মুক্তিযুদ্ধের নাটক ‘লাল জমিন’ মঞ্চস্থ

মুন্সীগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের নাটক ‘লাল জমিন’ প্রথমবারের মত মঞ্চস্থ হয়েছে। জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এই নাট দর্শককে যেন ফিরিয়ে নিয়ে যায় ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে। মুন্সীগঞ্জের “অন্বেষণ বিক্রমপুর”র আয়োজনে মান্নান হীরা রাচনা ও সুদীপ চক্রবর্তীর নির্দেশনায় নাটকটিতে একক অনবধ্য অভিনয় করেন মোমেনা চৌধুরী। হলভর্তি দর্শক এই নাটক দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি। নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধে প্রকৃত চিত্র দেখে আবেগাপ্লুত।

শুক্রবার রাতের এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহা. হারুন-অর-রশীদ। অন্বেষণ বিক্রমপুরের সভাপতি মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বলের সভাপতিত্বে এতে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন নাটকের অভিনেত্রী মোমেনা চৌধুরী, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এম এ কাদের মোল্লা, সরকারী হরগঙ্গা কলেজের সহকারী অধ্যাপক রাসেল কবির, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অভিজিৎ দাস ববি, প্রেসক্লাবের সভাপতি রাসেল মাহমুদ, সাংবাদিক তানভীর হাসান। হেমন্তের কনকনে শীরের রাতে মফস্বল শহর মুন্সীগঞ্জে নাটকটির ১০২তম মঞ্চায়নে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করে। নাটকটির আবহ সঙ্গীতে ছিলেন মোমেনা চৌধুরীর কন্যা নভেরা চৌধুরী। আলোক সজ্জায় মামুন এবং কোরিয়গ্রাফীতে ছিলেন সানি ও জুয়েল। নাটকের কাহিনী আর নিপুন অভিনয় মিলে অনেক দিন পর মুন্সীগঞ্জ স্মরণীয় হয়ে উঠে।

নাটকের কাহিনিতে দেখা গেছে, অজপাড়া গায়ের তের বছরের এক কিশোরী। মাটির সুধা গন্ধে বিভোর প্রাণ”ঞ্চলা এই কিশোরী তার মায়ের সব কাজেই সহযোগিতা করেন। কখনও উঠানে ধান ছড়াচ্ছেন। কখনও ঢেঁকিতে পা দুলাচ্ছেন। কখনও আবার ধানের খের সুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সবকিছুর মাঝেও তার কিশোরী মন বাতাসে দোলা দিচ্ছে। আনমনে একাই কথা বলছেন। কিশোরী মন যৌবনের জয়গানে মুহুর্তেই বিব্রত। কখনও আবার লজ্জায় লাল হয়ে যায় তার অপরূপ মুখখানা। এক সময় দক্ষিণা বাতাসে ভেসে আসে স্বপ্ন পুরুষ এক জাদুকরের আহ্বান। জাদুকর এক বীর মুক্তিযোদ্ধা। রণাঙ্গনের সাহসী সৈনিক। স্বপ্নের নায়ক জাদুকরের আহ্বানে কিশোরীর মনে চঞ্চলতা বেড়ে যায়। জাদুকরের প্রতি গভীর প্রেমে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার সাথেই সব সময় কথা বলতে শুরু করে। নিজের ভাল লাগা, মন্দ লাগা বলতে থাকে। সুখানুভূতি ছড়াতে থাকে সারা শরীরময়। নিজের ভিতর বেড়ে উঠে ভিন্ন এক জগত। অনুভূতিরা খেলা করে সুর্যের আলোয়, নিকষ কালো অন্ধকারে আবার জোৎ¯œা ভরা রাতে। কখনও গানে গানে সময় কাটে। কখনও নেচে উঠে কিশোরী মন। তবে মায়ের প্রতি ভালবাসা হারায় না। কারণ বাবা মুক্তিযোদ্ধের ডাকে সারা দিয়ে রণাঙ্গণের অভিযাত্রী। মা একা। মাকে সাহায্য করতে হবে। এদিকে, বীর পুরুষ বাবা। কিশোরী মেয়েটির মনে বাবার প্রতি ভীষন টান। মায়ের শত বকুনী আর জীবনের নানান উপলদ্ধি সত্ত্বেও মন টানে বাবার পানে। বীর পুরুষের সাহসী কণ্যার তাই এক এক সময় এক রূপ। কখনও মায়াবতী, কখনও প্রেমময় ললনা কখনও আবার অগ্নিমূর্তি। সময় পেরিয়ে এক সময় যুদ্ধের ধামামা বেজে উঠে। স্বাধীনতার যুদ্ধ। কন্ঠে তার স্বাধীনতার ডাক। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ স্বপ্নের নায়কের পথ ধরে সেও শপথ নেয় মুক্তিযুদ্ধে যাবে। কিশোরী তখন চৌদ্দ বছরে পদার্পণ করেছে।

