একটি মুখের হাসির জন্য || ইমদাদুল হক মিলন

আপনে আসছেন কই থিকা?
বারবাড়ির সামনে দুটো জামগাছ। জামগাছের গা ঘেঁষে পাটখড়ির বেড়া। বারবাড়ির সঙ্গে ভেতর বাড়ি আলাদা করার জন্য এই ব্যবস্থা।
শিরিন দাঁড়িয়ে আছে বেড়ার সামনে। অচেনা মানুষের গলা শুনে মাথায় ঘোমটা দিয়েছিল। এখন একপলক মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে অকারণেই ঘোমটা আরেকটু টেনেটুনে ঠিক করল।

সকাল দশটা এগারোটার রোদ বেশ ভালোই তেজালো হয়েছে। জামগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়েও গরম খুব একটা কম লাগছিল না ইউসুফের। কিন্তু গরমের তোয়াক্কা করল না সে। হাসিমুখে বলল, আমি এসেছি ঢাকা থেকে।
চান কারে?

এটা নাসিরের বাড়ি না? মুক্তিযোদ্ধা নাসির হোসেন? স্বাধীনতার পর পর শুনেছিলাম এলাকার সবাই তাকে নাসির কমান্ডার নামে চেনে। যদিও সে কমান্ডার ছিল না। ছিল সাধারণ একজন মুক্তিযোদ্ধা।

ইউসুফের কথা শুনে ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল শিরিন। কোনও রকমে বলল, আপনে এত কথা জানলেন কেমনে?

আমরা একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। মানে সহযোদ্ধা ছিলাম। যদিও নাসির বয়সে আমার চে’ ছোট। মুক্তিযুদ্ধের সময় একুশ বাইশ বছর বয়স ছিল। দুর্দান্ত সাহসী, টগবগে দুর্ধর্ষ ধরনের তরুণ। মৃত্যুভয় কাকে বলে জানত না। গোয়ালিমান্দ্রার অপারেশানে দারুণ সাহস দেখিয়েছিল নাসির। যে কোনও অপারেশানে যেতে একপায়ে খাড়া। নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছে দুতিনবার। লোকে নাসিরকে কমান্ডার বলত, আসলে কমান্ডার ছিলাম আমি। আমার নাম ইউসুফ, ইউসুফ মির্জা।
নামটা শুনে আপাদমস্তক কেঁপে উঠল শিরিন, দিশেহারা হলো। কন কী? আপনে ইউসুফ ভাই? আপনের কথা কত শুনছি তার কাছে। আসেন ভিতরে আসেন।
শিরিনের পিছু পিছু ভেতর বাড়িতে ঢুকল ইউসুফ।

বাড়িটি অতি দীনদরিদ্র ধরনের। দোচালা জীর্ণ একখানা টিনের ঘর, রান্নাচালা আর একচিলতে উঠোন। উঠোনের একপাশে ভাঙাচোরা হাঁসমুরগির খোঁয়াড়ের লাগোয়া পাতিলেবুর ঝাড়। রান্নাচালার ওদিকটায় লাউ কুমড়ো শসা ঝিঙের মাচান। দোচালা ঘরটার পেছনে দুতিনটে আম আর একটা তেঁতুল গাছ। গাছগুলো জড়াজড়ি করে আছে বলে বাড়িটা বেশ ছায়াময়। উঠোনের একটা দিকে শুধু রোদ পড়েছে। সেই রোদে তারে শুকাতে দেয়া হয়েছে বারো তেরো বছর বয়সী একটি মেয়ের ছিটকাপড়ের জামা। কয়েকটা হাঁস মুরগি চড়ছে ওদিকপানে।

বাড়ি দেখে মনটা খারাপ হল ইউসুফের।

শিরিন তখন ঘরে ঢুকে হাতলঅলা পুরনো একখানা চেয়ার এনেছে। উঠোনের ছায়ায় চেয়ার রেখে বলল, বসেন।

চেয়ারে বসতে বসতে ইউসুফ বলল, কিন্তু পাগলটা কোথায়? ইস কতদিন পর দেখা হবে! আটাশ উনত্রিশ বছর তো হবেই! স্বাধীনতার পর পর প্রায়ই দেখা হতো। তখনও যুদ্ধের উন্মাদনা কাটেনি, অস্ত্রটস্ত্র জমা দেইনি। তারপর আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে গেল সব। আমরা একেকজন ভেসে গেলাম একেকদিকে। নাসির বিক্রমপুরের ছেলে, সে চলে এলো বিক্রমপুরে, গ্রামেই সেটেল করল। আমি চলে গেলাম ইংল্যান্ডে। বিয়েশাদি করে লন্ডনে থেকে গেলাম। দেশে দুচারবার আসা হয়েছে কিন্তু পুরনো বন্ধুদের কারো সঙ্গেই তেমন যোগাযোগ, দেখা সাক্ষাৎ হয়নি।

ইউসুফ একটু থামল। শিরিনের মুখের দিকে তাকাল। এবার আমি দেশে এসেছি এই একটাই উদ্দেশ্যে। পুরনো সব বন্ধুকে খুঁজে খুঁজে বের করব, তাদের সঙ্গে দেখা করব। বয়স হয়ে যাচ্ছে, থাকি বিদেশে, কোনওদিন হার্টঅ্যাটাক ফেটাকে শেষ হয়ে যাব, এই জীবনে কারও সঙ্গে আর দেখাই হবে না।

