাবা, আর তাঁর পরির মতো সুন্দর কিশোরী স্ত্রী। আনোয়াররা সচ্ছল গৃহস্থ। বাড়িতে পাঁচটি ঘর। আনোয়ার আর তাঁর স্ত্রী উত্তর দুয়ারি ঘরে সাত মুক্তিযোদ্ধার থাকার ব্যবস্থা করলেন। অন্য পাঁচজন পুব দুয়ারি ঘরে। মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্য তিস্তা রেলস্টেশনে পাকিস্তানিরা যে ক্যাম্প করেছে, সেই ক্যাম্প আক্রমণ করা। এলাকায় সব মিলিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ঢুকেছেন ৩৫ জন। ভারী অস্ত্রশস্ত্রও আছে। ফজরের নামাজের সময় খবর পাওয়া গেল, আনোয়ারদের বাড়ির দিকে আসছে পাঁচ-ছয়জন পাকিস্তানি সৈন্য। পালিয়ে যাওয়ার সময় নেই। দুই ঘরের মুক্তিযোদ্ধারা এক ঘরে এসে চৌকির নিচে ঢুকে দরজা বরাবর এলএমজি বসিয়ে তৈরি হলেন। পাকিস্তানিরা যদি ঘরে না ঢুকে চলে যায়, তাহলে গুলি চালানো হবে না। ঘরে ঢুকতে গেলেই গুলি।

পাকিস্তানিরা এসে ধরল আনোয়ারকে। বেদম মারধর শুরু করল। জানতে চাওয়া হলো মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। পাক সেনাদের ভয়ানক মার খেয়েও কিছুই স্বীকার করলেন না আনোয়ার।

উঠানে যখন মারধর চলছে, তখন আনোয়ারের বউ বেরিয়ে এলো একটা ঘর থেকে। সেই মেয়েকে দেখে মুক্তিযোদ্ধারা স্তম্ভিত। এই মেয়ে কেন এলো জন্তুগুলোর চোখের সামনে? সে কি জানে না জন্তুরা কোন ধরনের অত্যাচার চালাচ্ছে বাঙালি মেয়েদের ওপর!

সেই মেয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে উঠান পেরিয়ে যে ঘরের চৌকির তলায় বারোজন মুক্তিযোদ্ধা এলমএজি তাক করে বসে আছেন, সেই ঘরে ঢুকল। মাথায় লম্বা ঘোমটা। ঘর থেকে সে কোরআন শরিফ আর রেহাল নিল, একটা চাটাই নিয়ে ঠিক দরজা বরাবর চাটাই বিছিয়ে বসল। রেহালের ওপর কোরআন শরিফ রেখে সুন্দর উচ্চারণে পড়তে লাগল। মেয়ের ভাবনা—পবিত্র কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করা মানুষটিকে ডিঙিয়ে পাকিস্তানিরা নিশ্চয়ই ঘরে ঢুকবে না। কারণ ওরাও তো মুসলমান!

মুক্তিযোদ্ধারা ভাবছেন, যদি মেয়েটিকে ডিঙিয়ে পাকিস্তানিরা ঘরে ঢুকেই যায়, তাহলে বাধ্য হয়ে গুলি চালাতে হবে। তাতে পাকিস্তানিরা মরবে, কিন্তু মেয়েটিও এলএমজির গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।

না, পাকিস্তানিরা মেয়েটিকে ডিঙিয়ে ঘরে ঢোকেনি। উঠান থেকেই চলে গেল। এভাবে বারোজন মুক্তিযোদ্ধাকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিল মেয়েটি। দুর্ভাগ্য, নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। এক পাকিস্তানি দালাল তার প্রভুদের ক্যাম্পে গিয়ে ঘটনা জানিয়ে দেয়। পাকিস্তানিরা এসে মেয়েটিকে ধরে নিয়ে যায়। সেই মেয়ে আর কখনো ফিরে আসেনি।

এই হচ্ছে ১৯৭১।

মে মাসের ৯ তারিখ ভোরবেলা মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানার কয়েকটি গ্রামে গণহত্যা চালাল পাকিস্তানিরা। হত্যা করল ৩৬০ জন বাঙালিকে। এই গজারিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহীম। বাবা নেই, মায়ের একমাত্র সন্তান। গজারিয়ার যুদ্ধে শহীদ হলেন ইব্রাহীম। তাঁর মাথায় গুলি লেগেছিল। মরদেহ নিয়ে ইব্রাহীমের বাড়িতে গেলেন সহযোদ্ধারা। ইব্রাহীমের মা তখন ঘরে। সেই বীরের মরদেহ উঠানে রেখে সহযোদ্ধারা ঢুকলেন ঘরে। কিন্তু একমাত্র সন্তানের শহীদ হওয়ার কথা কেমন করে বলবেন মাকে? কী করে দেবেন এ রকম সংবাদ? তবু ঘরে ঢুকলেন মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁদের দেখে উঠে দাঁড়ালেন ইব্রাহীমের মা। কী রে, কী হয়েছে! মুক্তিযোদ্ধা রফিক একটু অন্য রকমভাবে কথা বলতে শুরু করলেন। আমরা যে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছি সে কথা তো আপনি জানেনই…

অবশ্যই জানি। আমার ইব্রাহীমও তো আছে তোমাদের সাথে।

জি। কিন্তু যুদ্ধে যে কেউ আমরা মরতে পারি। আপনার ইব্রাহীমও মরতে পারে।

জবাবে সেই মহীয়সী নারী, সেই মা দৃঢ় গলায় বললেন, আমার ইব্রাহীম দেশের জন্য জীবন দিলে দেবে, তোরা তো আছিস! আমার কি আর একজন ইব্রাহীম? তোরা সবাই তো আমার ইব্রাহীম!