যৌবনের উন্মাদনা যুদ্ধ জয়ের স্বপ্নে বিভোর। মনে তার রঙিন স্বপ্ন। লাল পতাকা জয়ের স্বপ্ন। তবে, যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তাকে নানান পরীক্ষা দিতে হয়। প্রেমিক পুরুষকে তার ¯িœগ্ধ কোমল অপরূপ যৌবনদীপ্ত চেহারা দিয়েও জয় করতে পারেনি। যুদ্ধে যাবার জন্য প্রতিনিয়ত পরীক্ষা দিতে হয়েছে। বয়সের পরীক্ষা, দৃঢ়তার পরীক্ষা। একদিন মাকে ফাঁকি দিয়ে গভীর রাতে যুদ্ধের মাঠে হাজির হন কিশোরী। উত্তাল নদীপথ পাড়ি দিয়ে চলছে নৌকা। পাঁচ মেয়ে আর নয় পুরুষের দল এক নৌকায়। চারিদিকে চকিত চাহনী। সবার চেহারায় অচেনা ভাবনা ভর করে আছে। বিকেলের সূর্য পশ্চিম আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। এক কিছুর মাঝেও যুদ্ধে যাবার এ সময় কানের প্রিয় দুল খানা নিতেও ভুল করেনি কিশোরীর মন। জাদুকর কিছুটা হাসি লুকিয়ে দুল পড়ার অনুভূতি দিয়ে দেন। নৌকা চলছে। মন দুলছে। হঠাৎ শত্রুপক্ষের আক্রমণ। তাদের নৌকায় পাক বাহিনীর হামলা। তারপর পাক বাহিনীর নারকীয় তান্ডব চলে। মেয়েদের উপর বর্বরতম নির্যাতন। হিন্দু এক মহিলায় সিঁদুর লুটিয়ে পড়ে রাজাকারের পায়। কিশোরী বিভীষিকাময় এই নারকীয় তান্ডবে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। সেসময় তার চৌদ্দ বছরের সাদা জমিনে লাল রক্ত ঝরে পড়ে। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। লাল সবুজের পতাকা। বহু বছর পর প্রশ্ন জাগে কিশোরীর। রাজাকারদের দাপট কেন থামেনি। কেন এত বছর পর বৃদ্ধ বয়সে মরা শরীর নিয়ে লাল পতাকায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে পুরনো ইতিহাস বলতে হয়। আমাকে আবার বিবস্ত্র করা হয়। প্রশ্ন জাগে-কেন ওরা স্বাধীনতা বুঝে না। কেন ওরা দেশ বুঝে না। কেন ওরা পতাকা বুঝে না। প্রশ্ন জাগে মনে এত বছর পরও কেন ওদের মুক্তিযুদ্ধ বুঝাতে হবে।

জনকন্ঠ

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s