শাড়ির আঁচল দাঁতে কামড়ে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে শিরিন। ইউসুফ তার দিকে তাকাল না। পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করে সিগ্রেট ধরাতে ধরাতে বলল, নাসির যে বাড়ি নেই তা আমি বুঝেছি। কোথায় গেছে বলতে পারবেন? একটু যদি খবর দেয়া যায়…

কথা শেষ না করে শিরিনের দিকে তাকিয়েছে ইউসুফ, তাকিয়ে বুকে কী রকম একটা ধাক্কা খেল। সিগ্রেটে টান দিতে ভুলে গেল, চোখে পলক ফেলতে ভুলে গেল।
মুখ নিচু করা শিরিনের চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে।

যা বোঝার বুঝে গেল ইউসুফ। শিরিনের দিকে তাকিয়ে পাথর হয়ে বসে রইল। ফাঁকা শূন্য গলায় একসময় বলল, কবে?
আঁচলে চোখ মুছে শিরিন বলল, আইজ দেড় বচ্ছর।
ও আমার চে’ কত ছোট! এই বয়সেই…
কথা শেষ করে উদাস হয়ে গেল ইউসুফ। খানিক আগের উচ্ছল আবেগে ভর্তি কথা বলতে পছন্দ করা মানুষটি যেন আর নেই। এখন যে বসে আছে শিরিনের সামনে সে যেন অন্য কেউ। হতাশ ম্লান, আচমকা শোকে পাথর হওয়া একজন মানুষ।
একসময় বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইউসুফ। কত আশা করে এবার দেশে এসেছিলাম, সবার সঙ্গে দেখা করব। নাসিরের বাড়ি বিক্রমপুরের কোন গ্রামে তা বেশ ভালোই জানা ছিল, যুদ্ধের সময় একবার এসেছিলাম। এতগুলো বছর কেটে গেছে, সবকিছু একেবারেই বদলে গেছে, তারপরও বাড়ি চিনতে ভুল হয়নি। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই আসতে পেরেছি। নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর একটা পরীক্ষা নিচ্ছিলাম যে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে দেখি নাসিরের বাড়িটা বের করতে পারি কি না। পারলাম ঠিকই, কিন্তু যার জন্য আসা সে-ই নেই।
আঁচলে আবার চোখ মুছল শিরিন, নাক টানল।
আনমনা ভঙ্গিতে সিগ্রেটে টান দিয়ে ইউসুফ বলল, কী হয়েছিল?
লানছে ক্যান্সার হইছিল। বেদম সিগ্রেট খাইত। ক্যান্সার ধরা পড়নের পরও থামে নাই।
কাজ কী করত?
আমগ গেরামের পেরাইমারি ইসকুলের মাস্টার আছিল।
ততোক্ষণে দুজন মানুষই কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, কথাবার্তার আড়ষ্টতা কেটে গেছে শিরিনের। থমথমে গলায় বলল, বহুত কষ্ট পাইয়া মরছে। ক্যান্সারের চিকিস্যায় বেদম টেকা লাগে। এত টেকা আমরা পামু কই? ইসকুলের ফান্ড থিকা টেকা দিছে, ছাত্র ছাত্রীরা চান্দা কইরা টেকা দিছে তাও তেমুন চিকিস্যা করাইতে পারি নাই।
এই ধরনের অসুখে কিছু অবশ্য করারও থাকে না।
হাতের সিগ্রেট শেষ হয়ে গিয়েছিল, পায়ের সামনে ফেলে জুতো দিয়ে ডলে ডলে নেভাল ইউসুফ। শিরিন বলল, নিজে তো মরছেই আমগও মাইরা থুইয়া গেছে।
কথাটা বুঝতে পারল না ইউসুফ। শিরিনের মুখের দিকে তাকাল।
শিরিন বলল, এমতেই গরিব মানুষ আমরা, জমাজমি যা অল্পবিস্তর আছিল হেই হগল বেবাক গেছে তার চিকিস্যায়। সরকারি ইসকুলের মাস্টারগ আইজকাইল ভালো অবস্তা। তারা মইরা গেলে সরকার থিকা ভালো টেকাই পায়। আমরাও পাইছি। হেই হগল বেবাগ গেছে দেনা শোধ করতে। অহন আমরা পথের ফকির। কিচ্ছু নাই। খালি এই বাড়িডা, ভাঙাচুরা ঘরডা।
আপনার সংসার তাহলে চলে কী করে?
কোনও রকমে চলে। একজন মাত্র দেওর আমার, সে থাকে ঢাকায়। সে মাসে মাসে কিছু টেকা দেয়। দুইভাই আছে, তারা দেয় কিছু। বইনরা দেয় যহন যা পারে। আমগ বিক্রমপুর হইল ধনী মাইনষের দেশ। তয় আমগ আত্মীয়স্বজন কেঐ ধনী না। বেবাকতেই গরিব। কে কারে টানব, কন? দূরের আত্মীয় বড়লোক যারা আছে তারা কেঐ খবর লয় না। সাহাইয্যের লেইগা গেলে কুত্তা বিলাইয়ের লাহান খেদাইয়া দেয়।
বাড়ির দশা দেখে আর শিরিনের কথাবার্তা শুনে নাসিরের ফেলে যাওয়া সংসারের অবস্থাটা পুরোপুরিই বুঝেছে ইউসুফ। বুঝে মন খুবই খারাপ হয়েছে তার। আহা কী অসহায়, হতদরিদ্র সংসার এক মুক্তিযোদ্ধার! হয়তো এরকম দশা আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধার সংসারের। কে তাঁদের খবর রাখে!