এই তো ১৯৭১।

এবার বলি ভাগীরথীর কথা। পিরোজপুর অঞ্চলের বাগমারা গ্রামের মেয়ে ভাগীরথী। মে মাসের এক বিকেলে সে গ্রামে হানা দিল পাকিস্তানিরা। যাকে যেভাবে পারল হত্যা করল। আগুন দিল মানুষের ঘরবাড়িতে। শুধু ভাগীরথীকে মারল না। রূপলাবণ্যে ভরা মেয়েটিকে ট্রাকে তুলে নিয়ে গেল কদমতলা আর্মি ক্যাম্পে। তার ওপর চলল অকথ্য নির্যাতন, পাশবিক নির্যাতন। সেই পৈশাচিকতার পরেও ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে রইল ভাগীরথী। পাকিস্তানিরা একসময় ক্যাম্পের কাজের মেয়ে হিসেবে ব্যবহার করতে লাগল তাকে। রান্নাবান্নার কাজ করাতে লাগল। ওরা যে যা বলে ভাগীরথী খুব আন্তরিকতা ও দক্ষতা নিয়ে করে দেয়। এভাবে পাকিস্তানিদের আস্থা অর্জন করল সে। কিন্তু তার অন্তরে জ্বলছে ভয়াবহ আগুন। গোপনে এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ করল। ভালো খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে ৪৫ জন পাকিস্তানি সৈন্যকে নিয়ে এলো তাদের গ্রামে। এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের আগেই বলে রেখেছিল। গ্রামে পাকিস্তানিরা ঢোকা মাত্রই আক্রমণ চালাল মুক্তিযোদ্ধারা। ৪০ জন পাকিস্তানিকে হত্যা করল। বাকি পাঁচজন আহত অবস্থায় পালিয়ে গেল।

ভাগীরথী সেদিন থেকে উধাও। কিন্তু উধাও হয়ে বাঁচতে পারল না। তাকে ধরিয়ে দিতে পারলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। সে ধরা পড়ে গেল। সেদিন হাটবার। ভাগীরথীকে এনে চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড় করানো হলো। শত শত মানুষের সামনে তার শরীর থেকে খুলে নেওয়া হলো জীর্ণ শাড়ি। দুটো জিপ দাঁড়ানো পাশাপাশি। দুই জিপের মাঝখানে ভাগীরথী। তার দুহাত দুপা বাঁধা হলো দুই জিপের সঙ্গে। চালিয়ে দেওয়া হলো জিপ। পুরনো শাড়ির মতো ছিঁড়ে গেল ভাগীরথী।

এই তো ১৯৭১।

মে মাসের ২০ তারিখ। চুকনগরে এসে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার হিন্দু পরিবার। চুকনগর বাজারের ভেতর দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে চলে যাবে ভারতে। এই খবর রাজাকাররা পৌঁছে দিল পাকিস্তানিদের কাছে। বাজারের দুদিক থেকে পাকিস্তানিদের দুটো গাড়ি ঢুকল। ঢুকেই শুরু করল গুলি। সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত মুষলধারায় গুলি। ৩টার পর বাজার এক মৃত্যুপুরী। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। চার ঘণ্টায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ হত্যা করল জানোয়াররা।

গণহত্যা শেষ করে ওরা চলে যাওয়ার পর চুকনগর বাজারে ছুটে এসেছিল এলাকার মানুষজন। লাশ আর রক্তের নদী বয়ে যেতে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় মানুষ, কাঁদতে ভুলে যায়।

চুকনগরের পাশের গ্রাম মালিথার দরিদ্র কৃষক এরশাদ। তিনিও ছুটে এসেছেন। লাশের স্তূপ দেখে বাকরুদ্ধ মানুষটি বিহ্বল দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখতে পান, এক মৃত মায়ের বুকের দুধ পান করার চেষ্টা করছে তাঁর কোলের অবুঝ শিশুকন্যা। মায়ের হাতে শাঁখা, সিঁথিতে সিঁদুর। এরশাদ পরম মমতায় কোলে তুলে নিলেন সেই শিশুকে। বাড়িতে এনে স্ত্রীর কোলে দিলেন। চোখের পানিতে ভাসতে ভাসতে ঘটনা বললেন। তাঁর মতো গভীর মমতায় শিশুকন্যাটিকে বুকে নিলেন এরশাদের স্ত্রী। সেই মুহূর্তে তিনি হয়ে গেলেন শিশুটির মা।

এই তো আমার ৭১। এই তো ৭১-এর কথা।

একাত্তর মানে মাথার ওপরকার বিশাল আকাশ, আমার পায়ের তলার মাটি। একাত্তর মানে বাংলার নদী খাল বিল আর উদার মাঠ। একাত্তর মানে বাংলার বনভূমি আর সমুদ্রের উতল হাওয়া। একাত্তর মানে ফুল পাখি প্রজাপতি আর শস্যের মাঠে রৌদ্রের খেলা। একাত্তর মানে জোছনায় ভেসে যাওয়া বাংলাদেশ। একাত্তর মানে বাঙালির অন্তর আলোকিত করা দেশপ্রেম। একাত্তর মানে বাঙালির ভালোবাসা, বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন। একাত্তর মানে জয় বাংলা আর লাল-সবুজের পতাকা। একাত্তর মানে বঙ্গবন্ধু আর বাঙালির স্বাধীনতা।

কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s