গাছপালার দিকে তাকিয়ে ম্লান গলায় ইউসুফ বলল, আপনাদের বাচ্চাকাচ্চা?
একটা মাইয়া। অহনও ছোড। তেরো চৌদ্দ বচ্ছর বয়স।
এত কম বয়সী মেয়ে…
কথাটা শুনে শিরিন একটু লজ্জা পেল। মাথা নিচু করে বলল, আমগ বিয়া হইছিল দেরিতে। বিয়ার দুই বচ্ছর পর একটা পোলা হইয়া মরল। তার চাইর পাঁচবচ্ছর পর হইল মাইয়াটা।
কোথায় সে? তাকে যে দেখছি না!
ইসকুলে গেছে। দোফরে আইসা পড়ব। আইজ হাফ ইসকুল।
নাম কী মেয়েটার? কোন ক্লাসে পড়ে?
নাম হইল দোয়েল। পড়ে কেলাস সেভেনে।
দোয়েল নামটা শুনে খুব ভালো লাগল ইউসুফের। মুগ্ধ গলায় বলল, বাহ্। খুব সুন্দর নাম তো! দোয়েল। বাংলাদেশের জাতীয় পাখির নাম। নিশ্চয় নাসির রেখেছিল!
হ সে-ই রাখছে। বহুত আদর করতো মাইয়াটারে। মাইয়াটা আছিল তার জান।
অনেক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে বলতে শিরিন বোধহয় একটু ক্লান্ত হয়েছে। ঘরের লেপাপোছা পৈঠায় নরম ভঙ্গিতে বসল। আপনে আইছেন এতুক্ষুণ হইল, এককাপ চাও আপনেরে খাওয়াইতে পারলাম না। ঘরে চাপাতা চিনি কিচ্ছু নাই।
ইউসুফ ব্যস্ত গলায় বলল, আমাকে নিয়ে ভাববেন না। চায়ের অভ্যাস তেমন নেই আমার।
তয় দোফরে কইলাম ভাত খাইয়া যাওন লাগব। কইমাছ দিয়া ভাত খাওয়াইতে পারুম। তিন চাইরডা কইমাছ জিয়াইন্না আছে।
এমন আন্তরিক গলায় কথাটা বলল শিরিন, শুনে আবেগে বুকটা ভরে গেল ইউসুফের। এই তো চিরকালীন বাঙালি নারী। অতিথির সেবায় দরিদ্র সংসারের সবচাইতে মূল্যবান সম্পদও ব্যয় করতে পারে। দুচারটা কইমাছ আর একজন মানুষের একবেলার ভাত কি কম মূল্যবান এই সংসারে!
ইউসুফ মুগ্ধ গলায় বলল, আপনি এতটা আন্তরিকতা নিয়ে বলেছেন তাতেই আমি খুশি। ভাত খাব না। আর কিছুক্ষণ বসেই চলে যাব।
ইউসুফ আবার একটা সিগ্রেট ধরাল।
শিরিন বলল, ভাই, আপনের ছেলেমেয়ে কয়জন?
দুটো ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটা ছোট। ছোট মানে দোয়েলের চে’ অনেক বড়। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। এ বছরই বিয়ে দেব ভাবছি।
শুনে মন খারাপ করা গলায় শিরিন বলল, আমার মাইয়াটারে তো মনে হয় বিয়াই দিতে পারুম না।
ইউসুফ চমকাল। কেন?
মাইয়াটার কপাল খারাপ। এমতেই গরিব ঘরের মাইয়া, বাপ নাই। তার ওপরে আইজ চাইরমাস ডাইন গালে একটা টিউমার হইছে।
কী?
হ। পয়লা পয়লা ছোডই আছিল জিনিসটা, দিনে দিনে বড় হইছে। অহন মুরগির আন্ডার সমান।
বলেন কী? ডাক্তার দেখান নাই?
ভালো ডাক্তার কই থিকা দেখামু কন? আমগ গেরামের কাশেম ডাক্তাররে দেহাইছি। সে কয় এই হগল চিকিস্যা দ্যাশগেরামে হয় না। টাউনে নিয়া অপরেশন করান লাগব। অপরেশনে অনেক টেকা লাগব। এত টেকা আমি কই পামু কন?
ইউসুফ চুপ করে রইল।
শিরিন বলল, আমার মাইয়াডা অর নামের লাহানই আছিল। দোয়েল পাখির লাহান স্বভাব। একমিনিট থির হইয়া থাকতে পারত না। এইমিহি যাইতাছে ওইমিহি যাইতাছে। কথায় কথায় খিলখিল কইরা হাসতাছে। টিউমার হওনের পর মাইয়াডা আমার বদলাইয়া গেছে। দৌড়াদৌড়ি ছটফটানি বন্ধ হইয়া গেছে, হাসি বন্ধ হইয়া গেছে। মাইয়াডা আর অহন হাসেই না। টিউমারের বেদনায় রাইত দোফরে উইঠা মাঝে মাঝে কান্দে। ইসকুলে যায় ওড়না দিয়া মুখ ঢাইকা। টিউমারডা য্যান কেঐ দেখতে না পায়।
কথা বলতে বলতে আবার চোখে পানি আসে শিরিনের। চোখ মুছতে মুছতে সে বলল, কাশেম ডাক্তার কইছে অপরেশন না করলে এই টিউমার থিকা ক্যান্সার হইতে পারে। ক্যান্সার হইলে বাপের লাহান মাইয়াডাও যাইব।
প্রথমে নাসিরের মৃত্যুর কথা শুনে বুকে এক ধাক্কা খেয়েছে ইউসুফ, এখন দোয়েলের কথা শুনে আরেক ধাক্কা খেল। বুকটা হু হু করতে লাগল তার। এতকাল পর এ কোন দুঃখ হতাশার মধ্যে এসে পড়ল সে! কী স্বপ্ন দেখে এসেছিল, কী হল তার পরিণতি!
না এই দুঃখ কষ্টের মধ্যে থাকতে আর ভাল লাগছে না। যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে সরে পড়তে পারলেই ভাল।
আচমকাই যেন তারপর উঠে দাঁড়াল ইউসুফ। আমি তাহলে আসি এখন।
ইউসুফের আচরণে বেশ অবাক হল শিরিন। সেও উঠে দাঁড়াল। আর একটু বসবেন না? বসেন আরেকটু। মাইয়াটা আসুক। বাপের মুখে কত গল্প শুনছে আপনের। আপনেরে দেখলে খুব খুশি হইব।
ইউসুফ বিনীত গলায় বলল, না। আমার সময় নেই। তাছাড়া ওইটুকু মেয়ের ওই কষ্টের মুখ আমি দেখতেও চাই না। নাসিরের মৃত্যুর কথা শুনে যে দুঃখ পেয়েছি সেই দুঃখ সামলাতে পারব কিন্তু দোয়েলের মুখ দেখে যে দুঃখ পাব তা সামলাতে পারব না। সে আসার আগেই চলে যেতে চাই।
পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল ইউসুফ। গুণে গুণে পাঁচশো টাকার দশটা নোট মুঠো করে দিল শিরিনের হাতে। এখানে পাঁচ হাজার টাকা আছে। এটা রাখুন। দোয়েলের চিকিৎসা করাবেন।
একসঙ্গে এতগুলো টাকা অনেকদিন চোখে দেখেনি শিরিন, সে বেশ দিশেহারা হল। প্রথমে চোখ দুটো চঞ্চল হল তার, তারপর পানিতে ভরে গেল। কান্নাকাতর কৃতজ্ঞ গলায় বলল, আল্লায় আপনের ভাল করুক ভাই। আল্লায় আপনের ভাল করুক।
ইউসুফ আর কোনও কথা বলল না। হন হন করে হেঁটে বারবাড়ির দিকে চলে গেল।
দুই
আজ শুক্রবার।
দোয়েলের স্কুল নেই। যেদিন স্কুল না থাকে দোয়েল একটু বেলা করে ওঠে। আজও তাই উঠেছে। উঠে হাত মুখ ধুয়ে বই নিয়ে বসেনি, বেতের সাজিতে মুড়ি আর ছোট্ট একটা আখিগুড়ের টুকরো নিয়ে বসেছে। দরজার সামনে বসে উদাস হয়ে গুড়মুড়ি খাচ্ছে।
গাছপালার ফাঁক ফোকড় দিয়ে সকালবেলার রোদ এসে পড়েছে উঠোনে। সেই রোদে হাঁস মুরগিগুলো খুদকুড়ো খাচ্ছে। শিরিন ব্যস্ত হয়েছে সংসারের কাজে। এইমাত্র উঠোন ঝাড় দিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেল। দুদিন ধরে মনটা একটু ভাল শিরিনের। স্বামীর বন্ধু ইউসুফ মির্জা আসার পর, সে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে যাওয়ার পর থেকে শরীরের গতি যেন বেড়ে গেছে তার। হয়তো মেয়েটার অপারেশানের একটা কিছু ব্যবস্থা এবার করা যাবে। কাশেম ডাক্তারের কাছে গিয়েও কথাও বলে এসেছে কাল। এই টাকায় হবে না, টাকা আরও লাগবে। সেই টাকা কীভাবে জোগাড় করা যায়, গ্রামের কাকে কাকে ধরলে, কোন আত্মীয়র কাছে গেলে টাকা দুচারশো করে পাওয়া যাবে এইসব ভেবেছে কাল অনেকরাত পর্যন্ত। সবমিলিয়ে দশবিশজন লোকও যদি পাশে দাঁড়ায়, টাকা যা উঠবে, কাজ হয়ে যাবে। ওই যে কথায় আছে না, দশের লাঠি একের বোঝা।
আর যদি এভাবে না হয় তাহলে আর একটা বুদ্ধি আছে। এই বুদ্ধিটাও কাশেম ডাক্তারই দিয়েছেন। ঢাকার দৈনিক পত্রিকাগুলোর চিঠিপত্র কলামে ‘আমার মেয়ের মুখের হাসি ফিরিয়ে দিন’ বা এই জাতায় শিরোনাম দিয়ে কয়েকটা চিঠি লিখতে হবে। পাঁচ দশটা চিঠি লিখলে দুয়েকটা চিঠি ছাপা হবেই। সেই চিঠি পড়ে দেশের দয়াবান মানুষরা কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে দোয়েলকে সাহায্য করতে। এইভাবে অনেক অসহায় মানুষের উপকার হয়। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে শুনলে আর কেউ না হোক মুক্তিযোদ্ধারা অন্তত সাহায্য করবেন। দেশে বিত্তবান মুক্তিযোদ্ধাও তো কম নেই।
আশ্চর্য ব্যাপার, গত চারমাসে এইসব বুদ্ধি কারও মাথায় আসেনি। ইউসুফ মির্জা এসে যেন ঘোরতর অন্ধকারে মোমের আলো জ্বেলে দিয়ে গেলেন। এখন চারদিকে হয়তো আরও একটা দুটো করে আলো জ্বলে উঠবে।
আহা, সেই মানুষটার সঙ্গে দোয়েলের দেখা হয়নি। সে স্কুল থেকে ফেরার আগেই চলে গেছেন তিনি। বাবার মুখে কত গল্প একদিন শুনেছে এই মানুষের, তাদের বাড়ি এসে ঘুরেও গেলেন এত বছর পর, দোয়েলকে না দেখেই তার চিকিৎসার জন্য অতগুলো টাকা দিয়ে গেলেন অথচ দোয়েলের সঙ্গে তাঁর দেখাই হল না। হয়তো কোনওদিন হবেও না। কারণ তিনি বাংলাদেশে থাকেনই না।
আজকের সকালটা এসব ভেবেই কাটিয়েছে দোয়েল। তারপর ভেবেছে টিউমারের কথা। যদি টাকা জোগাড় করে সত্যি সত্যি অপারেশান করা যায়, তাহলে একদমই আগের মতো হয়ে যাবে তার মুখ। আগের মতো খিলখিল করে হাসতে পারবে, কথা বলতে পারবে। মুখে কোনও দাগ থাকবে না, মুখটা হয়ে যাবে আগের মতো নিখুঁত সুন্দর। যে কেউ সেই মুখ দেখে বলবে, বাহ্ কী সুন্দর চেহারা মেয়েটির! কী মিষ্টি মুখ!
নাকি অপারেশানের দাগ থেকে যাবে গালে! টিউমার থাকবে না ঠিকই, টিউমারের চিহ্ন, কাটা দাগ থেকে যাবে!
তাহলে আর লাভ হল কী? মুখে বড় একটা খুুঁত তো তার থেকেই গেল?
আবার একটা ভয়ের কথাও বলেছেন কাশেম ডাক্তার। এই ধরনের টিউমার থেকে অনেক সময় ক্যান্সার হয়। যদি তেমন হয় তাহলে আর মুখের দাগ হাসিটাসি নিয়ে ভেবে কী লাভ! ক্যান্সার হলে বাঁচার আশা নেই। বাবার মতো ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে।
এসব ভেবে বিষণ্ন মুখে বারবাড়ির দিকে এসেছে দোয়েল, লম্বা চওড়া, সুন্দর পোশাক জুতো পরা একজন স্নিগ্ধ মুখের মানুষ এসে দাঁড়াল তার সামনে। মানুষটার হাতে সুন্দর একটা শপিংব্যাগ, ব্যাগের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে বেশ দামি ধরনের কয়েকটি প্যাকেট। দেখে বোঝা যায় খাবারের প্যাকেট। বিদেশি বিসকিট চকলেট এসব হবে। আর মানুষটার গা থেকে কেমন একটা বাবা বাবা গন্ধ আসছিল।
বাইরের যেকোনও মানুষের সামনে দোয়েল এখন তার মুখটা ঢেকে রাখে। মুখের ওই বিশ্রী টিউমার সে কাউকে দেখাতে চায় না। হঠাৎ লম্বা হয়ে ওঠা টিংটিংয়ে মেয়েটির ওড়না ব্যবহারের দরকার হয় না, তবু মুখ ঢাকার জন্য ওড়না পরে সে।
গলার কাছে ওড়না এখনও আছে কিন্তু মুখ ঢাকার কথা মনে হল না দোয়েলের। দুঃখী বিষণ্ন মুখে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই মানুষটিও দোয়েলের মতো করেই তাকিয়েছিল তার দিকে। তবে কয়েক মুহূর্ত মাত্র। তারপরই হাসিমুখে মায়াবী গলায় কথা বলে উঠল, তোমাকে চিনতে আমার ভুল হয়নি। তুমিই দোয়েল। দোয়েল ছাড়া এত সুন্দর, মিষ্টিমুখ আর কোনও মেয়ের হবে!
বলেই গভীর মমতায় দোয়েলের চিবুকের কাছটা ধরল। সেদিন তোমার সঙ্গে দেখা না করে চলে গেছি, দুটো দিন এজন্য কষ্ট পেয়েছি। সে কারণেই আবার এলাম।
রান্নাঘরের দিক থেকে ইউসুফের গলা বুঝি শুনতে পেয়েছিল শিরিন, আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে এল। ইউসুফকে দেখে মাথায় ঘোমটা দিল। ব্যস্ত গলায় বলল, আপনে আসলেন কখন?
একহাত দোয়েলকে জড়িয়ে ধরে ইউসুফ বলল, এই তো এক্ষুণি।
আসেন, আসেন।
সেদিনকার মতো আজও ছুটে গিয়ে ঘর থেকে চেয়ার আনল শিরিন। আঁচলে চেয়ার মুছে বলল, বসেন ভাই, বসেন।
চেয়ারে বসে শপিংব্যাগটা দোয়েলের হাতে দিল ইউসুফ। এটা তোমার জন্য। এখানে মজার মজার বিসকিট চকলেট ক্যান্ডি আছে। এগুলো ঘরে রেখে এসো।
কিন্তু মানুষটার কাছ থেকে সরে যেতে ইচ্ছে করছে না দোয়েলের। কেমন যেন লাগছে। মনে হচ্ছে অনেকদিন পর দূর কোনও পরদেশ থেকে যেন ফিরে এসেছেন বাবা। চোখের আড়াল হলেই বুঝি দোয়েলকে ছেড়ে আবার উধাও হয়ে যাবেন।
তবু ঘরে গিয়ে চৌকির উপর শপিংব্যাগটা রেখে এলো দোয়েল। কাছে আসতেই তাকে বুকের কাছে টেনে নিল ইউসুফ। গভীর মমতায় আঙুলের ডগায় আলতো করে ছুঁয়ে দিল তার টিউমারটা। বিশাল এক ভরসা দেয়া গলায় বলল, এ এমন কিছু টিউমার না! সামান্যই। ছোট্ট একটা অপারেশান লাগবে।
ইউসুফের এই কথাটা যেন শুনতে পেল না শিরিন। বলল, আইজ কইলাম ভাত না খাইয়া যাইতে পারবেন না। আমি অহনই ভাত চড়াইতাছি। কইমাছ চাইরটা আছে।
ইউসুফ স্নিগ্ধ মুখে বলল, তা না হয় খেলাম। কিন্তু আপনি যদি রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে যান তাহলে কথা বলব কখন? আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
শিরিন কথা বলবার আগেই দোয়েল বলল, তাইলে চেরটা রান্ধনঘরের সামনে লইয়া যাই। মায় রানল আর আপনে কথা কইলেন।
দোয়েলের কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল ইউসুফ। বাহ্! এই মেয়ে তো খুব সার্প। ভাবি, আপনি সব গোছগাছ করে বসুন, আমি চেয়ার নিয়ে ওখানে আসব। এই ফাঁকে দোয়েলের সঙ্গে একটু গল্প করি।
আচ্ছা।
শিরিন ব্যস্তভঙ্গিতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
ইউসুফ আবার হাসিমুখে তাকাল দোয়েলের দিকে। আমি কি তোমার সামনে একটা সিগ্রেট খেতে পারি মা?
দোয়েল মাথা নাড়ল।
সিগ্রেটের গন্ধে তোমার খারাপ লাগবে না তো?
না। বাবায় অনেক সিগারেট খাইত। বাড়িত থাকলে সবসময় থাকতাম বাবার লগে লগে। বাবার সিগারেটের গন্ধ আমার ভাল লাগত। বাতাসে সিগারেটের গন্ধ পাইলেই আমি বুঝতাম বাবায় আসতাছে।
ইউসুফ কথা বলল না। পকেট থেকে সিগ্রেট বের করে ধরাল। তারপর আচমকা বলল, আমি সেদিন ইচ্ছা করেই তোমার সঙ্গে দেখা করে যাইনি, জানো?
দোয়েল অবাক হল। ক্যান?
আমি যে তোমার জন্য কিছু নিয়ে আসিনি। একদম খালি হাতে এসেছিলাম, এজন্য।
কিন্তু আপনের জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। রাত্রে অনেকক্ষণ ঘুম আসে নাই। খালি আপনের কথা চিন্তা করছি। বাবার কাছে আপনের কথা শুনছি তো! আপনেরে খুব দেখতে ইচ্ছা করছিল।
সিগ্রেটে টান দিয়ে ইউসুফ বলল, ভাবির মুখে তোমার নাম শুনে তোমাকেও খুব দেখার ইচ্ছা হয়েছিল আমার। যে মেয়ের নাম দোয়েল, তাকে না দেখে আমি যাব কেন? কিন্তু যখনই তোমার টিউমারের কথা শুনলাম, মনটা এত খারাপ হল। ফুলের মতো একটি মেয়ের মুখে টিউমার! টিউমারের জন্য সে হাসতে পারছে না, এসব ভেবে কষ্ট পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল তোমার মুখটা আমি সহ্য করতে পারব না, আমার বুকটা ফেটে যাবে। অত কষ্ট পাওয়ার চে’ তোমাকে না দেখে চলে যাওয়াই ভাল।
ইউসুফ আবার সিগ্রেটে টান দিল। কিন্তু যেতে যেতে আমি তোমার কথা খুব ভাবলাম। তোমার বাবার কথা ভাবলাম, নিজের কথা ভাবলাম। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি। কত বড় অপারেশানে যোগ দিয়েছি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শত্র“র ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আর আজ ছোট্ট একটা মেয়ের বিপদের কথা জেনেও আমি তার সঙ্গে দেখা না করে পালিয়ে যাচ্ছি! এসব ভেবে নিজের ওপর খুব রাগ হল, জানো? নিজেকে কাপুরুষের মত মনে হল। অথচ আমি তো তা নই, আমি তো একজন মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে আমি পালিয়ে যাব কেন?
ইউসুফের কথার অনেকটাই বুঝতে পারছিল না দোয়েল। কিন্তু তার খুব ভাল লাগছিল শুনতে। অপলক চোখে ইউসুফের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল সে।
সিগ্রেটে টান দিয়ে, উঠোনের হাওয়ায় ধোঁয়া ছেড়ে ইউসুফ বলল, এজন্য ঢাকায় ফিরে গিয়ে বড় বড় কয়েকটি হাসপাতালে যোগাযোগ করলাম আমি, কয়েকজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললাম। ভাবির মুখে তোমার টিউমারের কথা যতটা শুনেছি ততটাই বললাম তাদের।
তার টিউমারের ব্যাপারে ঢাকার বড় ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছে ইউসুফ, হাসপাতালে কথা বলেছে শুনেই বিষণ্ন মুখটা উজ্জ্বল হল দোয়েলের। গভীর আগ্রহের গলায় বলল, ডাক্তাররা কী কইল?
বড় ডাক্তাররা রোগী না দেখে কিছু বলেন না। তবু আমার মুখ থেকে যতটা শুনেছেন, বললেন, এটা তেমন সিরিয়াস কিছু ব্যাপার না।
একটু থামল ইউসুফ। সিগ্রেটে টান দিল। তোমাদের বাড়ি থেকে ফিরে গিয়ে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে যখন কথা বলছি, ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলছি, তখন আমার কী মনে হচ্ছিল জানো, মনে হচ্ছিল আমি যেন একাত্তর সালে ফিরে গেছি। আমাকে যেন একটা যুদ্ধে নামতে হবে। আমি যেন সেই যুদ্ধের রসদ জোগাড় করছি।
বলেই সরল মুখ করে হাসল ইউসুফ। তোমাকে এসব বলতে খুব ভাল লাগছে।
সিগ্রেটে শেষটান দিয়ে পায়ের কাছে ফেলল ইউসুফ। জুতোয় ডলে সিগ্রেট নেভাল। বলল, তারপর বুঝলে মা, যুদ্ধের পুরো প্রিপারেশান নিয়ে তোমাদের বাড়ি এলাম।
মুখটা একটু ঝুঁকিয়ে দোয়েলের কানের কাছে নিয়ে গেল ইউসুফ। কেন এসেছি জানো? তোমাকে নিয়ে যেতে। তোমাকে নিয়ে যাওয়া মানেই যুদ্ধটা আমি শুরু করলাম।
দোয়েল অবাক গলায় বলল, কোথায় নিয়া যাইবেন আমারে?
ঢাকায়। হাসপাতাল রেডি করে এসেছি, ডাক্তার রেডি করে এসেছি। আজ ঢাকায় পৌঁছেই সেই হাসপাতালে নিয়ে যাব তোমাকে। ডাক্তাররা আগে তোমার টিউমার পরীক্ষা করবেন। তারপর অপারেশান।
শুনে আনন্দ উত্তেজনায় বুক ভরে গেল দোয়েলের। ইচ্ছে হল এখনই রান্নাঘরে দৌড়ে গিয়ে খবরটা মাকে দিয়ে আসে। তা করল না দোয়েল। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, অপারেশন করলে পুরা ভালো হইয়া যামু আমি?
হ্যাঁ। পুরো ভাল হয়ে যাবে।
আগের মত হাসতে পারুম?
অবশ্যই পারবে।
মুখে কোনও দাগ থাকব না?
না, একটুও দাগ থাকবে না। কারণ তোমাকে করা হবে বেশ দামি অপারেশান। কসমেটিক সার্জারি। কসমেটিক সার্জারিতে কোনও দাগ থাকে না। অপারেশানের পর মুখ দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে তোমার মুখে একটা টিউমার ছিল।
এবার নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না দোয়েল। দৌড়ে মা’র কাছে গেল। জোয়ার জলের মতো কলকল করে মুহূর্তে ইউসুফের মুখে শোনা সব কথা বলে দিল।
শিরিন তখন চুলোয় ভাত বসিয়ে কইমাছ কুটতে বসেছে। সব শুনে গভীর আনন্দে স্তব্ধ হয়ে গেল। কাজ করতে ভুলে গেল।
দোয়েল ততক্ষণে আবার ছুটে এসেছে ইউসুফের কাছে। ভয় মেশানো উত্তেজিত গলায় বলল, অপরেশন করলে ব্যথা পামু না আমি?
দুহাতে দোয়েলকে বুকের কাছে টেনে আনল ইউসুফ। না, একটুও ব্যথা পাবে না। তুমি তো টেরই পাবে না অপারেশানটা কখন হল। আচ্ছা শোনো, তুমি কি ইনজেকশানে ভয় পাও?
মুখের মজাদার ভঙ্গি করে দোয়েল বলল, না। একবার পা মচকাইয়া গেছিল। তখন বাবায় কাশেম ডাক্তারের কাছে নিয়া ইনজেকশন দেওয়াইয়া আনছিল। একটুও ব্যথা পাই নাই। খালি মনে হইল একটা পিঁপড়ার কামড়।
তাহলে তো কথাই নাই। অপারেশানের আগে একটা ইনজেকশান দেবে তোমাকে। তুমি ঘুমিয়ে পড়বে। ঘুম থেকে উঠে দেখবে টিউমারটা নেই। তুমি সেই আগের দোয়েল হয়ে গেছ।
শুনে কী যে মুগ্ধ হল মেয়েটি! হাসার চেষ্টা করল কিন্তু স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাসতে পারল না। দেখে বুকটা হুহু করে উঠল ইউসুফের। হয়তো কষ্টটা কাটাবার জন্যই উঠে দাঁড়াল সে। বলল, কী হল দোয়েল, তোমার জন্য যে এত খাবার আনলাম, খাচ্ছ না কেন?
পরে খামু নে।
না এক্ষুণি খাও। যাও, প্যাকেট খুলে দেখ যেটা ভাল লাগে নিয়ে এসো। তুমি খাবে আর ভাবির সঙ্গে কথা বলব আমি।
তাইলে চেয়ারটা আমি রান্ধনঘরের সামনে নিয়া দেই?
তুমি দেবে কেন? আমিই তো নিতে পারি। কিন্তু চেয়ার এখন নেব না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলব।
আইচ্ছা।
দোয়েল ঘরে ঢোকার পর ইউসুফ এল রান্নাঘরের সামনে। শিরিনকে বলল, মেয়ের মুখে তো সবই শুনেছেন। তবু আবার বলি, আপনাদের দুজনকে আমি ঢাকায় নিয়ে যেতে চাই। দোয়েলের চিকিৎসাটা করাতে চাই।
শুনে আবেগে কথা বলতে পারল না শিরিন। মাছ কুটতে কুটতে ইউসুফের দিকে তাকাল। গভীর কৃতজ্ঞতায় চোখ দুটো ছলছল করছে তার। কোনও রকমে বলল, কী কমু ভাই, কন! খালি এটুকু কইতে পারি, আপনে মানুষ না, আপনে ফেরেশতা।
ইউসুফ কিছু বলবার আগেই ওয়েফার ধরনের লম্বা দুটো বিসকিট হাতে দোয়েল এসে দাঁড়াল তার পাশে। কামড়ে কামড়ে বিসকিট খেতে লাগল। খাওয়ার ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছিল স্বাভাবিক মানুষের মতো খেতে পারছে না সে। অসুবিধা হচ্ছে।
একপলক দোয়েলকে দেখে শিরিনের দিকে তাকাল ইউসুফ। ভাত খেয়েই রওনা দিতে চাই। আপনি সেইভাবে ব্যবস্থা করুন ভাবি।
দোয়েলকে বলল, কাপড় চোপড় গুছিয়ে নাও। আজই ঢাকায় নিয়ে যাব তোমাদেরকে। এখান থেকে সরাসরি হাসপাতালে।
শুনে শিরিন এবং দোয়েল দুজনেই দিশেহারা হল।
শিরিন বলল, আইজই যাওন লাগব! তাহলে এইদিকে কী ব্যবস্থা করুম? বাড়িঘর হাঁস মুরগি এইসব কে দেখব?
ইউসুফ বলল, পাড়াপ্রতিবেশি কাউকে বলুন। একজন এমন কাউকে যদি পাওয়া যায়, যতদিন দরকার বাড়িতে থাকল। তার খাওয়া খরচের টাকা আমি দিয়ে যাব।
দোয়েল লাফিয়ে উঠে বলল, ওমা, হাসু ফুপুরে থুইয়া যাও। তার তো কোনও বাড়িঘর নাই, সংসার নাই। এহেকদিন এহেক বাড়িতে থাকে। অহন আছে বেপারি বাড়িতে। আমি গিয়া তারে ডাইকা লইয়াহি। টেকা দিলেই দেখবা খুশি হইয়া থাকব।
শিরিন কথা বলবার আগেই ইউসুফ বলল, যাও মা, ডেকে নিয়ে এসো।
তিন
দুপুরের পর পর বাড়ি থেকে বেরুল তিনজন মানুষ।
হাসুকে বাড়িতে রেখে বেশ সহজেই সব ব্যবস্থা করা গেছে। মহিলাকে পাঁচশো টাকা দিয়ে এসেছে ইউসুফ। ওতেই মহাখুশি সে। তাছাড়া ঘরে চাল ডাল যা আছে একজন মানুষের বেশ কিছুদিন চলবে। ততদিনে দোয়েলের অপারেশান করিয়ে ফিরে আসতে পারবে শিরিন।
গ্রামের পথে দোয়েলের হাত ধরে হাঁটছে ইউসুফ। দোয়েল শিরিনের জামা কাপড়ের ছেঁড়াখোড়া রেকসিনের ব্যাগটা তার হাতে। বেশভূষার সঙ্গে ব্যাগটা একদমই মানাচ্ছে না। কিন্তু ওসবের তোয়াক্কা করছে না ইউসুফ। উচ্ছ্বসিত গলায় দোয়েলের সঙ্গে কথা বলছে। তোমাদেরকে নিয়ে আরও অনেক প্ল্যান আছে আমার। উত্তরায় আমার একটা ছয়তলা বাড়ি আছে। নিচে গাড়ি রাখার জায়গা আর পাঁচতলায় দশটা ফ্ল্যাট। নটা ভাড়া দেয়া, একটা আমার জন্য। দেশে এলে ওই ফ্ল্যাটটায় আমি থাকি। অপারেশানের পর তুমি আর তোমার মা থাকবে আমার ফ্ল্যাটে। বাড়িভাড়ার টাকা থেকে তোমাদের খরচ দেয়া হবে। আমি সব ব্যবস্থা করব। উত্তরায় অনেক ভাল ভাল স্কুল আছে। সেখানকার একটা স্কুলে ভর্তি করে দেব তোমাকে। এই মুহূর্ত থেকে তোমাদের দুজনের দায়িত্ব আমার।
ইউসুফ এবং দোয়েলের পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে এসব কথা শুনছিল শিরিন, চোখে পানি আসছিল তার।
বড় রাস্তায় একটা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। ইউসুফকে দেখেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে নেমে এল ড্রাইভার। হাত থেকে ব্যাগটা নিল।
দোয়েল উত্তেজিত গলায় বলল, আমরা এই গাড়িতে কইরা যামু?
হ্যাঁ। গাড়িটা আমারই।
তারপর শিরিনের দিকে তাকিয়ে বলল, উঠুন ভাবি।
মাইক্রোবাসের পেছন দিককার সিটে বসল শিরিন, সামনের দিকে দোয়েল আর ইউসুফ। গাড়ি যখন চলতে শুরু করেছে, ইউসুফ বলল, জানো দোয়েল, এই মুহূর্তে যুদ্ধের সময়কার একটা গানের কথা খুব মনে পড়ছে আমার।
আনন্দে বিভোর হওয়া গলায় দোয়েল বলল, কোন গান?
‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি
মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।’
এই গানটা আমি জানি। বাবার মুখে কত শুনছি।
আলতো করে দোয়েলের গালটা একটু ছুঁয়ে দিল ইউসুফ। আজ এতকাল পর মনে হচ্ছে আর একটা যুদ্ধ যেন তোমাকে নিয়ে শুরু করলাম। তোমার মুখের হাসি ফিরিয়ে দেয়ার যুদ্ধ। আগের যুদ্ধটার মতো এই যুদ্ধেও জয় আমাদের সুনিশ্চিত।

বাংলা ট্রিবিউন

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s